কেবল একজন বন্দীকে দ্বীপে পাঠাই নি আমরা। সে হলো নিষ্ঠুর-বাস্তির দলের সদস্য হুই। সাফাগা আসার পথে পুরোটা রাস্তা ওকে সঙ্গে রেখেছিলো ট্যানাস, এখন তার একনিষ্ঠ ভক্ত হয়ে গেছে তরুণ ছেলেটা। বাধ্যগত দাস, সে এখন।
ট্যানাসের ব্যক্তিত্বের জাদুতে যা যা জানে, সব বলে দিয়েছে হুই। লেখার সরঞ্জাম তৈরি রেখে সবকিছু শুনে গেলাম আমি, ট্যানাসের প্রশ্নের উত্তরে যা যা বললো ছেলেটা- সব লিখে রাখলাম।
জানা গেলো, বাস্তির মূল আস্তানা হলো জেবেল-উম-বাহারি র অভিশপ্ত মরুতে, চ্যাপ্টা-মাথা পর্বতগুলোর একটার উপরে । চারপাশে খাড়া ঢাল দিয়ে সুরক্ষিত। নীল নদের পূর্ব কোণ থেকে মাত্র দুই দিনের পথ, ক্যারাভান রাস্তা ঘেঁসে দারুন চমৎকার অবস্থানে।
মাত্র একটা পথ আছে ওখানে পৌঁছানোর, পাথরের ভেতর দিয়ে সিঁড়ির মতো উঠে গেছে। একবারে মাত্র একজন উঠতে পারবে, এতো সরু। হুই জানালো।
আর কোনো রাস্তা নেই চুড়োয় পৌঁছানোর? ট্যানাস প্রশ্ন করে। দাঁত বের করে হাসে হুই, ষড়ন্ত্রির মতো নাকের একপাশে ইশারা করে।
আর একটা পথ আছে। নিজের অবস্থান ছেড়ে একটা মেয়ের সাথে দেখা করতে ওই রাস্তাটা অনেকবার ব্যবহার করেছি আমি। বাস্তি যদি জানতো, পাহাড়া ছেড়ে অন্য কোথাও গেছি নির্ঘাত মেরে ফেলতো আমাকে। খুবই বিপদজনক, খাড়া পথ। কিন্তু শক্ত-সমর্থ বারোজন যোদ্ধার জন্যে কিছুই না। ওরা উপরে উঠে গেলে, মূল রাস্তা দিয়ে বাকিরা আক্রমণ করতে পারবে। আমি তোমাকে ওই পথ দেখাবো, আকহ্ হোরাস।
সেই প্রথম ওই নাম শুনেছিলাম আমি। আকহ্ হোরাস হোরাসের ভ্রাতা। ট্যানাসের জন্যে উপযুক্ত নাম। সে দেখতেও দেবতাদের মতো, লড়েও তাদেরই মতো
আর যুদ্ধের ময়দানে বহুবার হোরাসের নাম নিয়েছে সে। তো, যুক্তি আছে বৈকি! ট্যানাসকে হোরাসের ভাই বলতেই পারে তারা।
আকহ্ হোরাস! পরবর্তিতে এই নাম সমগ্র মিশরে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিলো। এক পাহাড় থেকে অপর পাহাড়ে ধ্বনিত হয়েছিলো, ক্যারাভান রাস্তা ধরে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছিলো আহ্ হোরাসের সুখ্যাতি। নদীপথের প্রতিটি মাঝির ঠোঁটে ছিলো এই নাম, নগরে-নগরে, রাজ্যের পর রাজ্যে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে পৌঁছেছিলো ওই। প্রতিটি গল্পে একটু করে রঙ চড়তে চড়তে শেষপর্যন্ত কিংবদন্তি বনে গিয়েছিলো আকহ্-হোরাস।
সে ছিলো, শ্রাইকদের অধিনায়ক-–শয়তান আকহ্-সেথ এর বিরুদ্ধে ভালো-মন্দের চিরকালীন যুদ্ধে হোরাসের প্রতিনিধিতাঁরই আপন ভাই।
আকহ্-হোরাস! যতোবার এই নাম নিতে মিশরের লোকেরা, নতুন আশায় বুক বাঁধতো তারা।
এ সবই ভবিষ্যতের কথা। এখন, তিয়ামতের বাগানে বসে কথা বলছিলাম আমরা। আমি জানি, জেবেল-উম-বাহারি মরুতে গিয়ে বাস্তির টুটি চেপে ধরতে কী রকম উদ্বেল হয়ে আছে ট্যানাস। ব্যক্তিগত একটা লেনাদেনা আছে ট্যানাসের, শয়তানটার সাথে।
আমার কাছ থেকে সে জেনেছে, তার বাবা পিয়াংকি, প্রভু হেরাবকে ধ্বংস করার জন্যে এই বাস্তির সহায়তা নিয়েছিলো আকহ্-সেথ্ ।
জেবেল-উম-বাহারি র পর্বতের ঢালে নিয়ে যাবো আমি, হুই বললো, বাস্তিকে আপনার হাতে তুলে দেবো।
অন্ধকারে নিশ্চুপ বসে রইলো ট্যানাস। তিয়ামাতের বাগানের নাইটিঙ্গেল পাখির গান নেশা ধরিয়ে দেয়। নোংরা, কদর্য দুনিয়ায় কেমন অপার্থিব শোনায় সেই আওয়াজ। কিছু সময় পরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালো ট্যানাস।
ভালো কাজ দেখিয়েছো, হুইকে বলে সে, আমার জন্যে কাজ করো, পুরস্কার পাবে। ঠিক একজন দেবতাকে সম্মান প্রদর্শনের মতো ওর পায়ে পড়ে হুই। পায়ের অধৈৰ্য্য খোঁচায় তাকে সরিয়ে দেয় ট্যানাস। অনেক হয়েছে তামাশা! এখন ভাগো, যাও!
নিজের হঠাৎ-দেবত্বে একদম খুশি নয় ট্যানাস। জীবনেও ফারাও কিংবা স্বর্গীয় কিছু হওয়ার কথা মনে স্থান দেয় নি সে। নিজের অবস্থান সম্পর্কে সব সময় সচেতন ছিলো।
ছেলেটা চলে যেতে, আমার উদ্দেশ্যে ফিরলো ট্যানাস। অনেক রাত একা জেগে বাবা সম্পর্কে তোমার বলা কথাগুলো নিয়ে ভেবেছি আমি। যে তাকে এমন হেনস্তা করেছে, শেষমেষ জীবন কেড়ে নিয়েছে তাকে শেষ করতে না পারলে শান্তি নেই আমার। আকহ্ সেথকে ধরার জন্যে যে চতুর পরিকল্পনা তুমি করেছো, ওটা আর এগিয়ে নিতে ইচ্ছে হয় না। বরঞ্চ, সোজাসুজি লড়াইয়ে ওর হৃদপিণ্ডটা ছিঁড়ে আনতে চাই আমি।
ও রকম করলে, সব হারাবে। বললাম। ভালো করেই জানো সেটা। আমি যেমন পরিকল্পনা করেছি, তেমন করে কাজ করো নিজের সম্মান তো ফেরত পাবেই, বাপের মৃত্যুর বদলাও নিতে পারবে। এইভাবে তোমার থেকে কেড়ে নেওয়া সম্পদ, ভাগ্য সবই ফেরত পাবে। শুধু যে প্রতিশোধ নেওয়া হবে, তাই নয়, বরঞ্চ এতে করে লসট্রিসের কাছেও ফিরে যেতে পারবে; আমন রা র ধাঁধায় আমার দেখা স্বপ্ন তাহলে সত্যি হবে। বিশ্বাস করো আমাকে। নিজের জন্য, আমার কর্ত্রীর সুখের জন্যে দয়া করে আমার উপর ভরসা রাখো।
তোমাকে বিশ্বাস না করলে কাকে করবো? বলে, আমার বাহুতে হাত ছোঁয়ালো ট্যানাস। আমি জানি, ঠিক বলছো তুমি। সব সময়ই ধৈৰ্য্য কম আমার ।
অন্তত কিছু সময়ের জন্যে হলেও মাথা থেকে বের করে দাও আকহ্-সেথকে। কেবল পরবর্তী ধাপের কথা চিন্তা করো। বাস্তিকে কজা করতে হবে আগে। পুব থেকে আসা সমস্ত ক্যারভান ও-ই লুটপাট করেছিলো তোমার বাবার গুলোও। পর পর পাঁচ মৌসুম প্রভু হেরাবের কোনো ক্যারাভান কারনাকে পৌঁছেনি। সেস্ত্রা-তে তোমার বাবার তামার খনিগুলো পর্যন্ত ধ্বংস করেছে বাস্তি। প্রকৌশলীদের খুন করেছে। নীল নদের তীরে তার সম্পদ নষ্ট করেছে। সমস্ত দাসদের মেরেছে। ফসল জ্বালিয়ে দিয়েছে।
