এখনো, কেউ নড়লো না। কারো মুখে কোনো শব্দ নেই। বাজপাখির প্রতীক নামিয়ে রাখলো ট্যানাস। তোমাদের কীর্তির কথা আমরা সবাই জানি। এই নীরবতা তারই প্রমাণ। তোমরা প্রত্যেকে দোষী। ফারাও-এর পক্ষ থেকে সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দিলাম আমি। মাথা কেটে ফেলা হোক এদের। ক্যারাভান চলাচলের পথে সাজিয়ে রাখা হবে সেই সব মুণ্ডু। সমস্ত অপরাধীরা ওই পথে যাওয়ার সময় যেনো দেখতে পায়, ঈগলের দেখা পেয়েছে শ্রাইক পাখি। তারা জানুক, এই দেশ থেকে আইনহীনতার কাল শেষ হয়েছে। শান্তি ফিরে এসেছে আমাদের এই মিশরে। আমি ঘোষণা করলাম, ফারাও মামোসের পক্ষ থেকে।
সে মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিতে প্রথম বন্দীকে টেনে-হিঁচড়ে বেদীর সামনে নিয়ে যাওয়া হলো। হাঁটুর উপর ভর করে মাথা নামানো হলো।
তিনটি প্রশ্নের সত্যি জবাব দিলে প্রাণে বেঁচে যাবে। আমার বাহিনীতে একজন চর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে তোমাকে। বেতনও পাবে। আর, উত্তর না দিলে সাথে সাথে পালিত হবে মৃত্যুদণ্ড। কঠোর স্বরে বললো ট্যানাস।
হাঁটু-গেড়ে থাকা বন্দীর উদ্দেশ্যে এবারে তীক্ষ্ণ চোখে চাইলো সে। এই হলো তোমার প্রথম প্রশ্ন কোন্ বাহিনীর লোক তুমি?
অভিযুক্ত ব্যক্তি কোনো উত্তর করলো না। শ্রাইকদের রক্ত-শপথ বড়ো কঠিন।
দ্বিতীয় প্রশ্ন তোমার নেতা কে? এবারেও কোনো উত্তর দিলো না শ্রাইক-দস্যু।
তৃতীয় এবং শেষ প্রশ্ন। তোমার বাহিনী যেখানে লুকিয়ে আছে, সেই গোপন আস্তানায় নিয়ে যাবে আমাকে? এবারে, ট্যানাসের পানে তাকায় আসামী । কেশে, এক দলা থুতু ছুঁড়ে মারে। তলোয়ার হাতে দাঁড়ানো যোদ্ধার উদ্দেশ্যে মাথা নাড়ে ট্যানাস।
তলোয়ারের এক কোপে পরিষ্কারভাবে কেটে যায় মাথাটা। বেদীর সামনে, মন্দিরের সিঁড়ির ধাপে আওয়াজ তুলে। পিরামিডের জন্যে আরো একটা মাথা পাওয়া গেলো। শান্তভাবে বলে, পরের বন্দীর উদ্দেশ্যে ইশারা করলো ট্যানাস।
একই প্রশ্ন করা হলো একেও, কিন্তু সেই একরোখা ভঙ্গিতে নিশ্চুপ রইলো এ জনও। মাথা নেড়ে সায় দেয় ট্যানাস। কিন্তু এবারের কোপটা একটু কেঁপে যাওয়ায় অর্ধেক কাটা পড়লো মাথাটা। দুই তিন কোপ লাগলো পুরোটা আলাদা করতে।
তেইশটি মাথা পড়লো একে একে। আবেগ লুকিয়ে রাখতে গুনে চললাম আমি। অবশেষে, একটা দস্য-শ্ৰাইক ভাঙলো। একবারেই অল্প বয়স তার, বালকই বলা যায়। ট্যানাস প্রশ্ন করার আগেই কাঁপা-কাঁপা স্বরে বলে উঠলো, আমার নাম হুই। আমি বাস্তি র আপন ভাই, তার দলে কাজ করি। ওদের গোপন আস্তানা চিনি, আমি আপনাকে নিয়ে যাবো সেখানে। দারুন সন্তুষ্টির হাসি হাসলো ট্যানাস, ইশারায় একধারে নিয়ে যেতে বললো ছেলেটাকে। ওর যত্ন নাও। প্রহরীদের উদ্দেশ্যে বললো সে, এখন থেকে এই ছেলে নীল কুমির বাহিনীর সদস্য, তোমাদের সতীর্থ।
একজন ভেঙে পড়তে বাকিরা আর বাধা হয়ে দাঁড়ালো না। তবে কেউ কেউ তখনো ঘাড় ত্যাড়ামো চালিয়ে গেলো। কেউ গাল বকলো, কেউ বা উপহাসের হাসি হাসলো উত্তর হিসেবে তরবারির ধারালো ফলায় কল্লা হারালো তারা। রক্তের ফোয়ারায় ধুয়ে গেলো তাদের শেষ শয়তানী।
যে লোকগুলো এমন কাপুরুষোচিত জীবন-যাপনের পরও শেষমুহূর্ত পর্যন্ত মৃত্যুকে হাসি মুখে বরণ করে নিলো, তাদের প্রতি কেমন একটা টান অনুভব করলাম। আমি জানি, এ কখনো আমার দ্বারা সম্ভব হতো না। সুযোগ পেলে, দুর্বল বন্দীগুলোর মতো আমিও প্রশ্নের উত্তর দিয়ে প্রাণে বাঁচতে চাইতাম।
আমি উর বাহিনীর সদস্য, স্বীকার গেলো আরেকজন।
আমি মা-এন-তে এর লোক, এলো বারগা পর্যন্ত পশ্চিম তীরের সবটুকু তার দখলে, আরেকজন বললো। বাদবাকি সমস্ত দস্যু-সর্দারের গোপন আস্তানার খবর এক এক করে পেলাম আমরা। ওদিকে, কাঁধ সমান উঁচু হলো কাটা মুণ্ডুর স্তূপ। দেওয়ালের ধারে, পিরামিডে যোগ করা হবে ওগুলো।
*
একটা ব্যাপারে আমি এবং ট্যানাস একমত, যে দস্য-নেতাদের আমরা ধরেছি, এবং যে সমস্ত শ্ৰাইক মুখ খুলেছে এদের খুব নিরাপদে সরিয়ে রাখতে হবে। শাইকদের হাত এতো লম্বা আমাদের এই মিশরে, কোথাও আসলে নিরাপদ নয় এরা। আকহ্ সেথ্ অতি-অবশ্যই এদের নাগাল পেয়ে যাবে । হয় ঘুষ দিয়ে না হয় ভয়-ভীতি দেখিয়ে অথবা বিষপ্রয়োগে হত্যার মাধ্যমে এদের মুখ চিরতরে বন্ধ করে দেবে আকহ্ সেথ। সে হলো এক অক্টোপাসের মতো, যার মাথা লুকোনো কিন্তু শুড় পৌঁছেছে আমাদের শাসন-ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। কেউ চেনে না তাকে, সমগ্র শ্রাইক বাহিনীর একচ্ছত্র অধিপতি হলো এই আকহ্ সেথ।
এই সময়ে হঠাৎ করেই সাফাগার বণিক তিয়ামাতের কথা মনে এলো আমার।
এবারে আর মেয়েদের ছদ্মবেশে নয়, সৈনিক হিসেবে ছুটে লোহিতসাগর তীরে অবস্থিত এই বন্দরে পৌঁছলাম। গালালা পৌঁছুতে যে সময় লেগেছিলো, তার অর্ধেকও লাগলো না ফিরে আসতে। বন্দরে ভীড়ানো তিয়ামাতের সওদাগরী নৌকায় তুলে দেওয়া হলো আমাদের বন্দীদের, সাথে সাথেই আরবীয় ভূখণ্ডের উদ্দেশ্যে পাল তুললো সেটা। নিজস্ব একটা দাসখানা আছে সেখানে তিয়ামাতের; জেজ বাকোয়ান নামের ছোট্ট একটা দ্বীপে। তিয়ামাত আমাদের আশ্বস্ত করে জানালো, কারো সাহস নেই সেখান থেকে পালিয়ে আসে। দ্বীপের চারধারের পানিতে গিজগিজ করছে ক্ষুধার্ত হাঙরের পাল।
