শ্রাইকদের মধ্যে আহত কেউ নেই। যুদ্ধক্ষেত্রে ছড়িয়ে আছে তাদের কাটা মুণ্ডু। আহত শত্রুদের নিকেশ করে ফেলার এই চিরন্তন রীতিতে আমি বিশ্বাসী নই; কিন্তু এর পক্ষে যুক্তি আছে বৈকি। এদের সেবা-পথ্যে নিজেদের মূল্যবান সম্পদ নষ্ট করার কোনো মানে হয় না, এমন তো নয় যে, কোনোদিন এরা দাস হিসেবে কাজ করে খেতে পারবে। আবার, সুস্থ্য যদি হয়ে উঠে, একদিন হয়তো এদের বিরুদ্ধেই লড়তে হতে পারে, তাই না?
দুই এক চুমুক মদ আর সামান্য এক গ্রাস আহার ছাড়া কিছু মুখে তুললাম না সেই রাতে। কিন্তু রাত শেষ হতেও বিশ্রাম মিললো না। আলো ফুটে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই ট্যানাস ডেকে পাঠালো আমাকে।
*
বন্দীরা সবাই দেবতা বেস্-এর মন্দিরে আটক রয়েছে, দুই কবজি পিছমোড়া করে বাঁধা প্রত্যেকের, উত্তর ধারের দেওয়াল ঘেঁসে এক সারিতে দাঁড়ানো। প্রহরীরা সতর্ক নজর রাখছে তাদের উপর ।
মন্দিরে ঢুকতেই ট্যানাস ডেকে নিলো আমাকে। তখনো আসিরীয় বধূর পোশাক পরনে, লম্বা ঘাগড়া উঁচু করে ধরে যুদ্ধের আবর্জনা ডিঙিয়ে এগুলাম।
শ্রাইকদের তেরোটি বাহিনী আছে, তাই তো বলেছিলো তুমি, তাই না টাইটা? ট্যানাসের প্রশ্নের উত্তরে মাথা কঁকিয়ে সায় দিলাম আমি। প্রতিটি বাহিনীর নিজস্ব নেতা আছে। এখন তো শুফতি আমাদের হাতে। দ্যাখো, এই ভদ্রলোকেদের মধ্যে আর কোনো নেতা আছেন কি না। মুচকি হেসে বন্দীদের দিকে ইশারায় দেখালো ট্যানাস। হাত ধরে টেনে নিয়ে দাঁড় করালো সারিবদ্ধ মানুষগুলোর সামনে।
মুখ ঢেকে রাখলাম আমি, পাছে এদের মধ্যে কেউ চিনে ফেলে আমাকে। প্রতিটি মুখের দিকে তাকিয়ে দু জনকে চিনতে পারলাম। আখেকু ছিলো দক্ষিণের শ্রাইকদের প্রধান; আসূন, গজ-দ্বীপ এবং প্রথম জলপ্রপাতের চারপাশের এলাকায় রাজত্ব তার। অপরদিকে, সেতেক হলো আরো উত্তরের কম-ওষো বাহিনীর নেতা।
স্বল্পতম সময়ের মধ্যে যাকে সামনে পেয়েছে, যোগাড় করে এনেছিলো শুফতি। প্রায় সব বাহিনীর প্রতিনিধিই আছে আমাদের বন্দীদের মধ্যে। কাঁধে টোকা দিয়ে যখন নেতা দুজনকে চিহ্নিত করলাম, সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো তাদের।
সারির শেষে পৌঁছুতে ট্যানাস জানতে চাইলো, তুমি নিশ্চিত, আর কেউ নেই?
কেমন করে বলি? আমি তো আর সব নেতাদের চিনি না।
কাঁধ ঝাঁকায় ট্যানাস। একবারে তো আর সব পাখি ধরা সম্ভব নয়। এতো তাড়াতাড়ি যে তিনজনকে ধরেছি, তাতেই আসলে নিজেদের ভাগ্যবান মনে করা উচিত। চলো, ব্যাটাদের সাথে একটু গল্প-সস্লো করি, কে জানে, অন্যদের খোঁজ মিলেও যেতে পারে।
মন্দিরের ধাপে বসে সকালের নাস্তা সেরে নিলাম আমরা। রক্ত-চর্চিত চুলের মুঠি ধরে নিহত সমস্ত শ্রাইকের কাটা মুণ্ডু একে একে তুলে ধরা হলো আমাদের সম্মুখে; ঝুলে-পড়া ঠোঁটের ফাঁক থেকে বেরিয়ে পড়েছে জিভ, নিপ্রাণ চোখের মণিতে মিহি বালুকণা ।
আমার ক্ষুধা আগের মতোই রইলো, গত কয়েকদিনে তেমন কিছু পেটে পড়েনি। তিয়ামাতের দেওয়া সুস্বাদু পিঠে, ফল-মূল গোগ্রাসে খেয়ে চললাম। পরিচিত কোনো চেহারা দেখলে চিহ্নিত করছি। কাটা মাথা থেকে কেবল আর একজন নেতাকে চিনতে পারলাম কেয়েনার নেফার-তেমু।
তো, চারজন হলো তাহলে, সন্তুষ্টি ধ্বনিত হলো ট্যানাসের কণ্ঠে। গালালা কুয়োর সামনে কাটা মুণ্ডু দিয়ে পিরামিড তৈরি করা হচ্ছে, নেফার-তেমুর মাথাটা সবার উপরে রাখা হলো।
বাকি নয়জন নেতাকেও খুঁজে পেতে হবে। আমাদের বন্দীরা এই বিষয়ে কী বলতে পারে, এসো দেখি। ঝট করে দাঁড়িয়ে পরে ট্যানাস। নাস্তার বাকি অংশ জোর করে মুখে পুরে নিরাসক্তভাবে ওর পিছু পিছু বেস্-এর মন্দিরে চললাম আমি।
শ্ৰাইক দস্যুদের ভেতরে নিজেদের চর ঢুকিয়ে দেওয়ার বুদ্ধি আমিই দিয়েছিলাম ট্যানাসকে, কেমন করে করতে হবে কাজটা তাও শিখিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু বুদ্ধি দেওয়া এক কথা, আর কাজে বাস্তবায়ন করে দেখানো সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার।
মিনমিন করে বলতে চাইলাম, অসুস্থ লোকেদের প্রয়োজন আমাকে, কিন্তু সানন্দ চিত্তে আমার কথা উড়িয়ে দেয় ট্যানাস। চালিয়াতি করে লাভ নেই, টাইটা। শয়তানগুলোর সওয়াল-জওয়াব-এর সময় তুমি অবশ্যই আমার পাশে থাকবে।
প্রশ্নোত্তর পর্বটা দ্রুত এবং নির্দয় হলো, নিঃসন্দেহে যে ধরনের লোক এরা এর চেয়ে ভালো কিছু হওয়ার নয়।
প্রথমটায় বেস্-এর উঁচু পাথুরে বেদীতে গিয়ে দাঁড়ালো ট্যানাস, হাতে বাজপাখির প্রতীক নিয়ে ক্রুর হাসিতে তাকালো নিচে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো বন্দীদের দিকে। তপ্ত সূর্য প্রখর তাপ বিলিয়ে চলেছে।
আমি ফারাও মামোসের বাজপাখির প্রতীক বাহক, এবং স্বয়ং তার পক্ষ থেকে বলছি, নির্মম কণ্ঠে বললো সে। আমিই তোমাদের বিচারক, আমিই জল্লাদ। একটু থেমে, সবার মুখে চোখ বুলিয়ে নেয় ট্যানাস। চোখে চোখ পড়তেই দৃষ্টি নামিয়ে নিলো শ্ৰাইক দস্যুরা। কারো সাহস নেই, ওই তীব্র দৃষ্টিকে অবজ্ঞা করে।
ডাকাতি এবং হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত তোমরা। যদি এমন কেউ থাকো, যে মনে করে সে নির্দোষ সামনে এসে দাঁড়াও।
অপেক্ষা করে আছে ট্যানাস। মাথার উপরে উড়ে-চলা শকুনের ছায়া খেলা করতে লাগলো ধুলোময় মন্দির প্রাঙ্গনে। এগিয়ে এসো! বলো, কে নির্দোষ। উপরে তাকিয়ে চক্রাকারে উড়ে-চলা শকুনের ঋকের দিকে তাকালো সে। ভোজের জন্যে অধীর হয়ে আছে তোমাদের দোস্তেরা। ওদের অপেক্ষা করিয়ে রেখে কি লাভ?
