স্থির থাকো, সতর্ক করে দিয়ে বললাম তাকে। নাহলে হুঁড়ি গেলে দেবো।
গায়ের শাল, মাথার ঘোমটা সরে গেছে আমার; অবাধ্য চুল নেমে এসেছে কাঁধ পর্যন্ত। সাথে সাথেই আমাকে চিনে ফেললো শুফতি। ভিন্ন সময়ে বহুবার দেখা হয়েছিলো আমাদের।
টাইটা, সেই খোঁজাটা! কথা হারিয়ে ফেলেছে শয়তানটা। তোর মনিব ইনটেফ জানে, এগুলো করে বেড়াচ্ছিস?
খুব দ্রুতই জানবে, তাকে আশ্বস্ত করে ছোরার ডগা দিয়ে খোঁচালাম। কিন্তু তোর পক্ষে তার কোনো উপকারে আসা সম্ভব হবে না।
চিৎকার করে দু জন প্রহরী ডাকলাম আমি। মুখ চেপে ধরে তার হাত বাঁধালো তারা, এরপর টেনে নিয়ে চললো ট্যানাসের কাছে।
শুফতিকে ধরার দৃশ্য ট্যানাস দেখেছে, এখন দৌড়ে আমার কাছে এসে অভিবাদন জানালো সে, খুব দেখালে, টাইটা। কিছুই ভুলো নি দেখছি। এতো জোরে চাপড়ে দিলো পিছনটা, ব্যথায় চোখে জল চলে এলো আমার। প্রচুর কাজ পড়ে আছে তোমার জন্যে। আমাদের চারজন নেই, আর কমপক্ষে বারোজন ভীষণ আহত।
শয়তানগুলোর আস্তানার কি খবর? বললাম আমি। একদৃষ্টে চেয়ে রইলো ট্যানাস।
আস্তানা মানে?
নিশ্চই মরুর ফুলের মতো মাটির তলা থেকে হঠাৎ করেই এক হাজার শ্রাইক উদয় হয় নি, তাই না? নির্ঘাত ভারবাহী জম্ভ, দাস-দাসী আছে এদের। এখান থেকে খুব একটা দূরে হওয়ার কথা নয়। ওদের পালিয়ে যেতে দেওয়া ঠিক হবে না। আজকের লড়াই-এর কেউ যেনো এই গল্প অন্যদের জানাতে না পারে। কারনাকে যেনো তোমার বেঁচে থাকার খবর না পৌঁছে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
হে প্রেমময়ী মিষ্টি আইসিস, তুমি ঠিকই বলেছো! কিন্তু কেমন করে তাদের আস্তানা খুঁজে পাবো? যুদ্ধের প্রচণ্ডতা এখনো আচ্ছন্ন করে রেখেছে ট্যানাসকে। মাঝে মধ্যে মনে হয়, আমাকে ছাড়া যে কী হতো ওর!
আরে, চিহ্ন দেখে এগোও। অধৈৰ্য্য ভঙ্গিতে বললাম। এক হাজার জোড়া পায়ের ছাপ নিশ্চই হাওয়ায় মিলিয়ে যায় নি।
নিমিষে চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো ট্যানাসের, মন্দিরের ও মাথায় দাঁড়ানো ক্ৰাতাসকে চেঁচিয়ে ডাকলো সে, পঞ্চাশজন যোদ্ধা নাও! টাইটার সাথে এগোও! ও পথ দেখিয়ে ব্যাটাদের ভেঁরায় নিয়ে যাবে। যাও । জলদি!
কিন্তু আহতরা প্রতিবাদ করে বললাম আমি। আজকের দিনের মতো অনেক মারপিট হয়েছে, এখন কিছুটা চিকিৎসাবিদ্যার অনুশীলন প্রয়োজন; কিন্তু আমার কথা উড়িয়ে দেয় ট্যানাস। আমাদের মধ্যে তুমি হলে সেরা পথ-পাঠক। আহতরা তোমার জন্যে অপেক্ষা করবে, আর আমার যোদ্ধারা হলো এক একটা ষড়–তুমি ফিরে না আসা পর্যন্ত মরবে না, দেখো!
*
যেমন বলেছিলাম, সহজেই খুঁজে পেলাম শয়তানগুলোর আস্তানা। ক্ৰাতাস আর তার পঞ্চাশ জন যোদ্ধা পিছুপিছু রইলো, পুরোনো শহরটা ঘুরে প্রথম পাহাড়শ্রেণীর পেছনে গিয়ে আবিষ্কার করলাম তাদের অবস্থানের চিহ্ন। এখান থেকেই জড়ো হয়ে আক্রমণের পরিকল্পনা করা হয়েছিলো। চিহ্ন অনুসরণ করে দুলকিচালে ছুটলো আমাদের দলটা, এক মাইলের কিছু কম দূরত্বে পেরিয়ে ছোট্ট একটা টিলার উপরে উঠতেই নিচের উপত্যকায় শ্রাইকদের ক্যাম্প দৃষ্টিগোচর হলো।
একেবারে হতচকিত হয়ে গেছে তারা। খচ্চর এবং মেয়েমানুষগুলোকে পাহাড়ার জন্যে কেবল জনা বিশেক লোক রয়েছে সেখানে। প্রথম চোটেই তাদের একেবারে পিষে ফেললো কাতাসের যোদ্ধারা। এবারে আর কোনো বন্দী যোগাড় করা সম্ভব হলো না আমার পক্ষে। কেবলমাত্র মেয়েগুলো ক্ষমা পেলো; ক্যাম্পের দখল পেতেই বিজয়ীর প্রাপ্য পুরস্কার হিসেবে ওদের ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে গেলো।
এ ধরনের একটা দলের পক্ষে মেয়েগুলো বেশ সুন্দরী বলতে হয়। বেশ কিছু চোখে-পড়ার মতো মুখ রয়েছে। প্রায় স্বস্তির সঙ্গেই নিজেদের সমর্পণ করলো তারা। এমনকি দু একজনকে হাসি-তামাশায় মেতে উঠতেও দেখলাম। নিঃসন্দেহে অনাঘ্রাতা কুমারী নয় এরা, লজ্জাবতী মনে করাটা বোকামী। কাছের পাথুরে টিলার আড়ালে সদ্য বরণ করে নেওয়া মরদের সাথে ভালোবাসার খেলায় মত্ত হতে চলে গেলো ওরা।
পুরোনো চাঁদের পরে আসে নতুন চাঁদ, শীতের পর বসন্ত; নিজেদের হতাহত পুরোনো সঙ্গীদের জন্যে মেয়েগুলোর কারো মনে কোনো গভীর ব্যথা যে নেই–এ কথা বলে দিতে হয় না। হয়তো, নতুন এবং স্থিতিশীল সম্পর্কের সূচনার জন্যে মরুর বিস্তৃতির চেয়ে ভালো কোনো স্থান আর হতে পারে না।
নিজের কথা বললে, আমি বরঞ্চ খচ্চরগুলোর পিঠের বোঁচকা সম্বন্ধে বেশি কৌতূহলী। একশ পঞ্চাশটিরও বেশি খচ্চর আছে, একদম সুস্থ্য; কারনাক বা সাফাগা বন্দরে বেশ ভালো দামে বিকোবে ওগুলো। এ বিষয়ে ট্যানাসের সাথে কথা বলতে হবে, মনে মনে ঠিক করে নিলাম।
পরিত্যক্ত গালালা নগরে যখন ফিরে এলাম, সূর্য ততক্ষণে অস্তমিত হয়েছে। খচ্চরগুলোর পিঠে মাল-সামান, ওগুলোর পেছনে সদ্য হাতবদল হওয়া মেয়েদের দল। কুয়োর ধারে, ধসে পড়া একটা স্থাপনায় তৈরি করা হয়েছে অস্থায়ী হাসপাতাল। রাত পর্যন্ত ওখানেই পড়ে রইলাম আমি, মশালের আলোয় ক্ষত সেলাই করলাম আহত যোদ্ধাদের। অনেকের আঘাত অত্যন্ত মারাত্মক এবং ব্যথাদায়ক। যাই হোক, সকাল পর্যন্ত মাত্র একজন রোগী মারা গেলো। হাতের ছেঁড়া ধমনী থেকে রক্তপাতের কারণে মারা গেলো আমসেথ। লড়াইয়ের ঠিক পরপরই যদি ওকে দেখতে পারতাম, হয়তো বেঁচে যেতো সে। যদিও কাজটা ট্যানাসের কারণে করা হয় নি, অপরাধবোধের হাত থেকে রেহাই পেলাম না আমি। তবে আমার অন্যান্য রোগীদের সুস্থ্য হয়ে ওঠার ব্যাপারে আমি জোর আশাবাদী। এরা সবাই শক্ত তরুণ, সহজে কাবু হয় না।
