সহজাত প্রতিক্রিয়ায় প্রথমটায় মুখ সরিয়ে নিতে চাইলাম আমি, কিন্তু শেষমেষ নিজেকে সামলে নিয়ে চুমুর প্রত্যুত্তর করতে উদ্যত হলাম। ইনটেফের সংস্পর্শে থেকে থেকে শরীরী কলা আমি কম শিখি নি, যে কোনো মানুষকে জাগিয়ে তুলতে পারি চুমো দিয়ে।
জায়গায় জমে গেলো বর্বরটা, এমন আদর সে কখনো পায় নি। ওই অবস্থাতেই, কাপড়ের ভেতর থেকে ছোরাটা বের করে শয়তানটার বুকের খাঁচায় সেঁধিয়ে দিলাম। ওর চিৎকার চাপা পড়ে গেলো আমার চুমুতে; যতক্ষণ পর্যন্ত না ছোরাটা হৃদপিণ্ডে গেঁথে গেলো, ভালোবাসার বাহুডোরে বেঁধে রাখলাম ব্যাটাকে। অবশেষে, ধীরে শিথিল হয়ে গেলো দেহটা, আমি ছেড়ে দিতে গড়িয়ে পরে গেলো একপাশে।
দ্রুত চারধারে চাইলাম। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই বেদীর চারধারে দাঁড়ানো যোদ্ধাদের দেওয়ালে ফাটল ধরেছে। দু জন নিথর পড়ে আছে, আহত হয়েছে আমসেথ। বাম হাতে তলোয়ার চালাচ্ছে সে, রক্তাক্ত ডান হাত একেবারে অকেজো ।
স্বস্তির সাথে লক্ষ্য করলাম, এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে ট্যানাস। জংলী হাসিতে উন্মত্ত, নিপুণ ভঙ্গিতে তলোয়ার চালাচ্ছে। মনে হলো, ফাঁদটা কাজে লাগাতে একটু বেশিই দেরি করে ফেলেছে সে। শ্রাইকদের পুরো দলটা এখন মন্দিরের ভেতরে, আহত চিতার চারপাশে হিংস্র কুকুরের মতো তড়পাচ্ছে তারা। আর কিছু সময়ের মধ্যে সবাইকে শেষ করে ফেলবে এরা।
আমার চোখের সামনে তলোয়ারের এক মারণ-খোঁচায় একটাকে নিকেশ করলো ট্যানাস। এরপর এক পা পিছিয়ে, গর্জে উঠলো সে, এদিকে! যোদ্ধারা!
সাথে সাথেই প্রতিটি দাসী মেয়ে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায় নিজেদের স্থান ছেড়ে। জবরজং পোশাক ছুঁড়ে ফেলে তলোয়ার বাগিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা। আশ্চর্যান্বিত শ্ৰাইকেরা যেনো পঙ্গু হয়ে গেছে নীরবে চেয়ে থাকলো তারা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একশ বার তার বেশি বর্বর প্রাণ হারালো। অবশেষে যখন সামান্য প্রতিরোধে ব্যাপৃত হতে চাইলো তারা, পেছন থেকে ট্যানাস এবং তার ছোট্ট বাহিনী তেড়ে গেলো।
মৃত্যুভয়ে দারুন লড়লো শয়তানের দল। কিন্তু সংখ্যায় এতো বেশি পরিমাণে হওয়ার কারণে মুক্তভাবে অস্ত্র চালাতে পারছে না তারা। আর তাদের প্রতিপক্ষ সমগ্র মিশরের সেরা আশিজন সৈনিক।
কিছু সময়ের জন্যে টিকে থাকলো তারা। গোলমালের মাঝখান থেকে গর্জে উঠলো ট্যানাস; প্রথমটায় আমি ভাবলাম এ বুঝি কোনো নতুন নির্দেশ, কিন্তু এরপরেই বুঝলাম এ হলো রক্ষীবাহিনীর রণ-সংগীত। একশ বা তার অধিক কণ্ঠস্বর সেই সুর ঠোঁটে তুলে নেয় :
আমরা হোরাসের প্রশ্বাস,
মরুর বাতাসের মতো প্রচণ্ড;
শুষে খাই শত্রুর রক্ত–
গানের সাথে একতালে তলোয়ার চললো, যেনো অন্ধকার জগতের শয়তানের বিরুদ্ধে দেবতাদের মুগুর ওগুলো। এহেন আক্রমণের সামনে খড়কুটোর মতো উড়ে গেলো শ্রাইকদের প্রতিরোধ; যুদ্ধ নয়, শেষমেষ একপেশে নরহত্যার উৎসবে পরিণত হলো এই লড়াই।
বুনো কুকরের দল দ্বারা একপাল ভেড়াকে ছিঁড়ে-খুঁড়ে ফেলতে দেখেছি আমি। এ যেনো তারচেয়ে খারাপ । অনেক শ্রাইক যোদ্ধা হাতের অস্ত্র ফেলে দিয়ে হাঁটুর উপর দাঁড়িয়ে প্রাণ ভিক্ষা চাইলো। কিন্তু কোনো দয়া দেখানো হলো না তাদের প্রতি। বাকিরা দরোজা দিয়ে পালাতে চাইলো, কিন্তু ওখানে মোতায়েন প্রহরীরা কচুকাটা করে ফেললো তাদের।
এই উন্মত্ত লড়াইয়ের মধ্যে চিৎকার করে ট্যানাসের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইলাম আমি। থামাও ওদের! বন্দী চাই আমরা!
আমার কথা তার কান পর্যন্ত পৌঁছুলো না, অথবা শুনেও না শোনার ভঙ্গি করলো ট্যানাস। হাসছে, গান গাইছে–একপাশে কাতাস, আরেকপাশে রেরেমকে নিয়ে শ্রাইকদের ছিঁড়ে ফেলছে সে। মরণাপন্ন শয়তানগুলোর রক্তে ভিজে গেছে মুখের দাড়ি, উন্মাদ চেহারায় লাল আস্তর জ্বলজ্বল করছে। হে মাতা হাপি, কী ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ ওর!
থামো, ট্যানাস! সবগুলোকে মেরো না! এইবারে আমার কথা তার কানে গেলো। ফিকে হয়ে এলো মুখের উন্মত্ততা, চকিতে সংযত করলো ট্যানাস নিজেকে।
প্রাণভিক্ষা চাইলে, ছেড়ে দাও! চিৎকার করে নির্দেশ দিলো সে। সঙ্গে সঙ্গে পালিত হলো সেটা। কিন্তু শেষমেষ, হাজার শ্রাইকের মধ্যে মাত্র দু শ জন মতো অবশিষ্ট থাকলো । রক্তাক্ত পাথুরে মেঝেতে হাঁটু-গেড়ে বসে প্রাণভিক্ষা চাইছে।
কয়েক মুহূর্তের জন্যে আচ্ছন্ন বোধ করলাম আমি। এরপরই, হঠাৎ চোখের কোণে অস্বাভাবিক নড়াচড়া ধরা পড়লো।
শুফতি বুঝে গেছে, মূল দরোজা দিয়ে এখান থেকে সে বেরুতে পারবে না; তলোয়ার বাগিয়ে ধরে পুবের দেওয়ালের উদ্দেশ্যে ছুটছে সে। আমার অবস্থা থেকে একদম কাছে। মন্দিরের ওই অংশের দেয়াল ধ্বসে বেশ বড়ো একটা ফাঁকা জায়গা সৃষ্টি হয়েছে। হাঁচড়ে-পাঁচড়ে খাড়া ঢাল ধরে উঠলো শুফতি; প্রায় পৌঁছে গেছে দেওয়ালের উপরে । মনে হয়, কেবল আমি একাই দেখছি ওর এই পলায়ন প্রচেষ্টা। প্রহরীরা সবাই বন্দী নিয়ে ব্যস্ত, ট্যানাস নিজেও আমার দিকে পিছন ফিরে নির্দেশ দিয়ে চলেছে।
কোনো কিছু চিন্তা না করেই, একটা ভাঙা ইটের টুকরো তুলে নিলাম। ততক্ষণে দেওয়ালে চড়ে বসেছে শুফতি। শরীরের সমস্ত শক্তি এক করে ছুঁড়লাম কাদা-মাটির ইটটা। শুফতির মাথার পেছনে এতো জোরে আঘাত করলো ওটা, হাঁটুর উপর পড়ে গেলো সে; পিছলে-এক গাদা ধুলো-ভস্ম নিয়ে গড়িয়ে আমার পায়ের কাছে এসে থামলো। ঝাঁপিয়ে শয়তানটার বুকে চড়ে বসলাম, আমার ছোরার ডগাটা ওর গলায় নিশানা করছি। একটা মাত্র চোখে ধুনে দৃষ্টি নিয়ে আমার চোখে চেয়ে রইলো শুফতি।
