চারপাশের পাথরখন্ডের মতোই অনড় দাঁড়িয়ে রইলো শ্রাইকেরা। ধীরে, আলো তীব্র হতে ভালোভাবে দেখতে পেলাম তাদের। দারুন সুশৃঙ্খল, কোনো উদ্দাম হুঙ্কার বা আস্ফালন নেই–অপেক্ষা করছে নেতার নির্দেশের। তামার বর্ম আর অস্ত্রে ঠিকরে পড়ছে সকালের প্রথম সূর্যরশ্মি। প্রত্যেকের মাথা মুখোশে ঢাকা। চোখের জায়গায় দুটো ফাঁক।
নীরবতা একেবারে অসহনীয় হয়ে উঠলো। এরপর গর্জে উঠলো একটা কণ্ঠস্বর, ভেঙে গেলো সকালের নিস্তব্ধতা। চারপাশের পাহাড়ের গায়ে লেগে প্রতিধ্বনিত হলো সেই গর্জন। কারিক! জেগে আছো?
মুখোশ থাকা সত্ত্বেও শুফতিকে চিনতে পারলাম। পশ্চিমধারের টিলার উপরে দাঁড়িয়ে সে, যেখান দিয়ে চলে গেছে রাস্তাটা। কারিক! আবারো ডাকলো সে। পণ দেওয়ার সময় এসে গেছে। কেবল এবারে পরিমাণটা একটু বেড়েছে। এখন সবকিছু চাই আমার! শুনেছো তুমি, সব কিছু!
মাদুর ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লো ট্যানাস, পশমের শালটা ছুঁড়ে ফেললো। সেক্ষেত্রে, নেমে এসে আমার কাছ থেকে ওটা নিয়ে যেতে হবে তোমাকে! পাল্টা গর্জে উঠে তলোয়ার আঁকড়ে ধরলো সে।
ডান হাত মাথার উপরে তুলে ধরলো শুফতি। রুপোর মুদ্রার মতো চকচক করছে তার চোখের শূন্য কোটর। ঝট করে হাতটা নামালো সে।
জমিনে থাকা যোদ্ধাদের একজন হুঙ্কার করে উঠে, শত শত অস্ত্র উদ্যত হয় আকাশ পানে। শুফতির ইশারায় ঢাল বেয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে নেমে আসে তারা সংকীর্ণ গালালা উপত্যকায়।
মন্দিরের মাঝে অবস্থিত পাথুরে বেদীতে ছুটে গিয়ে দাঁড়ালো ট্যানাস; অন্ধকার আর মাদকতার দেবতা বেস্-এর লম্বা একটা মূর্তি আছে সেখানে। ক্ৰাতাস আর তার যযাদ্ধারা যোগ দিলো তার সাথে। মাথা ঢেকে, মাদুরে শুয়ে ভয়ে কাঁপতে লাগলাম আমি আর দাসী মেয়েগুলো।
একটা বেদীতে চড়ে এক হাঁটুর উপর ভর করে দাঁড়ালো ট্যানাস, বিশাল লানাটা ধনুকটা ঠিক করে নিচ্ছে। প্রায় সবটুকু শক্তি লাগলো ওটা টেনে নিতে, কিন্তু যখন সোজা হয়ে দাঁড়ালো সেচকচকে রুপোর ছিলাটা যেনো কথা বলে উঠলো। পিঠের থলে থেকে একটা তীর হাতে নেয় ট্যানাস; প্রধান দরোজার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ায়। ওই পথ দিয়েই মন্দিরে ঢুকতে হবে শ্রাইকদের।
বেদীর নিচে, নিজের যোদ্ধাদের এক সারিতে দাঁড় করিয়ে ফেলেছে ক্ৰাতাস। ধনুক হাতে ওরাও প্রধান দরোজার দিকে মুখ রেখে তৈরি। বেদীর চারধারে সংখ্যায় তারা একেবারে স্বল্প, গলায় কী যেনো একটা দলা পাকিয়ে গেলো আমার। এতোটাই বীরত্বপূর্ণ ছিলো তাদের অবদান, একটা কাব্য লিখবো ওদের নিয়ে সাথে সাথে ঠিক করে ফেললাম। কিন্তু প্রথম পংক্তি মনে আসার আগেই শয়তানদের প্রথম দলটা ভাঙা দরোজা গলে ঢুকে পড়লো, প্রচণ্ড হুঙ্কার ছাড়ছে সবাই।
শুরুতে কেবল পাঁচজনে উঠতে পারলো খাড়া সিঁড়িপথ বেয়ে, বেদীতে ট্যানাস যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখান থেকে মাত্র চল্লিশ গজমতো দূরত্বে। প্রথম তীরটা ছুঁড়ে দিলো ট্যানাস। তিনজন পড়ে গেলো সাথে সাথে । প্রথম লোকটার বুক এঁফোড় ওফোড় হয়ে বেড়িয়ে গেলো তীরটা। পরের জনের গলা কুঁড়ে আটকে গেলো তৃতীয় জনের দেহে। চোখের কোটড়ে পুরো সেঁধিয়ে তবেই থামলো ওটা। প্রথম দু জন জট পাকিয়ে পরে গিয়ে পথ আটকে ফেললো। শেষপর্যন্ত বাঁধভাঙা বন্যার মতো ভেতরে ঢুকতে শুরু করলো তারা। ঝকের পর ঝাক তীর ছুঁড়ে তাদের অভ্যর্থনা জানাতে লাগলো বেদীর চারপাশের ছোট্ট দলটা। নিহত-আহতদের এলোমেলো দেহ আরো সমস্যায় ফেললো পেছনের দস্যুদের।
কিন্তু বেশিক্ষণ এভাবে হবে না শত্রুরা সংখ্যায় এতো বেশি, একজন আহতের জায়গা নিলো দশজন বর্বর। কিছু সময়ের মধ্যেই মন্দিরের বেদী ঘিরে ফেললো তারা। এখন আর তীর চালানোর মতো দূরত্বে নেই কেউ, ট্যানাস আর অন্যরা এবারে তলোয়ার হাতে তুলে নেয়। হোরাস, আমাকে অস্ত্র দাও! রণহুঙ্কার ছাড়লো ট্যানাস, তার পাশের যোদ্ধারা সেই সুর ঠোঁটে তুলে নেয়। তামার সাথে তামার সংঘর্ষে আগুনের ফুলকি ছোটে, বেদীর চারপাশে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে শ্রাইকের দল। নারকীয় তলোয়ারবাজির প্রদর্শনীতে তাদের অভ্যর্থনা জানাতে থাকে ট্যানাস আর তার যোদ্ধারা। শ্রাইকেরা ভীতু নয়, বেদীর চারধারে ফুঁসে উঠে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা। একজন দ্বি-খণ্ডিত হয়ে যাওয়া মাত্র আরেকজন নির্ভয়ে তার জায়গা নিয়ে নিলো।
প্রবেশমুখে শুফতিকে দেখতে পেলাম আমি। মূল যুদ্ধক্ষেত্র থেকে একটু দূরে সরে সমানে উৎসাহ জুগিয়ে চলেছে সে। অন্ধ চোখের কোটরটা ধকধক জ্বলছে; চেঁচিয়ে সে বলছে, আসিরীয় শয়তানটাকে জীবিত চাই আমার। ধীরে ধীরে ওকে মারবো আমি!
মাথা ঢেকে, মাদুরে শুয়ে থাকা মেয়েগুলোকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছে শ্রাইকের দল। ছোট্ট জায়গাটাতে এই মুহূর্তে এক হাজারের মতো দস্যু ঢুকে পড়েছে। তাদের পায়ের আঘাতে ওড়া ধুলোয় দম বন্ধ হয়ে আসতে চাইলো, এক কোণার দিকে সরে গেলাম আমি।
একটা শয়তান লড়াই ছেড়ে ঝুঁকে এলো আমার উপর। এক ঝটকায় মুখের উপরে ফেলা শালটা ছুঁড়ে ফেলে চোখে চোখে চেয়ে রইলো কিছুক্ষণ।
হে আইসিসের মা! শ্বাসের সাথে বললো সে, তুমি দারুন সুন্দর।
একটা কুৎসিত শয়তান ওটা, সামনের দাঁত নেই, ডান গালে বিচ্ছিরি কাটা দাগ। মুখ থেকে পঁচা নর্দমার গন্ধ বেরুচ্ছে। এই যুদ্ধটা শেষ হওয়ার অপেক্ষা কর, এরপর এমন কিছু দেববা তোকে, খু-উ-ব মজা পাবি! যেনো প্রতিজ্ঞা করলো সে। তারপর আমার মুখটা টেনে ধরে চুমু খেতে চাইলো ঠোঁটে।
