শুফতি একটা ধূর্ত কুকুর, ট্যানাসকে বললাম। নিজের বাহিনীকে একত্র করে অপেক্ষায় থাকবে সে। গরমে আমরা ক্লান্ত হয়ে যাওয়া পর্যন্ত কিছুই করবে না।
যাত্রার পঞ্চম দিনে গালালা মরুদ্যানের সন্নিকটে পৌঁছে গেলাম আমরা। সামনের গাঢ় পাহাড়ের বুকে রয়েছে অসংখ্য প্রাচীন সমাধির গোলকধাঁধা। বহু শতাব্দি আগে এই মরুদ্যানে ছিল বিশাল এক নগরী, কিন্তু ভূমিকম্পের ফলে ধসে পড়ে পাহাড়; বিলুপ্ত হয় সুপেয় পানির কুয়োগুলো। ক্রমে মরে যায় সেই শহর। ছাদহীন দেয়ালগুলো এখনো কালের সাক্ষি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, এক সময় যেখানে ছিলো ধনী সওদাগরের হারেম, আজ সেখানে রোদ পোহায় মরুর সরীসৃপ।
পানির থলেগুলো পরিপূর্ণ করে নেওয়া আমাদের জন্যে অত্যন্ত জরুরি। মরে যাওয়া কুয়োগুলোর নিচে নেমে জল ভরে নিতে লাগলো ক্রাতাসের লোকেরা। আমি আর ট্যানাস মরা শহরটা ঘুরে দেখতে চললাম। বাতাস কেমন নিঃসঙ্গ, বিষণ্ণ এখানে। শহরের মাঝখানে দেবতা গালালার মন্দির আজো টিকে আছে। জায়গায় জায়গায় ধসে পড়েছে ছাদ, দেওয়ালও নেই বিভিন্ন স্থানে। পশ্চিম ধারের একমাত্র প্রবেশ পথটা অবশ্য এখনো দণ্ডায়মান।
কাজ হবে এটা দিয়ে, খাঁটি সৈনিকের চোখে জায়গাটার মাপ-জোক নিতে লাগলো ট্যানাস। ওর উদ্দেশ্য কী জানতে চাইলে হেসে মাথা নাড়লো সে। ওটা পরে শুনো। যুদ্ধ-মারপিট আমার কাজ।
মন্দিরের মাঝখানে যেখানে আমরা দাঁড়িয়ে, তার ঠিক নিকটেই একপাল বেবুনের বেশ তাজা চিহ্ন রয়েছে। ওগুলো ট্যানাসকে দেখিয়ে বললাম, নির্ঘাত কুয়োর পানি খেতে আসে তারা।
সেই সন্ধায় প্রাচীন মন্দিরে আলো জ্বেলে বসেছিলাম আমরা, বেবুনের ডাক শুনতে পেলাম তখন ধ্বংসপ্রাপ্ত নগরের চারপাশের পাহাড়শ্রেণীকে হুঁশিয়ার করে দিচ্ছে কোনো বুড়ো মদ্দা। পাথরে লেগে প্রতিধ্বনি তুললো তার হুঙ্কার । আগুনের ওপাশে বসা ট্যানাসের উদ্দেশ্যে মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম, তোমার দোস্ত শুফতি চলে এসেছে। ওর চরেরা এখন পাহাড়ের উপরে, দেখে নিচ্ছে আমাদের। বেবুনেরা ওদের দেখেই চেঁচামেচি করেছে।
আশা করি, ঠিক বলেছো তুমি। আমার প্রহরীরা বিদ্রোহের দাঁড়প্রান্তে এসে উপস্থিত হয়েছে। ওরা জানে, এ সবই তোমার পরিকল্পনা। যদি ভুল হয়, তবে তোমার কল্লা আর পশ্চাৎ দেশে ঝাল মেটাতে চাইলে কী যে করবো। পাশে, আগুনের ধারে বসা আসতেস-এর সাথে কথা বলতে উঠে গেলো ট্যানাস।
শত্রু কাছে-পিঠেই আছে–এ খবরে পুরো ভাব পাল্টে গেলো ক্যাম্পের । ঘুমোনোর মাদুরের নিচে লুকিয়ে রাখা তলোয়ারের ফলায় আদর করে হাত বোলাতে লাগলো মেয়ে-রূপী প্রহরীরা, চওড়া হাসি ঠোঁটে। কিন্তু স্বাভাবিক আচরণে কোনো পরিবর্তন এলো না কারো। ধীরে সবাই শুয়ে পড়লাম আমরা, নিভে গেলো আগুন। একজন প্রাণীও ঘুমোয় নি। থেকে থেকে কাশির শব্দ আসছে আমার চারপাশে কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকা লোকগুলোর কাছ থেকে। লম্বা ঘণ্টাগুলো এক এক করে পেরিয়ে যেতে লাগলো। ভাঙা ছাতের মধ্যদিয়ে মাথার উপরের আকাশে তারার মেলা দেখলাম আমি, কোনো আক্রমণ এলো না কোথাও থেকে।
সূর্যোদয়ের ঠিক আগে শেষবারের মতো ক্যাম্পের প্রহরা পরীক্ষা করে নিজের জায়গায় ফিরে যাওয়ার পথে আমার মাদুরের পাশে এসে ফিসফিসালো ট্যানাস। তোমার বন্ধু বেকুনেরা বোধহয় ভুল করেছে। তুমিও তাই।
শ্ৰাইকেরা এখানে। আমি গন্ধ পাচ্ছি। পুরো পাহাড়ে গিজগিজ করছে তারা। বললাম আমি।
তুমি আসলে নাস্তার সুবাস পাচ্ছ। ঘোৎ করে উঠে ট্যানাস। আমি পেটুক–এ কথাতে যে রাগ হই, বিলক্ষণ জানা আছে ওর। এহেন রসিকতায় কর্ণপাত করলাম না । কাছেই ধ্বংসাবশেষের কাছে চলে এলাম পেট খালি করতে।
জলবিয়োগ করতে বসেছি মাত্র, তীব্র-তীক্ষ স্বরে চেঁচিয়ে উঠলো একটা বেবুন রাতের শেষপ্রহরের শান্তি প্রায় বরবাদ হয়ে গেলো জানোয়ারটার চিৎকারে। শব্দের উৎস মুখে কান পাতলাম আমি, মৃদু প্রায় না-শোনার-মতো একটা আওয়াজ পেলাম। মনে হলো অসাবধানে কেউ হয়তো হাতের অস্ত্র বা ঢাল ফেলে দিয়েছে শক্ত পাথরে।
আপনমনেই হাসলাম আমি। ট্যানাসের কথা ভুল প্রমাণ করতে পারাটা আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার। মাদুরের উদ্দেশ্যে ফেরার সময় কাছের যোদ্ধাকে শুনিয়ে ফিসফিস করে বললাম, তৈরি থাকো। ওরা এসে গেছে! মুখে মুখে সবার কাছে পৌঁছে গেলো সতর্কবাণী।
মাথার উপরে ধীরে ফ্যাকাসে হয়ে এলো তারার আলো; চুপিচুপি চলে এলো সকাল ঠিক যেমন করে একদল হরিণের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ক্ষুধার্ত সিংহী। হঠাৎ পশ্চিম ধারের প্রহরী শিষ দিয়ে উঠলে চাঞ্চল্য দেখা দিলো ক্যাম্পে। নিচু, জরুরি স্বরে ওদের সামলালো ক্ৰাতাস এবং তার অধীনস্থ যযাদ্ধারা। ধীরে! সাহসী যোদ্ধারা, ধীরে! নির্দেশ ভুলে যেও না। নিজের নিজের জায়গায় থাকো! নিজের মাদুর ছেড়ে উঠলো না কেউ।
ধীরে, মাথা কাপড়ে ঢাকা অবস্থাতেই ক্যাম্পের চারধারের পাহাড়ে চোখ বোলালাম আমি। যেখানেই তাকাই, একই দৃশ্য। আমাদের দিগন্ত ঢাকা পড়ে গেছে সশস্ত্র লোকেদের অবয়বে। জাল গুটোনোর মতো করে আস্তে আস্তে ঘিরে আসছে তারা।
এখন বুঝলাম, কেননা এতো দেরি করেছে শুফতি। এতোগুলো শয়তানকে একত্র করতে সময় লেগেছে তার। স্বল্প আলোতে সঠিক সংখ্যা হিসাব করা সম্ভব নয়, তবে কম করে হলেও এক হাজার বা তারো অধিক লোক আছে ওদের দলে। দশগুন বেশি আমাদের, ভয়ে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার দশা হলো আমার। এমনকি, নীল কুমির বাহিনীর পক্ষেও এ বড্ড বেমানান যুদ্ধ।
