আমি চাই, তোমরা আমার নামটা মনে রাখো। এরপর যখনই এই নাম শুনবে, ভদ্র-পাখির মতো উড়ে পালাবে–কী বলেছি বুঝেছো? আবারো ক্রাতাসের উদ্দেশ্যে ইশারা করে ট্যানাস। দাসী ঠেঙানো চাবুকের ফিতে হাতে পেঁচিয়ে নেয় সে। মদ্দা জলহস্তির চামড়া থেকে তৈরি, এ অনেকটা র্যাসফারের চাবুকের প্রতিরূপ। ট্যানাস হাত বাড়িয়ে দিতে নিরাসক্তভাবে ওটা হাত-বদল করলো ক্ৰাতাস।
এতো দুঃখিত হয়ো না, দাস-সর্দার, ট্যানাস বললো তাকে। পরে সুযোগ পাবে। কিন্তু আসিরীয়ার কারিক প্রথমে আঁশ মিটিয়ে নিতে চায়।
বাতাসে সপাঙ করে চাবুক চালালো ট্যানাস। শুয়ে থাকা অবস্থাতেই চিৎকার করে উঠে শুফতি, এরপর ট্যানাসের দিকে ঘাড় ফিরিয়ে বলে, তুমি পাগল হয়ে গেছে! আমি শ্রাইক বাহিনীর নেতা! আমার সাথে এ ধরনের আচরণের ফল ভালো হবে ওর ন্যাংটো পাছা বসন্তের দাগে ভরা।
চাবুক উঁচিয়ে ধরে ট্যানাস, শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে নামিয়ে আনে ওটা। ঠিক আমার আঙুলের সমান একটা বেগুনি দাগ ফুটে উঠে শুফতির নগ্ন পাছায়। প্রচণ্ড ব্যথায় কোনো আওয়াজ বেড়োয় না তার মুখ দিয়ে, কেবল হিসহিস শব্দে বাতাস টানে। যন্ত্রণায় মোচড় খাচ্ছে শরীর। আবারো চাবুক চালায় ট্যানাস, নিপুণ দক্ষতার সাথে ঠিক আগের আঘাতের সমান্তরালে পড়ে এবারের আঘাতটা। ফাঁদে পড়া ষাঁড়ের মতো এবারে গর্জে উঠে শুফতি। বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে দারুন মনোযোগের সাথে আঘাতের পর আঘাত করে চললো ট্যানাস, যেনো কোনো মাদুর সেলাই করছে।
শেষমেষ যখন ক্ষান্ত দিলো সে, শিকারের নগ্ন পাছায় রক্তাক্ত খাল হয়ে গেছে অনেকগুলো। একটা আঘাত অপরটিকে ছোয় নি। এখন আর চিৎকার করতে পারছে
শুফতি। নোংরা জমিনে মুখ চেপে পরে আছে সে, নিঃশ্বাসের সাথে কেবল ধুলো উড়ছে। রেমরেম আর ক্ৰাতাস ছেড়ে দিতেও একটু নড়লো না সে, উঠে বসার কোনো লক্ষণও নেই।
চাবুকটা ক্রাতাসের হাতে দিয়ে দিলো ট্যানাস। পরের টা তোমার, দাস-সর্দার। দেখি, কেমন চিত্রকর্ম আঁকতে পারো তুমি।
প্রচণ্ড শক্তিতে শুরু করলো ক্ৰাতাস, কিন্তু তার আঘাতে ট্যানাসের অপূর্ব দক্ষতার প্রমাণ মিললো না। মুহূর্ত পরেই রক্তের চাদরে ঢাকা পড়ে গেলো বেচারা দস্যুর পেছনটা। বালুতে পড়ে মুক্তোর দানার মতো জ্বলতে লাগলো রক্তের ফোঁটা।
হাঁপাতে হাঁপাতে চাবুকটা আসতেসের হাতে দিয়ে দেয় ক্ৰাতাস, শেষ দস্যুর উপর প্রয়োগের জন্যে। মনে রাখার মতো কিছু উপহার ওকেও দিয়ে দাও।
ক্রাতাসের চেয়েও কর্কশ হলো আসতেস-এর অবদান। কাজ শেষ হতে সদ্য চামড়া খালাই করা গরুর মাংসের মতো দেখাতে লাগলো শেষ দস্যুর পেছনটা।
ক্যারাভান সামনে বাড়ার ইশারা করলো ট্যানাস এবারে। লাল পাথরের পাহাড়ের ওধারে, গিরিপথ হয়ে। তিন নগ্ন দস্যুর সামনে কিছু সময় দাঁড়ালাম আমরা।
শেষমেষ একটু নড়ে উঠে মুখ তুললো শুফতি। দ্রভাবে তাকে সম্বোধন করে ট্যানাস বললো, তো, বন্ধু, চলে যাওয়ার অনুমতি দিন তাহলে । আমার চেহারাটা মনে রাখুন, এবং এরপর দেখলে ত্রিসীমানায় থাকবেন না। শ্রাইকদের পালকটা মাটি থেকে তুলে নিয়ে এবারে শুফতির কপালে ছোঁয়ালো সে। তোমার উপহারের জন্যে ধন্যবাদ। প্রার্থনা করি, আসছে রাতগুলো যেনো কোনো রমনীর কোলে কাটাতে পারো। এরপর আসিরীয় ভদ্রতায় সালাম জানিয়ে ক্যারাভানের পিছুপিছ চললো সে, পেছনে আমি।
শেষ চড়াইয়ের ওপারে হারিয়ে যাওয়ার আগে পিছন ফিরে তাকালাম আমি। একে অপরের সহায়তায় কোনো রকমে নিজের পায়ের উপর দাঁড়িয়েছে তিন দস্যু। এতোদূর থেকেও শুফতির মুখের ভাব সম্পূর্ণ বোঝা যায় ঘৃণায়, যন্ত্রণায় বিকৃত হয়ে আছে।
গিরিপথের পেরুলেই, নীল নদের এপাড়ের প্রত্যেকটি শ্ৰাইক এবারে আঁদা-জল খেয়ে আমাদের পেছনে লাগবে–এতে কোনো সন্দেহ নেই। ক্ৰাতাস আর তার বর্বর সঙ্গীদের শুনিয়ে বললাম আমি। পাগলের মতো হেসে উঠলো তারা, নির্ঘাত এক জাহাজ-ভর্তি মদ কিংবা সুন্দরী মেয়ে উপহার হিসেবে পেলেও এতো খুশি হতো না।
*
গিরিপথের প্রান্ত হতে শেষবারের মতো নীল সমুদ্রের দিকে চাইলাম আমরা, এরপরে ঢালু পথ ধরে নেমে এলাম পাথর আর বালুর রাজ্যে। নীল নদ এবং আমাদের মাঝখানে এখন কেবল এই মরু।
যতোই সামনে এগুলাম, গরম যেনো ঝাঁপিয়ে পড়লো। প্রতিবার শ্বাস নেওয়ার সাথে সাথে নাক-মুখ দিয়ে ভেতরে ঢুকছে ভীষণ উত্তপ্ত বাম্প। চোরের মতো আমাদের শরীরের আর্দ্রতা শুষে নিতে চাইছে। পায়ের নিচের পাথুরে জমিন এতো গরম, ফোস্কা পড়ে গেলো চামড়ায়। দিনের বেলায় এগোনো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়লো। তিয়ামাতের দেওয়া লিনেন তাবুর নিচে ধাওয়া খাওয়া কুকুরের মতো জিভ বের করে হাঁপাতে লাগলাম আমরা।
দিগন্তের আঁকা-বাঁকা পাহারশ্রেণীর নিচে সূর্য হারিয়ে যেতে আবার পথে নামলাম। চারপাশের মরু এমনই বৈরী, এমনকি নীল কুমির বাহিনীর সদস্যরা পর্যন্ত পর্যদস্ত। রাতে যেনো তারার মেলা বসে আকাশে, আমার অবস্থান থেকে পেছনের সাড়িতে ক্ৰাতাসকে পর্যন্ত পরিষ্কার দেখতে পেলাম আমি। অর্ধেক রাত জুড়ে এগিয়ে চললাম আমরা, অবশেষে বিশ্রামের জন্যে থামার আদেশ করলো ট্যানাস। এরপর আবারো সকাল পর্যন্ত ছুটলাম, যতক্ষণ পর্যন্ত না সামনের দিগন্ত মরীচিকায় নাচতে শুরু করে দিলো। সম্পূর্ণ মৃত এই মরু, বেবুনের দল আর মাথার উপরে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ঘুরতে থাকা শকুনের দল ছাড়া আর কোনো প্রাণী আমার চোখে পড়ে নি। পানি মুখে তুলবার আগেই বাষ্প হয়ে উড়ে যায়, এমন দাবদাহ এখানে। বাহিনীর সদস্যদের মেজাজেও প্রভাব পড়লো তার । একে অপরের প্রতি ক্রমশই অসহিষ্ণু হয়ে পড়তে লাগলাম আমরা।
