*
পরদিন আঁধার থাকতে থাকতেই রওনা হলাম আমরা। কাঁধে লানাটা নিয়ে ক্যারাভানের সামনে রইলো ট্যানাস, তার ঠিক পেছনেই আমি। নারীর মোহনীয় বৈশিষ্ট্যের কোনো কমতি রইলো না আমার পদক্ষেপে। আমাদের পেছনে এক সাড়িতে চলেছে খচ্চরের দল, বহুল ব্যবহৃত পথ অনুসরণ করছি আমরা। খচ্চরগুলোর দু পাশে সারি বেঁধে হেঁটে চলেছে দাসী মেয়েরা, ওদের অস্ত্রগুলো খচ্চরের পিঠে, লোকচক্ষুর অন্তরালে। প্রয়োজন হলে কেবল হাত বাড়ালেই নিয়ে নিতে পারবে।
আসতেস, রেমরেম এবং ক্রাতাসের নেতৃত্বে ছয়জনের একটি করে দলে তিনভাগ হয়ে গেছে আমাদের প্রহরীরা। যোদ্ধা হিসেবে আসতেস এবং রেমেরেম-এর যথেষ্ট সুনাম আছে। কেবল ট্যানাসের সাথে থাকার জন্যেই বহুবার পদোন্নতি নেয় নি তারা। নিজের চারপাশের মানুষগুলোর প্রতি এহেন প্রভাব ছিলো ট্যানাসের। কী অসাধারণ একজন ফারাও হতে পারতো ওভেবে আবারো আপ্লুত হলাম। দেখে মনে হয়, মেয়েগুলো যেনো পালিয়ে না যায়, এ জন্যে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে প্রহরীরা। আদতে, সৈনিকের চালে না ছোটার জন্যে ওদের বলতে বলতে মুখ ব্যথা করে ফেলছে তারা।
ওই ছুকরী! রেমরেমকে বলতে শুনলাম। এতো বড়ো বড়ো পা ফেলো না, শালী। বরঞ্চ ওই বিশাল পাছাটা একটু দোলাও! একটু আকর্ষণীয় ভঙিতে হাঁটো!
একটা চুমো দাও না, মরদ আমার! উত্তরে বললো কারনিত, তুমি যা চাও, তাই করবো তাহলে!
ধীরে ধীরে চড়ছে রৌদ্র। মরীচিকায় নাচতে শুরু করেছে সামনের পর্বতশ্রেণী। আমার দিকে ফিরলো ট্যানাস। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিশ্রামের জন্যে থামবো আমরা। প্রত্যেকের জন্যে এক পাত্র করে
হে আমার উদার স্বামী, ওকে বাধা দিয়ে বললাম, আপনার বন্ধুরা চলে এসেছে। সামনে দেখুন!
পেছনে ফিরে তাকিয়ে নিজের অজান্তেই পিঠে ঝোলানো ধনুকের ছিলোয় হাত বোলালো ট্যানাস। আহা, কী অপূর্ব!
ঠিক সেই মুহূর্তে পাহাড়ের সংকীর্ণ পেঁচানো ঢাল ধরে নামছিলাম আমরা। দুই পাশে খাড়া উঠে গেছে পাহাড়ের গা । আমাদের সামনের পথ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে তিনজন। সবার সামনে দাঁড়ানো লোকটা লম্বা অবয়বের, ভীষণ স্বাস্থ্যের মরুর বেদুইনের পোশাক পরনে, মুখ-মাথা অবশ্য খোলা। মিশমিশে কালো মুখাবয়বে গুটি বসন্তের বিচ্ছিরি দাগ ভরা, শকুনের ঠোঁটের মতো লম্বা নাক, এক চোখের কোটর হাঁ হয়ে চেয়ে আছে।
এক চোখা শয়তানটাকে চিনি আমি, নরম স্বরে জানালাম ট্যানাসকে। ওর নাম শুফতি। শ্রাইকদের সমস্ত নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য। ওর থেকে সাবধান। সিংহ এর তুলনায় কিছুই না!
কোনো কথা না বলে হাত উঁচিয়ে দেখালো ট্যানাস, ওর কাছে কোনো অস্ত্র নেই। এরপরে আমুদে স্বরে মুখ খুললো সে, তোমার দিনগুলো জেসমিনের সুবাসে ভরে উঠুক, হে দ্র-পথিক। পথ চলা শেষ হতে তোমার দরোজায় মিষ্টি একটা বউ অপেক্ষায় বসে আছে এই কামনাই করি।
তৃষ্ণ-ভূমি পাড়ি দেওয়ার সময়ে তোমার পানির থলে পরিপূর্ণ থাকুক, ঠাণ্ডা বাতাস আদরের পরশ বুলিয়ে দিক অভিবাদন জানাই। হেসে প্রত্যুত্তর করে শুফতি। চিতাবাঘের হাসি। দগদগ করছে একটা মাত্র চোখ।
তুমি অত্যন্ত সদয়, হে পথিক, ধন্যবাদ জানিয়ে ট্যানাস বলে, আমার আতিথেয়তা গ্রহণ করো, আমাদের দু জনের সামনেই দীর্ঘ পথ পরে আছে। খাবার পর এসো প্রার্থনা করি।
একটু কাজ বাকি আছে, আসিরীয় বন্ধু। সামনে এসে পথ আটকে দাঁড়ালো শুফতি। নিরাপদে নীল নদের তীরে পৌঁছুতে হলে যে জিনিস তোমার লাগবে, ওটা এখন আমার কাছে যে। ছোট্ট একটা বস্তু বাড়িয়ে ধরে সে।
বাহু, কী অবাক কাণ্ড! স্বরে আমোদ ফুটিয়ে ট্যানাস বলে। তুমি কী জাদুকর নাকি হে? কি দিতে চাচ্ছ আমাকে?
পাখির পালক, তখনো হাসছে শুফতি। শ্রাইকের প্রতীক চিহ্ন।
যেনো বাচ্চাদের কোনো কথা পাত্তা না দিয়ে হাসলো ট্যানাসও। তো ঠিক আছে, ওটা দিয়ে দাও যার যার পথে চলে যাই আমরা।
উপহারের বদলে উপহার দিতে হয়। শুফতি বললো। তোমার বিশজন দাসী মেয়ে আমাকে দাও। এরপর, যখন মিশর থেকে ফিরে আসবে, বাকি আটজনের বিক্রির লাভের অর্ধেক দিতে হবে।
একটামাত্র পালকের বিনিময়ে? ঠোঁট উল্টালো ট্যানাস। এটা কোনো সওদা হলো?
এ কোনো সাধারণ পালক নয়। এটা শ্রাইকের পালক। মনে করিয়ে দিয়ে শুফতি বলে। এখনও কি ওই পাখির নাম শুনো নি তুমি?
দেখি, তোমার ওই পালকে কী আছে? ডান হাত বাড়িয়ে ধরে শুফতির উদ্দেশ্যে এগোয় ট্যানাস। সাথে সাথে ক্ৰাতাস, রেমরেম এবং আসতেস-ও এগোয়, যেনো ওরাও পালকটা পরীক্ষা করে দেখতে চাইছে।
নিমিষে শুফতির হাত আঁকড়ে ধরে মুচড়ে দুই কাঁধের মাঝখানে নিয়ে গেলো ট্যানাস। কঁকিয়ে উঠে মাটিকে বসে পড়লো সে, সহজে ধরে থাকলো ট্যানাস ওকে। ঠিক একই সময়ে ক্ৰাতাস এবং অন্যরা সামনে বেড়ে বাকি দু জনেরও একই হাল করে ফেললো। হাতের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে ট্যানাসের সামনে হাজির করা হলো দুই দস্যুকে।
তো, তোমরা পুঁচকে পাখির দল আসিরীয়ার কারিককে ভয় দেখাতে চাচ্ছিলে? হুমম, পাখির পালকের সওদাগর, শ্রাইকদের কথা আমি শুনেছি। শুনেছি, কিচির-মিচির একটু বেশিই করে তারা, কাপুরুষের বাচ্চা একেকটা। শুফতির হাত ধরে একটা মোচড় লাগাতে যন্ত্রণায় গুঙিয়ে উঠে সে, মুখ মাটিতে চেপে বসেছে। হ্যাঁ, শ্রাইকদের কথা আমি শুনেছি। কিন্তু, ভয়ঙ্কর কারিকের নাম শুনেছো তোমরা? ক্ৰাতাস কে মাথা নেড়ে ইশারা করে ট্যানাস। মুহূর্তেই তিন দস্যুকে একেবারে ন্যাংটো করে মাটির উপর হাত-পা ছড়িয়ে ফেলে রাখে তারা।
