দ্রুতই সাফাগা বন্দরের একজন বণিক প্রস্তাব করে বসলো ট্যানাসকে। সব কটি মেয়েকেই কিনে নিতে চায় সে, এতে করে মরুর উপরে দীর্ঘ-কষ্টকর যাত্রার প্রয়োজন হবে না তাদের। তীব্র হাসিতে তাকে উড়িয়ে দেয় ট্যানাস।
আপনি কী জানেন, ওই যাত্রায় বহু সমস্যা আছে? ভদ্রলোক জোর করতে লাগলো। নীল নদে পৌঁছার অনেক আগেই নিরাপদ যাত্রার জন্যে পণ দিতে বাধ্য করা হবে আপনাকে লাভের সব অংশই তাতে চলে যাবে।
কে বাধ্য করবে আমাকে? ট্যানাস বলে। কাউকে এমনিতে কিছু দিই না আমি।
আরে, রাস্তা আটকে পাহারা দিচ্ছে দস্যুরা, বণিক সতর্ক করে দিয়ে বলে, যদি আপনি তারা যা চায়, দিয়েও দেন নিরাপদে যেতে দেবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বিশেষত, যে জিনিস নিয়ে যাচ্ছেন বরঞ্চ আমার কাছে ভালো দামে বেচে দিন, লাভও হবে–
আমার সাথে সশস্ত্র প্রহরী আছে, কাতাস আর তার ছোটো বাহিনীর দিকে ইঙ্গিত করে ট্যানাস। যে কোনো দস্যুর জন্যে ওরাই যথেষ্ট। এই কথায় দর্শনার্থীরা একে অপরের গা টেপা-টিপি শুরু করে দিলো।
কাঁধ ঝাঁকানো বণিক। ঠিক আছে, আমার সাহসী বন্ধু। পরের বার যখন মরুপথে যাবো, পথের ধারে তোমার কঙ্কাল খুঁজে দেখবো খন। লাল দাড়ি দেখে ঠিকই চেনা যাবে।
কথা অনুযায়ী চল্লিশটি খচ্চর তৈরি রেখেছিলো তিয়ামাত। এর মধ্যে বিশটিতে আছে পানির থলে, বাকিগুলোতে আমাদের মাল-সামান চাপানোর জন্যে জিন বসানো।
এতোজন দর্শনার্থীর সামনে বেশি সময় এখানে থাকার ইচ্ছে নেই আমার। সামান্য একটা ভুলের কারণে ধরা পড়ে যেতে পারে বোরখার আড়ালের মানুষগুলোর সত্যিকারের লিঙ্গ-পরিচয়। আর তাহলেই সব শেষ। দ্রুতই প্রহরীরা ঠেলে-ধাক্কিয়ে পথ করে দিতে লাগলো, কোনোদিকে না তাকিয়ে, আশেপাশের উৎসুক পুরুষদের তীর্যক মন্তব্যে কর্ণপাত না করে হেঁটে চললো দাসী মেয়েদের দলটা। কিছু সময়ের মধ্যেই শহর অতিক্রম করে খোলা মাটিতে চলে এলাম আমরা।
সাফাগার দৃষ্টি-সীমার মধ্যেই প্রথম রাতে ক্যাম্প ফেললাম। প্রথম গিরিপথের আগে কোনো রকম আক্রমণ আশা করছি না আমি, তবে কোনো সন্দেহ নেই, শ্রাইকদের চর নজর রাখছে আমাদের উপর। আলো থাকা পর্যন্ত অভিনয় চালিয়ে গেলো দাসী মেয়েরা মুখ-মাথা ঢাকা থাকলে তাদের; প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার সময় বসে কাজ সারলো তারা।
রাত নামার পর ট্যানাসের নির্দেশে খচ্চরের পিঠ থেকে বাক্সগুলো নামানো হলো, একটি করে অস্ত্র বরাদ্দ করা হলো প্রতিটি দাসী মেয়ের জন্যে। বিছানার মাদুরের নিচে খোলা তরবারি আর ধনুক তৈরি রেখে ঘুমোলো সবাই ।
ক্যাম্পের চারধারে দ্বিগুন প্রহরা মোতায়েন করা হলো। সবকিছু পরীক্ষা করে সন্তুষ্ট হতে, আমি আর ট্যানাস রাতের অন্ধকারে সাফাগা বন্দরে ফিরে এলাম। পথ দেখিয়ে অপেক্ষমাণ তিয়ামাতের ঘরে নিয়ে এলাম আমি তাকে, রাতের খাবার নিয়ে বসেছিলো সে আমাদের জন্যে। ট্যানাসের সাথে পরিচিত হয়ে দারুন উত্তেজিত বোধ করছে তিয়ামাত।
আপনার সুনাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে, প্রভু হেরাব। আপনার বাবাকেও চিনতাম আমি একজন প্রকৃত পুরুষ-মানুষ ছিলেন। ট্যানাসকে অভ্যর্থনা জানিয়ে বললো সে। অবশ্য, গুজব শুনেছি মরুতে মারা গেছেন আপনি, আপনার দেহ এখন শব-প্রস্তুতকারীদের জিম্মায় তবুও, আমার বাড়িতে আপনাকে স্বাগতম।
তিয়ামাতের পরিবেশিত খাদ্য উপভোগে ব্যাপৃত হলাম আমরা দুজন। শ্রাইকদের সম্বন্ধে বিষদ জেনে নিতে লাগলো ট্যানাস; খোলাখুলি উত্তর দিয়ে গেলো তিয়ামাত, যা যা তার জানা আছে, সবই বললো।
অবশেষে আমার পানে চেয়ে ইশারা করলো ট্যানাস। তিয়ামাতের দিকে ফিরে বললো, আমাদের প্রতি তুমি অত্যন্ত সদয়, তিয়ামাত। কিন্তু তোমাকে সবটুকু সত্যি বলা হয় নি। অবশ্য তার প্রয়োজন ছিলো আমাদের পরিকল্পনার কথা গোপন রাখা একান্তই জরুরি। তো এখন বলছি শোনো আমার উদ্দেশ্য হলো শ্রাইকদের মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে, ওদের দলনেতাদের ফারাও-এর বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো।
হেসে দাঁড়িতে হাত চালালো তিয়ামাত। খুব একটা অবাক হয়েছি বলবো না, বলে চলে সে, ওরিসিসের উৎসবে ফারাও আপনার উপর কী দায়িত্ব দিয়েছেন, তা আমি জানি। এছাড়া, ওই দস্যুদের সম্পর্কে আপনার আগ্রহ থেকে ব্যাপারটা আঁচ করে নিয়েছিলাম। দেবতাদের কাছে বলি দেবো আমি, আপনার সাফল্যের জন্যে, প্রভু হেরাব।
সফল হতে হলে তোমার সাহায্য আবারো প্রয়োজন হবে, তিয়ামাত, ট্যানাস বললো।
শুধু বলেই দেখুন।
কি মনে হয়, শ্রাইকেরা আমাদের ক্যারাভানের খবর পেয়ে গেছে?
সমগ্র সাফাগা আপনাদের ক্যারাভানের কথা বলছে, উত্তরে বললো তিয়ামাত। এই মৌসুমে আসা সবচেয়ে মূল্যবান ক্যারাভান ওটা। আশিজন সুন্দরী দাসী মেয়ে, কম করে হলেও প্রত্যেকে হাজার স্বর্ণ-আংটিতে বিকোবে কারনাকের বাজারে। মুচকি হেসে মাথা নাড়ে তিয়ামাত। নিশ্চিত থাকুনশ্ৰাইকেরা আপনাদের খবর জানে। সেদিন বন্দরে কমপক্ষে ওদের তিনজন চর দেখেছি আমি, প্রথম গিরিপথের কাছে যাওয়ার আগেই পণ দাবি করবে তারা। এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
আমাদের বিদায়ের ক্ষণ চলে আসতে দরোজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলো তিয়ামাত। প্রার্থনা করি–সব দেবতারা যেনো আপনাদের সহায় হয়। কেবল ফারাও-ই নন, এই দেশের প্রতিটি নাগরিক আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে যদি ভয়ঙ্কর দস্যুদের কবল থেকে আমাদের মুক্ত করতে সক্ষম হন। বিদায়, প্রভু হেরাব।
