টাকাটা দাও কী ভাবে? জানতে চাইলাম। পরিমাণ নির্ধারণ করে কে? এসে নিয়ে যায়-ই বা কে?
বন্দরে ওদের চর আছে। প্রতিটি জাহাজ থেকে কী নামানো হয় সব হিসাব আছে তাদের কাছে। গিরিপথের কাছে যাওয়ার আগেই কোনো ক্যারাভানে কী আছে জানা হয়ে যায় তাদের। ওখানে, একজন দস্যু-প্রধান এসে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দাবি করে।
মধ্যরাতের অনেক পরে একজন দাস ডেকে, আলো হাতে আমার জন্যে সাজিয়ে রাখা প্রকোষ্ঠে নিয়ে এলো তিয়ামাত।
সকালে আমি জাগবার আগেই তো চলে যাবে তুমি, আমাকে আলিঙ্গন করে বললো সে। বিদায়, বন্ধু। তোমার কাছে আমার ঋণ শোধ হয় নি পুরোপুরি। যখন প্রয়োজন একবার ডেকেই দেখো, চেষ্টা করবো সাহায্য করার।
সেই পথ-দেখানো দাস ছেলেটা সকালে সূর্যোদয়ের আগেই আমার ঘুম ভাঙিয়ে, সমুদ্রের ধারে নিয়ে এলো। চারপাশে তখনো ভীষণ অন্ধকার। তিয়ামাতের নৌবহরের একটা চমৎকার সওদাগরী নৌকা নোঙর করা রয়েছে ঘাটে। আমি চড়ে বসতে না বসতেই নোঙর তুলে ফেলা হলো।
মধ্য-সকালে, প্রবালের মাঝখান দিয়ে পথ করে ছোট্ট জেলেদের গ্রামটার সামনে পৌঁছে গেলাম। বালুকাবেলায় দাঁড়িয়ে ট্যানাস অপেক্ষা করছিলো আমার জন্যে।
*
আমার অনুপস্থিতির সময়টাতে হাড় জিড়জিড়ে ছয়টা খচ্চর সহ করতে সমর্থ হয়েছে ট্যানাস। তিয়ামাতের নৌকার নাবিকেরা ধরাধরি করে সাফাগা থেকে আমার-নিয়ে-আসা বড়ো বড়ো বাক্স গুলো তুলে দিলো ওগুলোর পিঠে। নৌকার প্রধানকে আমরা ফিরে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করার কঠোর নির্দেশ দিয়ে খচ্চরগুলো সমেত জেবেল-নাগারা কুয়োর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম আমি এবং ট্যান্যাস।
প্রচণ্ড গরম, ধুলো আর মাছির অত্যাচার সয়ে সয়ে একেবারে বিরক্ত হয়ে গেছে কাতাসের লোকেরা। আমাদের দেখতে পেয়ে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না তারা। যোদ্ধাদের সামনে প্রথম খচ্চরের পিঠ থেকে নামানো বাক্সটা খুললাম আমি। ওটার ভেতর থেকে বেরুলো একজন দাসী মেয়ের পোশাক-পরিচ্ছদ দেখে দারুন আমোদ পেলো যোদ্ধার দল। আরো উন-আশিটি পোশাক একে একে বেরুতে রীতিমতো তর্ক বাধিয়ে দিলো তারা।
ক্রাতাসের দুই জন সহযোগীর সাহায্যে একে একে প্রত্যেক প্রহরী-সৈনিকের সামনে একটা করে মেয়েদের পোশাক সাজিয়ে রাখলাম, বালুর উপর। এবারে গর্জে উঠে ট্যানাস, কাপড় খুলে, নিজেদের সামনে রাখা পোশাক পরে নাও সবাই! তুমল প্রতিবাদ, শোরগোলে একেবারে ভজগট বেঁধে যাওয়ার দশা হলো, শেষমেষ ক্ৰাতাস এবং তার উচ্চ-পদস্থ লোকেরা মিলে কঠোর নির্দেশ দিতে নিতান্ত অনিচ্ছায় মেনে নিলো তারা।
আমাদের মেয়েরা স্বল্প-বসন পরে থাকে। বেশিরভাগ সময় বুক এবং পা উন্মুক্ত রাখতেই অভ্যস্ত তারা। কিন্তু আসিরীয় মহিলারা মাটিতে হেঁচরানো ঘাগড়া, দুই-হাত সম্পূর্ণ ঢাকা কাপড় পরে। এমনকি, কপট-নম্রতার নিদর্শন স্বরূপ বাইরে গেলে মুখ পর্যন্ত নেকাবে ঢেকে রাখে তারা, সম্ভবত তাদের পুরুষদের নির্দেশে। এখানেও দেখুন, আমাদের এই সূর্যালোকিত মিশরের তুলনায় ওখানে, যেখানে আকাশ-ফুটো-করে পানি ঝরে কঠোর-সাদা হয়ে জমা হয় পর্বতের মাথায় যেখানে মৃত্যুর মতো ঠাণ্ডা বাতাস হাড়-মাংস জমিয়ে দেয় সেখানকার কতো বিশাল তফাত।
মেয়েদের পোশাকে নিজেদের সজ্জিত করে একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসিতে ফেটে পড়ে প্রহরীরা। কিছু সময়ের মধ্যেই গোড়ালী ছুঁই-ছুঁই ঘাগড়া পরা, মুখ নেকাবে ঢাকা আশিটি দাসী মেয়ে ঘোরাফেরা করতে থাকে আমাদের সম্মুখে। তাদের পাছা দোলানো হাঁটার ভঙি দেখে হেসে খুন হতে হয়।
গাম্ভীৰ্য্য ধরে রাখা মুশকিল হয়ে পড়ে আমাদের জন্যে। এই হট্টগোলের মাঝখানে নিজেকে অভিবাদন জানালাম আমি, আমার নির্দেশেই বাহিনীর সবচেয়ে ছোটোখাটো, পাতলা শরীরের সৈনিকদের সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলো ক্ৰাতাস। এই মুহূর্তে ওদের দিকে তাকিয়ে আশ্বস্ত হলাম এরা এই ছলনা বজায় রাখতে সক্ষম হবে। কেবল নারী-আচরণের উপর সামান্য দীক্ষার প্রয়োজন এখন।
*
পরের দিন সকালে ছোট্ট জেলেদের গ্রামটাতে পৌঁছুলো আমাদের অদ্ভুত ক্যারাভান, সোজা তীরে গিয়ে আমাদের জন্যে অপেক্ষমাণ সওদাগরী নৌকায় চড়ে বসলাম আমরা। ক্ৰাতাস এবং তার আটজন পদস্থ যোদ্ধা পাহারায় রইলো। এতো মূল্যবান সম্পদের জন্যে কোনো রকম প্রহরার অনুপস্থিতি সন্দেহের উদ্রেগ করতে বাধ্য। ভাড়াটে প্রহরীর ছদ্মবেশে থাকা নয়জন যোদ্ধা এই দলের জন্যে যথেষ্ট, কিন্তু শ্রাইকদের কোনো দলকে ভড়কে দেওয়ার জন্যে খুবই অপ্রতুল।
দামী আলখাল্লা, মাথায় পাগড়ী ইউফ্রেতিস নদীর ওপার থেকে আসা কোনো ধনী সওদাগরের মতোই দেখাচ্ছে ট্যানাসকে। ঘন দাড়ির জঙ্গল মুখে, আসিরীয়দের পছন্দমতো ওগুলোকে টেনে বেণী করে দিয়েছি আমি। অনেক উত্তরে, সেই উঁচু পর্বতেরও ওপারে বসবাসকারী বহু এশীয়দের গায়ের রঙ অনেকটা ট্যানাসের মতোই।
ওর ঠিক পেছনেই চলেছি আমি। লম্বা ঘাগড়া, নেকাব পড়নে সঙ্গে আসিরীয় বধূদের মতো অলঙ্কার। সাফাগার কেউ যেনো আমাকে চিনে না ফেলে তার সব ব্যবস্থাই করা হয়েছে।
পুরোটা নৌ-যাত্রায় আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে রইলো দলের সবাই। এরা নীল নদের শান্ত পানিতে চলাচল করে অভ্যস্ত, সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে নয়।
সাফাগা বন্দরের বেলাভূমিতে পা রাখতে পেরে দারুন স্বস্তিবোধ করলাম আমরা । এদিকে আমাদের আগমন রীতিমতো শোরগোল ফেলে দিলো। প্রেমের কলা-কৌশলে আসিরীয় মেয়েদের সুনাম আছে। প্রচলিত আছে, এদের মধ্যে অনেকে এমন কলাও জানে, যা এক হাজার বছরের পুরোনো মমি পর্যন্ত জীবিত করে ফেলতে সক্ষম। বোরখার ওধারে সব কটি মেয়েই যে অনিন্দ্য-সুন্দর–এ ব্যাপারে দর্শনার্থীদের মনে কোনো সন্দেহ নেই। একজন ধূর্ত এশীয় ব্যবসায়ী নিশ্চই ভালো দাম পাওয়ার আশা না থাকলে, এতোদূর থেকে, এতো কষ্ট করে ওদের বয়ে নিয়ে আসতো না।
