জগতে দেবতাদের সমস্ত অনুগ্রহই মোহিত করে আমাকে, আর এখন, বালুর উপর ছড়িয়ে ফেলা রুপালি মাছ পর্যবেক্ষণে চললাম। জেলেদের কাছে একের পর এক প্রশ্ন করে জেনে নিতে লাগলাম ওগুলোর নাম। রঙধনুর রঙের পসরা যেনো বসেছে এখানে–আফসোস হলো, কেননা যে আমার রঙ-তুলি আর স্ক্রোলগুলো নিয়ে এলাম না।
সমস্ত মাছ নামানো হতে, একটা ছোটো নৌকায় চড়ে বসলাম আমি, হাত নেড়ে বিদায় জানালাম ট্যানাসকে। মাছের বোঁটকা গন্ধে বমি আসতে চায়। জলপথ পেরিয়ে ওপাশের রীফে আমাকে পৌঁছে দেবে নৌকটা। আমার পরিকল্পনার পরবর্তী অংশ সম্পন্ন করার জন্যে প্রয়োজনীয় উপকরণ নিয়ে আমি ফিরে আসা পর্যন্ত এখানেই অপেক্ষায় থাকবে ট্যানাস। আগের বারের মতোই, আমি চাই না কেউ চিনে ফেলুক ট্যানাসকে। এই মুহূর্তে ওর কাজ হলো এটা নিশ্চিত করা, যেনো কোনো জেলেই গ্রাম ছেড়ে মরুতে গিয়ে শ্রাইকদের সতর্ক করে আসতে না পারে ।
সাগরের প্রথম বড়ো ঢেউয়ে নাক ডুবিয়ে দেয় আমাদের ছোটো নৌকা, ভয়ঙ্কর বিপদজনক তটরেখার সমান্তরালে বাতাসের গতিপথ ধরে উত্তরে রওনা হলো মাঝি। পৌঁছুতে খুব বেশি সময় লাগলো না। রাত নামার আগেই গলুইয়ের সামনে, দিগন্তে জেগে উঠলো সাফাগা বন্দরের পাথুরে বাড়ি-ঘর ।
৪. সাফাগা বন্দর
বিগত প্রায় এক হাজার বছর ধরেই পূর্ব থেকে সমস্ত ব্যবসা বাণিজ্যের দ্রব্য সাফাগা বন্দরের মাধ্যমে আমাদের এই উচ্চ-রাজ্যে আসে। নৌকার গলুইয়ে দাঁড়িয়ে উত্তরের দিগন্তে বড়ো বড়ো জাহাজের আকৃতি দেখতে পেলাম; সাফাগা এবং বিভিন্ন আরবীয় বন্দরের মধ্যে আসা-যাওয়া করে ওগুলো।
বন্দরের বেলাভূমিতে যখন পা রাখলাম, আঁধার ঘনিয়েছে তখন। আমার আগমন কেউ দেখেছে বলে মনে হলো না। ইনটেফের ব্যবসার খাতিরে বহুবার আসতে হয়েছে এখানে সব কিছু তাই আমার চেনা। রাতের এই সময়ে পুরোপুরি নির্জন পড়ে আছে বন্দরের রাস্তা-ঘা। দ্রুত পায়ে হেঁটে বণিক তিয়ামাতের বাড়ির উদ্দেশ্যে চলেছি। পুরোনো এই শহরতলীর ধনী ব্যবসায়ী সে, সবচেয়ে বড়ো বাড়িটা তারই। বাড়ির সামনে প্রহরায় রয়েছে একজন সশস্ত্র দাস।
তোমার মালিককে গিয়ে বলো, কারনাকের যে শল্যবিদ তার পা বাঁচিয়েছিলো একদা সে এসেছে, বললাম তাকে। কিছু সময়ের মধ্যে তিয়ামাত স্বয়ং ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে এসে অভিবাদন জানালো আমাকে। তবে অন্য সবার সামনে আমার নাম ধরে ডাকার মতো নির্বুদ্ধিতা দেখালো না সে। ওর দেয়াল-ঘেরা বাগানে বসতে, বিস্ময়ের সুরে বললো, সত্যি তুমি টাইটা? আমি তো শুনেছি, গজ-দ্বীপে শ্রাইকদের আক্রমণে নিহত হয়েছো তুমি।
মধ্য-বয়স্ক, মোটাসোটা আকৃতির মানুষ তিয়ামাত, ভরাটে মুখাবয়ব-তীক্ষ্ণ, ধূর্ত মনের অধিকারী। বহু বছর আগের কথা, লোকজন ধরাধরি করে আমার কাছে নিয়ে এসেছিলো তাকে। শ্রাইকরা মেরে, সমস্ত মালামাল লুটপাট করে মরতে ফেলে রেখে গেছিলো তাকে। প্রায় বরবাদ হতে যাওয়া একটা পা রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিলাম আমি–তবে এখনো খুঁড়িয়ে হাঁটতে হয় বেচারাকে।
তোমার মৃত্যুর খবরটা একটু আগে-ভাগেই আমার কাছে চলে এসেছিলো-ভালোই লাগছে দেখে, মুচকি হেসে যোগ করে তিয়ামাত। হাততালি দিয়ে তার ভৃত্যদের ডাকলো সে, কিছু ক্ষণের মধ্যেই মিষ্টি ঠাণ্ডা শরবত এবং আঙুর পরিবেশন করা হলো আমার জন্যে।
কিছুসময় এটা-ওটা আলোচনার পর, তিয়ামাত কোমল স্বরে জানতে চাইলো, তোমার জন্যে কি করতে পারি? আমার জীবন বাঁচিয়েছো তুমি, টাইটা শুধু বলল, কী সাহায্য প্রয়োজন। আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে চেষ্টা করবো।
আমি রাজার পক্ষ থেকে এসেছি, বলে, জামার ভেতর থেকে বাজপাখির প্রতীক বের করে দেখালাম তাকে।
দারুন চিন্তিত হয়ে গেলো তিয়ামাত। ফারাও-এর প্রতীক আমার সম্মান গ্রহণ করুক। কিন্তু, ওটা দেখানোর কোনো প্রয়োজন ছিলো না। কেবল বলো, কী সাহায্য করতে পারি? আমি তোমার জন্যে সবকিছু করতে রাজী।
নীরবে আমার কথা শুনতে লাগলো সে। শেষ হতে, তার বার্তাবাহকে ডেকে পাঠিয়ে নির্দেশ দিলো আমার সম্মুখে। লোকটি চলে যাওয়ার আগে, আমার উদ্দেশ্যে ফিরলো তিয়ামাত, কিছু ভুল-ভালো বলি নি তো? আর কিছু প্রয়োজন তোমার?
তোমার উদারতার তুলনা হয় না, তিয়ামাত, বললাম তাকে। কিন্তু আরো একটি জিনিস প্রয়োজন আমার লেখার সরঞ্জাম।
বার্তাবাহকের দিকে ফিরে তাকায় তিয়ামাত। খেয়াল রেখো একটা থলিতে যেনো স্ক্রোল, তুলি এবং কালির পাত্র থাকে।
নির্দেশ নিয়ে সে চলে যেতে, অর্ধেক রাত পর্যন্ত গল্প করে কাটালাম আমরা দু জন। উচ্চ-রাজ্যের ব্যস্ততম ব্যবসাক্ষেত্রের ঠিক মাঝখানে তিয়ামাতের রাজত্ব; যেখানে যে ঘটনাই ঘটুক সব তার নখদর্পনে। গজ-দ্বীপে বসে এক মাসে যা জানতে পারতাম, এখানে তার বাগানে কয়েক ঘণ্টায় তার চেয়ে বেশি জানা হয়ে গেলো আমার।
এখনো কি ক্যারাভান চলাচলের জন্যে শ্রাইকদের চাঁদা দাও? আমার প্রশ্নের উত্তরে অসহায়ের মতো কাঁধ ঝাঁকালো সে।
আমার পায়ের এই দশার পড়ে এ ছাড়া আর কী করার আছে? প্রতি মৌসুমেই আগের চেয়ে বেশি পরিমাণে দাবি করছে তারা। সাফাগা ছেড়ে যাওয়া সমস্ত মালের এক-চতুর্থাংশ; থিবেসে ওগুলো বিক্রির লাভের ঠিক অর্ধেক টাকা দিতে হয়। এমনভাবে চলতে থাকলে দ্রুতই পথের ফকির হয়ে যাবো এই ব্যবসা আর চলবে না।
