সমুদ্রগামী পথ ধরে আমাদের সঙ্গে থাকার চেষ্টা করো, যদি ওখানে গিয়ে না পাও–তবে জেবেল-নাগারা মরুদ্যানে আমাদের ক্যাম্প পাবে। ওখানে তোমাদের জন্যে অপেক্ষা করবো আমরা, পিছন থেকে চিৎকার করে ক্ৰাতাসকে জানালো ট্যানাস, আর, অবশ্যই আমার ধনুক লানাটানিয়ে এসো!
*
ক্ৰাতাস চোখের আড়াল হতেই বাহিনীর বাকি সদস্যদের একত্র করে বিপরীত দিকের সমুদ্র অভিমুখী ক্যারাভান চলাচলের পথ ধরে রওনা হলো ট্যানাস।
নীল নদের তীর থেকে লোহিতসাগর অভিমুখে চলা রাস্তাটি দারুন দীর্ঘ এবং বন্ধুর। বিশাল ক্যারাভানে করে যেতেও বিশ দিনের মতো সময় লেগে যায় । দিন-রাত দৌড়ে চললাম আমরা, চারদিনে পাড়ি দিলাম এই দূরত্ব। যাত্রার শুরুতে আমাদের দুজনের কেউই ঠিক সুস্থ অবস্থায় ছিলাম বলা যাবে না, কিন্তু যতক্ষণে জেবেল-নাগারা মরুদ্যানে পৌঁছুলাম আমরা শরীরের শেষ মেদটুক পর্যন্ত ঝড়িয়ে ফেলেছে ট্যানাস, সুরার প্রভাব আর অবশিষ্ট নেই ওর মাঝে। কঠোর, পাতলা হয়ে গেছে ও। প্রচণ্ড কষ্ট হলেও আত্মসম্মান বজায় রাখার খাতিরে সৈনিকদের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটেছি আমিও। যাত্রাপথে নীল নদের উদ্দেশ্যে চলা দুটো বড়ো ক্যারাভোনের সাথে দেখা হলো। দুনিয়ার মাল সামানে বোঝাই খচ্চরগুলোর শীর্ণ পা বাকা হয়ে গেছে বোঝার ভারে; বণিক কিংবা তাদের সাহায্যকারীর চেয়ে সশস্ত্র পাহারাদারের সংখ্যা অনেক বেশি। শ্রাইকদের মোটা অংকের উপঢৌকন না দিতে চাইলে এমন সশস্ত্র পাহাড়া ছাড়া কোনো গতান্তর নেই।
আগন্তুক কারো সঙ্গে দেখা হলেই শাল দিয়ে নিজের মুখ আড়াল করে ফেললো ট্যানাস, সোনালি চুলগুলোও এতে করে ঢাকা পড়লো। এতোই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ দৈহিক অবয়বের মানুষ সে, যে কেউ একবার দেখলে চিনে ফেলতে পারে। অন্যান্য পথিকের শুভেচ্ছা বা প্রশ্নের কোনো জবাব না দিয়ে পথ চলেছি আমরা–এমনকি কারো পানে সরাসরি তাকাই নি পর্যন্ত।
সমুদ্র তীর থেকে এক দিনের মতো দূরত্বে থাকতে ক্যারাভান রাস্তা ছেড়ে পুরোনো একটা পায়ে হাঁটা পথ ধরে দক্ষিণে চললাম আমরা। বহুকাল আগে এক বেদুঈন বন্ধু পথটা চিনিয়েছিলো আমাকে। এই পুরোনো, সমুদ্রমুখী পথেই রয়েছে জেবেল-নাগারা কুয়ো । বেদুইন বা মরুর দস্যু ছাড়া আর কেউ এখন ব্যবহার করে না এটা।
শেষমেষ যখন জেবেল-নাগারার কুয়োর ধারে পৌঁছলাম, ততদিনে বেশ কষ্ট সহিষ্ণু হয়ে গেছি আমি নিজেও। রাতে, আগুনের পাশে মাঝে-মধ্যেই যাত্রা-সঙ্গীদের লোলুপ দৃষ্টি আমার উপর পড়ছে লক্ষ্য করলাম। এমনকি, সেনাবাহিনীর মতো জায়গাতেও আমাদের সমাজের ভিন্নধারার শারীরিক ভোগ-বিলাসের অনুশীলন রয়েছে।
রাতে, ছোরা পাশে রেখে ঘুমালাম। একবার কোনো এক আগ্রহী সৈনিক ওটার খোঁচা খেয়ে টের পেলো আমার সাথে সুবিধা হবে না। এরপর থেকে রাতে আর অনাহুত প্রেমিকের জ্বালাতন সহ্য করতে হলো না।
কুয়োর ধারে পৌঁছার পর ট্যানাসও বিশ্রাম নিতে সম্মত হলো। কাতাসের অপেক্ষায় থাকলাম আমরা, দৌঁড়-ঝাঁপ, তীর-চালনা, অস্ত্রের প্রশিক্ষণে নিজের বাহিনীকে ব্যস্ত রাখলো ট্যানাস। আমার নির্দেশ মতো বিশাল শরীরের কোনো দৈত্যকে নির্বাচন করে নি ক্ৰাতাস দেখে ভালো লাগলো। ট্যানাস ছাড়াও এরা সবাই পাতলা
শরীরের মানুষ আমার পরিকল্পনা কাজে লাগানোর জন্যে একদম উপযুক্ত।
আমাদের দুই দিন পরে পৌঁছুলো ক্ৰাতাস। বোঝাই যায়, রীতিমতো উড়ে এসেছে। সে।
কী ছিলো সাথে, হে? তাকে স্বাগত জানিয়ে বললো ট্যানাস। পথে কোনো সুন্দরীর দেখা পেয়েছিলে না কি?
দুটো ভারি জিনিস ছিলো আমার কাছে আলিঙ্গনে করে উত্তরে ক্রাতাস জানালো। তোমার ধনুক আর বাজপাখির প্রতীক ওগুলো হাত বদল করতে পেরে ভালো লাগছে। জিনিসগুলো ট্যানাসের কাছে ফিরিয়ে দেয় সে।
সাথে সাথে লানাটা নিয়ে মরুতে চললো ট্যানাস, আমি গেলাম তার সাথে। ছুটন্ত গ্যাজেলের একটা ঝাঁকের উদ্দেশ্যে বৃষ্টির মতো তীর বর্ষণ করলো সে। সেদিন রাতে আগুনের ধারে বসে হরিণের ঝলসানো মাংস এবং কলিজা খেতে খেতে পরবর্তী করণীয় নিয়ে কথা বললাম আমরা।
পরদিন সকালে বাহিনীকে ক্রাতাসের জিম্মায় রেখে, ট্যানাস এবং আমি সমুদ্র তীরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। অর্ধেক দিন লাগলো ছোট্ট জেলেদের গ্রামটাতে পৌঁছুতে; পড়ন্ত বিকেলে শেষ চড়াই টপকে পাহাড়ের উপর থেকে নিচের বিশাল বিস্ত তিতে তাকালাম আমরা দুজন। উন্মত্ত সমুদ্রের সফেন উচ্ছ্বাস দেখলাম প্রাণ ভরে।
গ্রামে প্রবেশ করেই সর্দারকে ডেকে পাঠালো ট্যানাস। কিছু সময়ের মধ্যেই দৌড়ে হাজির হলো সে। বাজপাখির প্রতীক দেখে কূর্নীশ করলো সদার, এতো জোরে মাটিতে মাথা ঠুকলো, ভয় হলো, মাথাটা ফেটেই না যায়! ওকে ধরে দাঁড় করিয়ে দিলাম আমি। নিজের বিশাল পরিবারকে লাথি এবং কনুইয়ের তোয় বাড়ি থেকে বের করে দিলো বুড়ো, আমার আর ট্যানাসের জায়গা হলো সেখানে।
আমাদের মেজবানের দেওয়া মাছের ঝোল এবং সুস্বাদু মদ দিয়ে আহার করলাম আমি এবং ট্যানাস। বিকেলে, ঝকঝকে সাদা বালুকাবেলায় হেঁটে খাড়ির পানিতে স্নান করে নিলাম দু জনে। বেশ গরম হয়ে ছিলো পানি, দারুন আরাম লাগলো। আমাদের পেছনে, বিরাট-বিশাল পাহাড় উঁচু হয়ে রয়েছে মরুর নীল আকাশে। কোনো সবুজের চিহ্ন নেই ওই পাহাড়ে–একেবারে বন্ধ্য। সমুদ্র, পাহাড় আর আকাশের মেলবন্ধন অদ্ভুত শান্তি জাগায় দেহ-মনে, সমস্ত অনুভূতিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে যেনো। কিন্তু বেশিক্ষণ এই সৌন্দর্য্য উপভোগ করা সম্ভব হলো না, মাছ-ধরা জেলে নৌকাগুলো ফিরে আসছে পাঁচটি ছোটো নৌকা, ছোটো ছোটো পালে বাতাস পেয়ে তরতর করে সরু খাড়ি বেয়ে ভেসে এলো। মাছে বোঝাই হয়ে আছে একেকটা, মনে হয় যেনো এখনই ডুবে যাবে ওগুলোর ভারে।
