দৌড়ে আমাকে হারায়, এমন লোক কমই আছে। আমার জানামতে, এক ট্যানাসের পক্ষে সেটা সম্ভব; তারপরেও নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টাটাই করতে হবে তাকে সেটা হতে হলে। নিহত বেদুঈনের পিঠে পা রেখে বর্শাটা টেনে মুক্ত করলাম আমি, এরপরে শেষ শয়তানটার পিছনে ছুটতে লাগলাম।
দুইশ গজও যেতে পারার আগেই তাকে ধরে ফেললাম আমি, এতো হালকা পদক্ষেপে ছুটেছি ব্যাটা টেরই পায় নি, কেউ আছে পেছনে। বর্শার এক খোঁচায় পায়ের রগ কেটে ফেলতে পড়ে গেলো বদমাশটা। হাত থেকে ছুটে গেছে তলোয়ার । মাটিতে হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে থেকে কাঁদতে লাগলো সে, বর্শার খোঁচায় তাকে জর্জরিত করতে লাগলাম।
কোন মেয়েটাকে নিয়ে বেশি মজা করেছো, হে? উরুতে এক খোঁচা লাগিয়ে জানতে চাইলাম, মা, বিশাল পেটসহ নাকি ছোটো মেয়েটা? ওটা বেশি আঁটোসাটো ছিলো, তাই না?
মাপ করো! চেঁচাতে লাগলো বর্বরটা। আমি কিছু করি নি, বাকিরা মজা লুটেছে।
তোর কাপড়ের সামনে তাহলে রক্ত কেননা রে, বললাম তাকে। হালকাভাবে বর্শাটা বেঁধালাম ব্যাটার পেটে। এখন যেমন করে চেঁচাচ্ছিস, বাচ্চা মেয়েটা কি এমন করেই আর্তনাদ করেছিলো?
কুঁজো হয়ে কুণ্ডলি পাকাতে মেরুদণ্ডের পাশে সেধিয়ে দিলাম বর্শার ডগা, মুহূর্তেই পা থেকে নিচ পর্যন্ত অবশ হয়ে গেলো শয়তানটার। ওর দিকে পিছন ফিরে রওনা হলাম আমি।
ঠিক আছে, মারলাম না তোকে। এটা ভালো হলো– পড়ে থাক এখানে।
ট্যানাসের কাছে ফিরে চললাম। দুই হাতে হিঁচড়ে কিছু সময় এগোলো বর্বরটা, পা দুটো মরা সাপের মতো হেঁচরাচ্ছে মাটিতে। এরপর ক্লান্তিতে মুষড়ে পড়লো সে। প্রখর দাবদাহে রাত নামার আগেই মরবে শয়তানটা কোনো সন্দেহ নেই।
ফিরে আসতে, অবাক চোখে আমার দিকে চাইলো ট্যানাস। তোমার মধ্যেও বুনো একটা লোক বাস করে ব্যাপারটা আগে বুঝি নি। অবাক বিস্ময়ে মাথা নাড়লো সে। সব সময় চমকে দাও, টাইটা।
খচ্চরটার পিঠ থেকে পানির থলে নামিয়ে আমার দিকে বাড়িয়ে ধরলো ট্যানাস, কিন্তু মাথা নেড়ে বাধা দিলাম আমি। তোমার বেশি প্রয়োজন ওটা। বললাম তাকে।
চোখ বন্ধ করে পানি পান করলো সে, বেশ কিছুক্ষণ কাশলো বিষম খেয়ে। আইসিস-এর মিষ্টি শ্বাসের কসম–তুমি ঠিক বলেছো। একেবারে মেয়েমানুষের মতো নরম হয়ে গেছি। সামান্য একটু তলোয়ার খেলা প্রায় শেষ করে দিতে বসেছিলো আমাকে। এরপর চারপাশের দেহগুলোর দিকে তাকিয়ে হাসলো ট্যানাস। কিন্তু যাই বলো, ফারাও-এর শ্রাইক-নিধন অভিযানের শুরুটা কিন্তু মন্দ হলো না!
বিশ্রী আরম্ভ, উল্টো কথা বললাম আমি। আমার উদ্দেশ্যে ভুড় উঁচাতে বলে চললাম, আমাদের উচিত ছিলো, অন্তত একটাকে বাঁচিয়ে রেখে শ্রাইকদের আস্তানার খোঁজ জেনে নেওয়া। এমনকি ওই বদমাশটাও হাত উঁচিয়ে আমার ফেলে-আসা পথের দিকে ইঙ্গিত করলাম, এখন আর কোনো কাজে আসবে না। এরকম ভুল আর করা চলবে না।
নিহত পরিবারটির মৃতদেহ যেখানে রেখে এসেছি সেখানে ফিরে চললাম আমরা। পুরুষ লোকটির মৃতদেহ ততক্ষণে দারুন পঁচা গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছে। খুব কম মাংসই অবশিষ্ট রেখেছে শকুনের দল।
ওর চুলগুলো দ্যাখো, ট্যানাসকে বললাম। এ রকম চুল আর কার আছে, জানো? কিছু সময়ের জন্যে থমকালো ট্যানাস, এরপরে চওড়া হেসে নিজের মাথার ঘন চুলের অরণ্যে হাত চালালো।
খচ্চরের পিঠে লাশটা উঠাতে হবে–এসো, হাত লাগাও আমার সাথে, বললাম ওকে। কারনাকে ওটা নিয়ে যাবে ক্ৰাতাস-মমি করতে হবে। সুন্দর একটা সমাধি আর শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করবো আমরা তোমার নামে। আগামীকালে সূর্যাস্তের আগেই সমস্ত থিবেস জানবে, ট্যানাস–প্রভু হেরাব মরুতে মারা গেছেন; শকুনে অর্ধেক ছিঁড়ে খেয়েছে তাঁর দেহ।
কিন্তু যদি লসট্রিস এই সংবাদ পায়- উদ্বিগ্ন দেখালো ট্যানাসকে।
ওকে সতর্ক করে দিয়ে একটা চিঠি পাঠিয়ে দেবো আমি। তোমার মৃত্যু-সংবাদে যে সুবিধাটুকু পাওয়া যাবে তার জন্যে আমার কর্ত্রীর একটু দুশ্চিন্তা না-হয় হলোই বা।
*
লোহিতসাগর অভিমুখী ক্যারাভান-চলা পথের উপর অবস্থিত প্রথম মরুদ্যানে আমাদের অপেক্ষায় ছিলো ক্ৰাতাস, কারনাক থেকে এক দিনের মতো হাঁটা-পথ দূরত্বে। নীল কুমির বাহিনীর বাছাই করা একশ যোদ্ধা রয়েছে তার সাথে, আমার নির্দেশমতো সতর্কভাবে বাছাই করা হয়েছে এদের। মধ্যরাতে ক্যাম্পে পৌঁছলাম আমি। এবং ট্যানাস। যাত্রার ধকলে আমরা দুজনেই দারুন ক্লান্ত। আগুনের ধারে শুয়ে মরার মতো ঘুমালাম সকাল পর্যন্ত।
সূর্যোদয়ের সাথে সাথে নিজের বাহিনীর সঙ্গে পরিকল্পনায় মত্ত হলো ট্যানাস। ওকে ফিরে পেয়ে ওদের মধ্যকার আনন্দ যেনো বাধ মানলো না, খুশিতে একে অপরের সাথে কোলাকুলি করলো তারা। প্রত্যেকের নাম ধরে ডেকে কুশল জানতে চাইলো ট্যানাসও।
নাস্তার পরে ক্রাতাসকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে ট্যানাস জানালো, অর্ধ-গলিত মরদেহটা কারনাকে নিয়ে সমাধিস্থ করতে এবং সমগ্র থিবেসে জানিয়ে দিতে মহান ট্যানাসের মৃত্যু ঘটেছে। আমার কত্ৰী, লসট্রিসের জন্যে একটা চিঠি দিয়ে দিলাম আমি, কাতাসের কাছে। নির্ভরযোগ্য একজন বার্তাবাহকের মাধ্যমে নদীর উজানে, গজ-দ্বীপে ওটা পাঠানোর ব্যবস্থা করবে বলে কথা দিলো সে।
ক্রাতাসের পছন্দ করা দশ জন সৈনিক এবং গলিত মরদেহ সমেত খচ্চর নিয়ে নীল নদের তীরে, থিবেসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলো সে।
