ঠিক যেখানে আছি আমরা, সেই দিকে আসতে লাগলো শ্রাইকের দল। অস্ত্র-সস্ত্রে সজ্জিত। সামনে হাঁটছে বেদুঈন সর্দার। মাথার আচ্ছাদনের কারণে আমাদের দেখতে পাচ্ছে না সে। তার পেছন পেছন আসা দুজনের মধ্যে একজন খচরটার দড়ি ধরে টেনে আনছে। জানোয়ারটার পেছনে বাকি দুজন নিহত মহিলার গা থেকে নেওয়া স্বর্ণের অলঙ্কারে পূর্ণ মনোযোগ। শেষ দুজনের হাতের বর্শা ছাড়া সব অস্ত্র খাপবন্দী।
সবাই এগিয়ে যেতে নিঃশব্দে। পেছনে পেছনে হাঁটতে থাকে ট্যানাস। ওর পদক্ষেপে কোনো শব্দ হচ্ছিলো না। ক্ষিপ্র চিতার মতো দ্রুততায় তলোয়ার বের করে সবচেয়ে পেছনের জনের ঘাড় বরাবর আঘাত হানলো ট্যানাস।
ওকে সাহায্য করার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও নিজের জায়গায় রইলাম ট্যানাসের নির্দেশের কথা মনে পড়ে গেছে। আসলে, আমি ওখানে গেলে সাহায্যের চেয়ে বরঞ্চ অসুবিধা ওর তলোয়ার চালনায়। এর আগে নরহত্যা করতে দেখি নি আমি, ট্যানাসকে। জানতাম, এটা তার কাজের মধ্যে পরে, কিন্তু এতো স্বাভাবিক হিংস্রতায়, নিপুণ কৌশলে কাজটা করলো সে অবাক হয়ে গেলাম। ঠিক মরুর গর্ত থেকে লাফিয়ে ওঠা খরগোশের মতো কাটা মুণ্ডুটা নিক্ষিপ্ত হলো, একপাশ থেকে আবার আঘাত হানলো ট্যানাস। দ্বিতীয় বর্বর এবারে তার শিকার। প্রথমটির মতোই নিখুঁতভাবে ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন হলো এর মাথা; ঝর্ণাধারার মতো আকাশের দিকে ছুটলো রক্তের ধারা।
রক্তপাত এবং কাটা মাথার পতনের ধপধপ আওয়াজে সতর্ক হলো বাকি দস্যুরা। চট করে ঘুরে দাঁড়িয়েই জায়গায় জমে গেলো তারা নিজের চোখে দেখেও বিশ্বাস করতে পারছে না, কী ঘটেছে তাদের পেছনে। এরপরেই, বুনো চিৎকার দিয়ে উঠে নাঙ্গা অস্ত্র-সমেত ট্যানাসের উদ্দেশ্যে ছুটে আসতে শুরু করলো শ্রাইকের দল। পালানোর বদলে সোজা ওদের দিকে ধেয়ে গেলো ট্যানাস। ছত্রভঙ্গ করে ফেললো দস্যু-দলটাকে। সঙ্গীদের থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া বর্বকে এবারে ধরলো ও, ভীষণ এক কোপে বুকের মাংস ফালি হয়ে ঝুলতে লাগলো শয়তানটার। চিৎকার করে বুক চেপে ধরে পেছালো সে। কিন্তু তার উপরে আবারো চড়াও হওয়ার আগেই বাকিরা ঝাঁপিয়ে পড়লো ট্যানাসের উপর। নিজের তলোয়ার দিয়ে মারণ-আঘাতগুলো প্রতিহত করছে ট্যানাস; তামার সাথে তামার ঘর্ষণে ঝনঝন শব্দ উঠছে। একজন একজন করে পেছাতে শুরু করলো বর্বর দুটো। ওদিকে, পেছন থেকে নিজেকে সামলে নিয়ে আক্রমণ শানালো আহত শ্ৰাইক।
পেছনে! চিৎকার করে ওর উদ্দেশ্যে বললাম। ঠিক সময় মতো ফিরে তলোয়ারের ফলায় আঘাত ঠেকালো ট্যানাস। সাথে সাথে বাকি দুজনে ঝাঁপিয়ে পড়লো ওর উপর। চারপাশ থেকে এহেন আক্রমণে বাধ্য হয়ে পিছিয়ে গেলো ট্যানাস। শ্বাসরুদ্ধকর তলোয়ারবাজীর প্রদর্শনী চলছে যেনো। এতো দ্রুত চলছে ট্যানাসের তলোয়ার, মনে হলো যেনো নিজের চারপাশে ধাতব একটা দেওয়াল তৈরি করেছে সে। শ্রাইকদের অবিশ্রান্ত আঘাত বাধা পাচ্ছে সেই দেওয়ালে ।
এতক্ষণে দুর্বল হয়ে পড়েছে ট্যানাস। গরমে, ক্লান্তিতে হাঁপাচ্ছে হাতের কাজও ধীর হয়ে আসছে ক্রমশ। গত কয়েক সপ্তাহের মদ্য-পান এবং ব্যভিচার এতক্ষণে তার মাশুল দাবি করেছে। বেদুঈন সর্দারের এক আঘাত ঠেকাতে গিয়ে মাটিতে পড়ে গেলো
সে, পাথরে পিঠ দিয়ে মরিয়া হয়ে লড়ে চললো। আমার বসার স্থান থেকে বিপরীত দিকের বোল্ডারে পিঠ রেখে এখন শেষ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে নিজেকে রক্ষা করার। এবারে বর্বরগুলো সবাই তার সামনে। তাদের আঘাত অবিরত ধেয়ে যাচ্ছে ট্যানাসের উদ্দেশ্যে। ধীর, দুর্বল প্রচেষ্টায় বুনো কুকুরগুলোর আক্রমণ ঠেকানোর চেষ্টা করে চলেছে ও।
প্রথম নিহত শ্রাইকের বর্শাটা পড়ে আছে পথের ঠিক মাঝখানে। ট্যানাসের মরণ ঠেকাতে হলে এখনই কিছু করতে হবে আমাকে। আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে এলাম আমি, নিজেদের উন্মত্ততায় আমার কথা বেমালুম ভুলে গেছে বর্বরের দল। সবার অলক্ষ্যে বর্শাটা হাতে নিয়ে নিলাম, একটু একটু করে বুকে সাহস ফিরে আসছে।
বেদুঈন-সর্দার ব্যাটা সবচেয়ে সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ট্যানাসের জন্যে, আমার সবচেয়ে কাছেও সে-ই আছে। আমার দিকে পেছন ফিরে ট্যানাসের রক্ত-পানের নেশায় বুঁদ হয়ে আছে একেবারে । বর্শা উঁচিয়ে ধেয়ে গেলাম আমি।
মানবদেহের পেছন দিকে সবচেয়ে নাজুক অঙ্গ হলো বৃক্ক । চিকিৎসাবিদ্যায় আমার জ্ঞানের বদৌলতে নিখুঁতভাবে নিশানা করতে সক্ষম হলাম। আঙ্গুলের সমান বর্শার ডগাটা পুরো সেধিয়ে গেলো মেরুদণ্ডের একপাশে। ঠিক শল্যবিদের দক্ষতায় বর্শার ডগায় বিধিয়ে ফেললাম একটা বৃক্ক। নিমিষে জায়গায় জমে গেলো বেদুঈন মন্দিরের মূর্তি যেনো। বর্শাটা মুচড়ে দিতে এমন আর্তনাদ করে উঠে হাতের তলোয়ার ফেলে দিলো সে, চমকে গেলো দুই সঙ্গী। ক্ষণিকের এই অমনোযোগিতাই প্রয়োজন ছিলো ট্যানাসের। প্রচণ্ড এক আঘাতে দুই কাঁধের মাঝখান দিয়ে তলোয়ারের ফলা সেধিয়ে দিলো সে, সামনের শয়তানটার বুকে। কিন্তু আটকে গেলো তার অস্ত্রের ফলা, যতক্ষণে ওটা টেনে বের করলো ট্যানাস শেষ বর্বর ততক্ষণে জীবন বাজী রেখে ছুটতে শুরু করেছে। কিছু সময় ধাওয়া করে ক্ষান্ত দেয় ট্যানাস দারুন হাঁপাচ্ছে সে। আমি শেষটাইটা–বদমাশটাকে যেতে দিওনা!
