*
জলাভূমি ছেড়ে আসতে পাথুরে হাঁটা পথ ধরে আগে আগে চললো ট্যানাস। ওর সাথে থাকার জন্যে রীতিমতো দৌড়াতে হলো আমাকে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে গরম যেনো ঝাঁপিয়ে পড়লো, ঘামের স্রোতধারা গলগল করে বেয়ে জমা হতে লাগলো কোমড়ের কাছে। ট্যানাসকে দেখে মনে হলো যেনো পুরোনো মদের ভাড়ার উপচে পড়ছে ওর দেহ থেকে। জোরে জোরে শ্বাস ফেলছে, কিন্তু বিরতি বা থামার কোনো লক্ষণ দেখা গেলো না তার মাঝে। মরুর প্রচণ্ড গরমে একটানা হেঁটে চললো সে।
হঠাৎ চিৎকার করে ওকে থামালাম আমি। সামনে তাকিয়ে আছি দু জনেই। পাখির ঝাঁক উড়ছে আকাশে, দূর থেকে ওটাই আমার দৃষ্টি কেড়েছে।
শকুন, কর্কশ স্বরে বললো ট্যানাস। কিছু একটা মরে পরে আছে ওখানটায়। খাপ থেকে তলোয়ার খুলে নেয় সে, সাবধানে সামনে এগিয়ে চললাম আমরা।
প্রথমে পুরুষ মানুষটাকে খুঁজে পেলাম। শকুনগুলো উড়ে যেতে মাথার লালচে সোনালি চুল দেখে চিনতে পারলাম আমি সেই স্বামী ভদ্রলোক, আসার পথে যার সাথে দেখা হয়েছিলো। চেহারা আর চেনার যো নেই, ঠুকরে ঠুকরে খেয়ে ফেলেছে শকুনের দল। শূন্য কোটর তাকিয়ে আছে আকাশ পানে। ঠোঁট-মাংস বিহীন দাঁতে ব্যঙ্গ হাসি হাসছে যেনো। ট্যানাস দেহটা চিৎ করতে পেটের ছোরার আঘাত নজরে এলো। কমপক্ষে বারো বার আঘাত করা হয়েছিলো তাকে।
যে-ই করে থাকুক এ কাজ–নিশ্চিত করে গেছে। সৈনিকের দৃঢ়তায় মৃত্যুকে সহজভাবে নিলো ট্যানাস।
পাথরের মাঝে হেঁটে চললাম আমি, কিছু সময়ের মধ্যেই কালো, ভনভনে মাছির মেঘ দেখে স্ত্রী লোকটির মৃতদেহ আবিষ্কার করলাম। সম্ভবত, ওরা যখন আমোদ করছিলো মেয়েটাকে নিয়ে, বাচ্চাটা নষ্ট হয়ে গেছিলো তার। নির্ঘাত এর পরও কিছু সময় বেঁচে ছিলো সে। ওই টুকু সময়ের মধ্যেই মৃত বাচ্চাটাকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলো মেয়েটা। ওই ভাবেই মরেছে সে, বোল্ডারে হেলান দেওয়া অবস্থায়, দুই হাতে মৃত-বাচ্চাটাকে জড়িয়ে ধরে।
ভাঙা পথ ধরে আরো সামনে এগিয়ে গেলাম। আবারো মাছির দল খোঁজ দিলো বাচ্চা মেয়েটার দেহের। সবাই ভোগ করার পর গলা কাটা হয়েছে এর। একটা মাছি এসে বসলো আমার ঠোঁটে, হাত দিয়ে সরিয়ে দিলাম আমি । চোখ ফেটে পানি বেরিয়ে এসেছে নিজের অজান্তেই।
ওদের চিনতে না কি? ট্যানাসের প্রশ্নের জবাবে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে কেশে গলা পরিষ্কার করলাম।
গতকাল রাস্তায় দেখা হয়েছিলো, আমি সাবধান করেছিলাম কথা সরছে না মুখে। বড়ো করে একটা শ্বাস টেনে বললাম। একটা খচ্চর ছিলো সাথে। মনে হয়, শ্ৰাইকেরা নিয়ে গেছে ওটা।
সায় দেয় ট্যানাস। ফিরে দাঁড়িয়ে পাথরের মাঝে পথ খুঁজতে আরম্ভ করে।
এই পথে আসো! চিৎকার করে ডেকে পাথুরে মরুর উপর দিয়ে দৌড়াতে শুরু করে সে।
ট্যানাস! বৃথাই পেছন থেকে ডাকলাম। ক্ৰাতাস অপেক্ষায় আছে আমার কথা শুনলোই না সে, অগত্যা আমিও ছুটলাম পিছুপিছু। যেখানে এসে খচ্চরের চিহ্ন হারিয়ে গেছে, সেখানটায় পেলাম ওকে।
তোমার চেয়ে পরিবারটির প্রতি আমার অনুভূতি বেশি, ওকে বোঝাতে চাইলাম। কিন্তু এ সবের কোনো মানে নেই। ক্ৰাতাস বসে আছে, আমাদের হাতে সময় নেই
সাথে সাথে থামিয়ে দেয় ট্যানাস। কতো হবে মেয়েটার বয়স? নয় বছর? এর একটা শোধ আমি নেবোই! ঠাণ্ডা, কঠোর তার মুখাবয়ব। কথা না বাড়িয়ে আগে চললাম আমরা।
ট্যানাস এবং আমি মিলে কেবল গ্যাজেল আর ওরিক্স নয়; সিংহের পেছনেও ছুটেছি। দল বেঁধে কাজ শুরু করলাম, আকার-ইঙ্গিতে কথা বলছি, কোনো বাঁক বা চড়াই-এ এসে সাহায্য করছি পরস্পরকে। অল্পক্ষণের মধ্যেই কর্কশ একটা জমিনে চলে এলাম, নদী থেকে পুবে মরুর আরো গভীরে চলে গেছে। সেই পথেই গিয়েছে আমাদের শিকার কাজ আরো সহজ হয়ে গেলো আমাদের জন্যে।
প্রায় দুপুর হয়ে এলো, আমাদের পানির বোতলও একেবারে শূন্য ঠিক তখনই বদমাশগুলোর দেখা পেলাম আমরা। পাঁচজন তারা খচ্চরটা আছে সাথে। একেবারেই অসতর্ক, আশা করে নি এতো গভীর মরুতে কেউ অনুসরণ করে আসবে তাদের। এমনকি, নিজেদের ফেলে আসা চিহ্ন পর্যন্ত আড়াল করে নি।
আমাকে টেনে একটা বড়ো পাথর খণ্ডের আড়ালে নিয়ে যায় ট্যানাস। জোরে জোরে শ্বাস পড়ছে দু জনেরই। ঘোরাপথে ওদের সামনে চলে যাবো আমরা। চেহারা দেখতে চাই সব কটার। শ্বাসের শব্দের সাথে বলে ট্যানাস।
লাফিয়ে, বেশ ঘোরাপথে রওনা হলাম। শ্রাইকদের দৃষ্টিসীমার বাইরে দিয়ে ওদের বেশ খানিকটা সামনে চলে এলাম। এরপর তাদের মাথার উপরে এসে থামলাম। জাত-সৈনিক ট্যানাস, সঠিক জায়গাতেই ওত পেতেছে।
খচ্চরের খুরের শব্দ, হাসি-তামাশার আওয়াজ দূর থেকেই পাওয়া গেলো। অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকতে ভাবলাম, কতোটা বোকার মতো হলো এদের ধাওয়া করাটা। সামনের দলটা ধীরে দৃষ্টিগোচর হলো জীবনে এর চেয়ে বর্বর, নোংরা, আক্রমণাত্মক কাউকে দেখিনি। অথচ আমার সম্বল বলতে কেবল সেই ছুরিটা।
আমাদের অবস্থান থেকে একটু দূরত্বে দাঁড়ি-অলা বেদুঈন সর্দার আচমকা থেমে দাঁড়ালো। পেছনের কাউকে খচ্চরের পিঠ থেকে পানির থলে নামানোর নির্দেশ দিচ্ছে। প্রথমে সে পান করলো, এরপরে হাতে হাতে ঘুরতে লাগলো পানির থলে। তৃষ্ণায় বুকের ছাতি ফেটে যাবে যেনো আমার।
হে হোরাস! দ্যাখো, এখনো মেয়েটার রক্ত লেগে আছে কাপড়ের সামনে। যদি লানাটা থাকতো এখন আমার সঙ্গে! ফিসফিস করে বললো ট্যানাস। ব্যাটার পেট ফুটো করে ওর পানি বের করে নিতাম। এরপর আমার কাঁধে হাত রাখে সে। আমি নড়া পর্যন্ত স্থির থাকো। কোনো ধরনের বীরোচিত কাজ যেনো না করতে দেখি। মাথা নেড়ে সায় জানালাম।
