কেমন আছো, বুড়ো বন্ধু । খারাপ লেগেছে, তোমার জন্যে।
অন্যদেরও খারাপ লেগেছে তোমার জন্যে। ক্ৰাতাস তার মধ্যে একজন। নদীর ভাটিতে লড়াই করেছে পুরো বাহিনী। তোমার তলোয়ারের সাহায্য বড়ো প্রয়োজন ছিলো ওদের। আর, আমার কর্ত্রীর কথা না হয় নাই বললাম। প্রতি মুহূর্ত তোমার কথা স্মরণ করেছে সে, ওর ভালোবাসা নিখাদ। এই মাত্র যেনো বেশ্যাটাকে তোমার বিছানা থেকে তাড়ালামওটার কথা শুনলে ও কী ভাববে বলে মনে করো?
গুঙ্গিয়ে উঠে মাথা চেপে ধরে ট্যানাস। ওহ, টাইটা, তোমার কর্ত্রীর নামটাও মুখে এনো না! সহ্য করতে পারি না।
তো, আর এক বোতল মদ সাবাড় করো, নোংরার ভেতর মরো, রাগত স্বরে বললাম।
ওকে সারাজীবনের জন্যে হারিয়েছি আমি। কী করতে বলো তুমি আমাকে?
ঠিক ওর মতোই, বিশ্বাস এবং আস্থা রাখতে বলি।
করুণ চোখে আমার দিকে চাইলো ট্যানাস। ওর কথা বলো আমাকে। কেমন আছে ও, টাইটা? মনে করে আমাকে?
খুব কষ্টে আছে, দুঃখ ভরে বললাম আমি। তোমাকে ছাড়া আর কিছুই ভাবে । সেদিনের অপেক্ষায় আছে ও, যেদিন তোমরা দু জন এক হবে।
সেটা কোনোদিনও হবে না। ওকে হারিয়েছি আমি, বেঁচে থেকে আর কী লাভ?
খুব ভালো! কড়া স্বরে বললাম। তাহলে আমি আর এখানে সময় নষ্ট করছি না । আমি বরঞ্চ মিসট্রেসকে গিয়ে বলি, তার বার্তা শুনতে রাজী নও তুমি। ওকে ঠেলে সরিয়ে দরোজা গলে বেরিয়ে এলাম আমি । মই বেয়ে নেমে এলাম নৌকায় ।
দাঁড়াও, টাইটা! চেঁচিয়ে ডাকলো ট্যানাস। দাঁড়াও!
কী কারণে? তুমি তো মরতে চাও। তো, তাই করো। লোক পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা আমি করে দেবো খন। মমি করা হবে তোমার দেহ-চিন্তা করো না।
এহেন কথায় হেসে ফেললো ট্যানাস। ঠিক আছে। বোকার মতো কথা বলেছি আমি । মদ মাথা বিগড়ে দিয়েছিলো। ফিরে এসো, দয়া করে। লসট্রিস কী বার্তা পাঠিয়েছে?
নিতান্ত অনিচ্ছার ভঙ্গি করে মই বেয়ে উঠে এলাম আমি।
আমার কী তোমাকে জানাতে বলেছে তোমার প্রতি তার ভালোবাসা এখনও, এতো কিছু পরেও অক্ষুণ্ণ আছে। চিরজীবন সে শুধু তোমারই মেয়েমানুষ থাকবে ।
হোরাসের কসম-আমার লজ্জা হচ্ছে এখন, বিড়বিড় করলো ট্যানাস।
নোংরা বিছানার উপরে ঝোলানো খাপ থেকে তরবারি খুলে নিয়ে এক কোপে মদের পাত্রগুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ট্যানাস। ঝর্ণার মতো ছিটকে বেরিয়ে দেওয়ালে লেপ্টে গেলো পানীয়। হাঁপাতে হাঁপাতে আমার দিকে ফিরলো সে। দ্যাখো, কি অবস্থা করেছো নিজের; বুড়ো পুরোহিতের মতো দুর্বল, বেতস লতার মতো নরম।
অনেক বলেছো, টাইটা! থামো এবারে। আর যদি একবার তামাশা করো, ভালো হবে না বলে দিলাম।
ঠিক আমার ইচ্ছে মতো, রেগে গেছে ট্যানাস। আমার বলা অপমানসূচক বাক্য বুকে বড়ো লেগেছে তার। আমার কর্ত্রীর ইচ্ছে, ফারাও তোমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছেন, তা পালন করে নিজেকে সম্মানিত মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করো। পাঁচ বছর পর তোমার কাছে যেনো চলে আসতে পারে সে।
ট্যানাসের পূর্ণ মনোযোগ পেলাম এই কথাতে। পাঁচ বছর? সেটা আবার কী? এই বিচ্ছেদের কি কোনো নির্দিষ্ট সময় আছে নাকি?
ফারাও-এর নির্দেশে ইন্দ্রজাল ব্যবহার করেছিলাম আমি। এখন থেকে পাঁচ বছর পরে মারা যাবেন তিনি। সাধাসিধাভাবে বললাম। একভাবে আমার পানে তাকিয়ে থাকলো ট্যানাস। ক্ষণে ক্ষণে বদলাচ্ছে মুখের রঙ। আমার রচিত যে কোনো স্কোলের মতোই ওকে পড়তে পারি আমি।
ইন্দ্রজাল! শেষমেষ ফিসফিস করে বলে সে। অনেক কাল আগে, জাদু-টোনা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করতো সে। কিন্তু এখন আমার কর্ত্রীর চেয়ে বরঞ্চ তার বিশ্বাস বেশি এগুলোতে। বহুবার আমার স্বপ্ন সত্যি হতে দেখেছে ট্যানাস।
ভালোবাসার জন্যে এতোটা সময় অপেক্ষা করতে পারবে? জানতে চাইলাম । আমার কর্ত্রী কসম কেটে বলেছে, তোমার জন্যে প্রয়োজনে সারাজীবন অপেক্ষা করে থাকতে পারবে সে। তুমি কি পারবে, অল্প কিছু সময় ধৈৰ্য্য ধরতে?
সে বলেছে, অপেক্ষা করবে আমার জন্যে? ট্যানাস জানতে চায়।
আজীবন, উত্তরে বললাম। মনে হলো, ট্যানাস হয়তো কেঁদে ফেলবে। সেটা সহ্য করা মুশকিল হবে ট্যানাসের মতো একজন মানুষ কাঁদছে–এটা আমি দেখতে পারবো না। তাই তাড়াতাড়ি বলে চললাম, ইন্দ্রজালে কী দেখতে পেয়েছি জানতে চাইলে না?
কান্না গিলে ফেলে ট্যানাস। হা, হ্যাঁ! সোৎসাহে মাথা নাড়ে সে। রাত নামা পর্যন্ত কথা বলে চললাম আমরা।
সবকিছু খুলে বললাম আমি ওকে যেগুলো এতোদিন লুকিয়ে এসেছি ওদের দু জনের কাছ থেকে। কেমন করে পিয়াংকি, প্রভু হেরাবকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিলো; ইনটেফ কেমন করে তাকে মেরেছেন–এ সমস্ত শুনে এতোটাই উত্তেজিত হয়ে পড়লো ট্যানাস, মদের শেষ প্রভাবও দূর হয়ে গেলো ওর মাথা থেকে। সকাল হতে হতে আগের মতোই শক্ত, কঠোর মানুষটা ফিরে এলো ট্যানাসের মাঝে।
তাহলে, তোমার পরিকল্পনা মতোই কাজে লেগে পড়ি চলো মনে হচ্ছে, সেটাই একমাত্র উপায়। ঝট করে দাঁড়িয়ে তলোয়ার খাপে ভরে ফেলে ট্যানাস। আমি অবশ্য চাইছিলাম আরো কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে মদের প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত হোক সে, কিন্তু ট্যানাস শুনতেই চাইলো না।
এই মুহূর্তে কারানাকে ফিরে চলো! জোর গলায় বললো সে। ক্ৰাতাস অপেক্ষা করছে বাবার মৃত্যুর বদলা নিতে হবে। আমার মিষ্টি পাখি লসট্রিসকে দেখার জন্যে আর তর সইছে না!
