প্রথম যেদিন আমি আর ট্যানাস খুঁজে পেয়েছিলাম এই পরিত্যক্ত কুঁড়েটা আজ তার অবস্থা ঠিক সেই দিনের মতোই অবিন্যস্ত। কাপড়-চোপড়, অস্ত্র, খাবার পাত্র সব এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। বাতাসে ভুরভুর করছে মদের গন্ধ।
ঘরের শেষ মাথায় ভয়ঙ্কর নোংরা একটা চাদরের উপর পরে আছে ততোধিক নোংরা দুটো দেহ। ময়লা মেঝেতে সাবধানে পা ফেললাম, বুঝতে চাইছি ওই দুটো বেঁচে আছে কি না। ঠিক তখনই গুঙ্গিয়ে উঠে পাশ ফিরলো মেয়েটা। অল্প-বয়স্ক, একেবারে ন্যাংটো শরীরে আদিম আহ্বান। গোলাকার বুক দুটো বেশ বড়ো, তল পেটের গোড়ায় বাদামী কোঁকড়া চুল । কিন্তু, এমনকি ঘুমের ভেতরেও তার মুখের সস্তা ভাব প্রকাশ্য। কোনো সন্দেহ নেই, ওটাকে জলের ধারের ছাপড়া থেকে নিয়ে এসেছে ট্যানাস।
ওকে সবসময় রক্ষণশীল বলেই জানতাম, কখনোই পান করে মাতাল হতে দেখি নি। কিন্তু এই সস্তা চিড়িয়া এবং দেওয়াল ঘেঁষে পড়ে থাকা মদের বোতলগুলো ভিন্ন। কথা বলছে। ট্যানাসের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হতে হলো। এ আমার পরিচিত মানুষটির মুখ নয়। সুরার প্রভাবে লাল, ফোলা-ফোলা মুখ, দাড়ি-গোফের জঙ্গল সেখানে। নির্ঘাত হারেমের বাইরে শেষ যেবার দেখেছিলাম, এর পরে আর খৌরি করা হয় নি।
ঘুম ভেঙে জেগে উঠেছে মেয়েটা। আমার উপস্থিতি টের পেতেই বিড়ালের মতো এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে দেওয়ালে ঝোলানো খাপ থেকে ছোরা হাতে নেয় সে। তড়িৎ গতিতে ওর হাত থেকে ওটা ছিনিয়ে নিলাম আমি, নগ্ন ডগা তাক করলাম পেট বরাবর।
ভাগো, শান্তস্বরে নির্দেশ দিলাম। আমি পেট ফেঁড়ে ফেলার আগেই ভাগো এখান থেকে!
রক্তচক্ষুতে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে দ্রুত কাপড় পরে নেয় মেয়েটা।
ও কোনো পয়সা দেয় নি আমাকে, কাপড় পরা শেষ হতে জানালো সে।
কোনো সন্দেহ নেই, এর মধ্যেই যা প্রাপ্য পেয়ে গেছো তুমি, বলে ছোরার ফলা দিয়ে দরোজার দিকে ইশারা করলাম।
ও বলেছিলো, পাঁচটি স্বর্ণের আংটি দেবে আমাকে, নাকী সুরে প্রায় কেঁদে ফেললো সে। গত বিশ দিনে অনেক খেটেছি। সবকিছু করতে হয়েছে–ঘর ধোয়া মোছা, রান্না করা, ওর নোংরা পরিষ্কার করা। আমার মজুরি দিতেই হবে। না দিলে–
চুলের গোছা ধরে হিড়হিড় করে টেনে দরোজার বাইরে নিয়ে গেলাম ওটাকে। ধরে বসিয়ে দিলাম একটা নৌকায় । আমার থেকে ছাড়া পেতেই এমন অশ্রাব্য গালি গালাজ আরম্ভ করলো সে, ভীত হয়ে চারপাশের নলখাগড়ার জঙ্গল থেকে উড়ে গেলো পাখির দল।
ফিরে এসে দেখি তখনো ঘুমন্ত ট্যানাস। মদের পাত্রগুলো পরীক্ষা করে দেখলাম বেশিরভাগই খালি, কেবল দুটো-তিনটে পাত্র পূর্ণ । নির্ঘাত ওই মেয়েটাকে কারনাকে পাঠিয়ে কারো মাধ্যমে এগুলো সংগ্রহ করেছিলো সে। নীল কুমির বাহিনীর সবাইকে পুরো এক মাস মাতাল করে রাখার মতো যথেষ্ট পরিমাণ আছে এখানে।
ট্যানাসের বিছানার পাশে ভাবতে বসলাম। বেচারা নিজেকে শেষ করে দিতে চাইছে, করুণায় ভরে গেলো আমার ভেতরটা। আমার কর্ত্রীর প্রতি ওর ভালোবাসায় কোনো খাদ নেই, ওকে ছাড়া ট্যানাস আসলেই বেঁচে থাকতে চায় না। ট্যানাসের এহেন অধঃপতনে অবশ্যই মেজাজ চড়ে গেছে আমার, কিন্তু এখনো, এই মুহূর্তেও ওর মহৎ গুণাবলি আমার কাছে বেশি মূল্যবান। এমন তো নয়, কেবল ট্যানাস একাই ভুল করেছে। ঠিক যে কারণে নিজেকে শেষ করে দিতে চেয়েছে সে, একই কারণে আমার কর্ত্রীও তো বিষপান করতে চেয়েছিলো। মনে মনে ওকে মাফ করে দিলাম আমি। এছাড়া আর কী-ই বা করতে পারতাম? আমার জীবনে অর্থবহ, মূল্যবান কিছু বলতে এই দু জন মানুষের ভালোবাসা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাজে লেগে পড়লাম।
ট্যানাসের গোড়ালি ধরে টেনে চললাম প্রথমটায়। গুঙ্গিয়ে উঠে গাল বকে চললো সে, কর্ণপাত না করে টেনে দরোজা দিয়ে পানিতে ফেলে দিলাম দেহটা। মাথা নিচু করে জলাভূমিতে পড়লো সে, এরপর তলিয়ে গেলো। অর্ধ-চেতন অবস্থায় আবার ভেসে উঠলো।
পাশে নেমে পড়ে চুলের মুঠি ধরে মুখটা চেপে ধরলাম পানির তলায়। কিছু সময়ের জন্যে দুর্বলভাবে বাধা দিলো সে, কিন্তু আমি ধরে রাখতে সক্ষম হলাম । দ্রুতই শক্তি ফিরে এলো ট্যানাসের দেহে, এক ঝাড়া খেয়ে শূন্যে নিক্ষিপ্ত হলাম আমি।
গর্জে উঠে আক্রমণ শানালো ট্যানাস। ওর এক ঘুষি জলহস্তিকে পর্যন্ত শেষ করে দিতে পারে, কোনো রকমে গা বাঁচিয়ে নিরাপদ দূরত্বে থাকলাম আমি।
হাঁপাতে হাঁপাতে মইয়ের ধাপে বসলো সে, বন্য চুল থেকে পানি ঝরছে। পেটে বেশকিছু পানি গেছে, একটু উদ্বিগ্ন বোধ করলাম আমি ওর জন্যে। বেশকিছু পানি উগড়ে দিলো সে, সাথে পেটের মদও। পরিমাণ দেখে অবাক হতে হয়।
কুঁড়ের একটা ভিত্তিমূল ধরে অপেক্ষায় রইলাম আমি। আবারো বমি করছে ট্যানাস, কিছু সময় অপেক্ষা করে গলায় বিষ ঢেলে বললাম, আমার কর্ত্রী এখন তোমাকে দেখতে পেলে খুব খুশি হয়ে যেতো।
চোখ ছোটো করে আমার পানে চাইলো সে। টাইটা! নরকে যাও! আমাকে কি ডুবিয়ে মারতে চাইছিলে নাকি? মরে যেতাম তো!
যা অবস্থা এখন তোমার, কেবল মদ সাবাড় করা ছাড়া আর পারোটা কী? কী জঘন্য অবস্থা করেছো নিজের। ছিঃ!
ওকে মইয়ের ধাপে রেখে উপরে উঠে এলাম আমি। ধীরে ধীরে পরিষ্কার করতে লাগলাম জায়গাটা। বেশকিছু সময় পর লজ্জিত চেহারায় উঠে এলো ট্যানাস। ওকে উপেক্ষা করে কাজ করে যেতে লাগলাম। শেষমেষ ট্যানাসই নীরবতা ভাঙলো।
