কিছু সময় লাগলো হৃৎপিণ্ডের ধড়ফড়ানো নিয়ন্ত্রণে আনতে। কষ্টার্জিত স্বরে বললাম, তোমার তাতে কি প্রয়োজন, বাছা? আমি কে বা কোথায় যাই জেনে কী করবে?
সাথে সাথেই কথার ভাব বদলে গেলো তার। আমি ভুখা আছি, হে পুরোহিত। এতিম আমি, নিজের খাবার নিজেই যোগাড় করতে হয় আমাকে। তোমার ওই বড়ো থলেতে আমার জন্যে কি কিছুই নেই?
তোমাকে দেখে মনে হয় না যে, না খেয়ে আছে, অন্যদিকে ফিরে বললাম, কিন্তু নদীর পার ধরে আমার সাথে সাথে আসতে লাগলো শয়তানটা।
তোমার থলেটা একটু দেখতে দাও, ফাদার, বলে চলে সে, ভিক্ষা চাই।
ঠিক আছে। থলের ভেতর থেকে একটা আঙুর বের করলাম আমি, কিন্তু শয়তানটা ওটার নাগাল পাবার আগেই মুঠো বন্ধ করে আবার খুললাম। ততক্ষণে আঙুর পাল্টে একটা বিষাক্ত কাঁকড়া দেখা গেলো হাতে। কিলবিলে শাঁড়াশি নাচালো ওটা, ভয়ে এক লাফে পেছনে চলে গেলো ছেলেটা। উঠে-পড়ে দৌড়াচ্ছে চড়াই ধরে।
ছোট্ট পাহারটার চূড়োয় পৌঁছে চিৎকার করে উঠলো আমার উদ্দেশ্যে, তুমি ব্যাটা পাদ্রী নও! তুমি হলে মরুর জাদুকর! শয়তান, খোদ শয়তান মানুষ না! এরপরে খারাপ শক্তির বিপরীতে চিহ্ন এঁকে পালিয়ে গেলো সে।
পথে, একটা চ্যাপ্টা পাথরের তলা থেকে কাঁকড়াটা সংগ্রহ করেছিলাম। বিষাক্ত দাঁড়াটা ফেলে দিয়ে ইচ্ছে করেই থলের ভেতরে রেখেছি এখনকার মতো উপযুক্ত সময়ে ব্যবহারের জন্যে। যে বুড়ো দাসের কাছে ঠোঁটের নড়াচড়া থেকে কথা আঁচ করা শিখেছিলাম-সে আরও কিছু বিষয়ে জ্ঞান দান করেছিলো আমাকে। হাত সাফাই তার মধ্যে একটা।
পাহাড়ের কাছে পৌঁছে পিছনে ফিরে চাইলাম। বহু পিছনে বিন্দুর মতো দেখা গেলো রাখাল ছেলেটাকে, তবে সে একা নয় এখন। দুই জন পুরুষ দাঁড়িয়ে সঙ্গে। আমার দিকে ফিরে ভীষণ উত্তেজিত ভঙ্গিতে কী যেনো দেখাচ্ছে বালক, মনোযোগ দিয়ে তারা শুনছে সেটা। নির্ঘাত জাদুকর দৈত্য ভেবেছে আমাকে।
এক নাগাড়ে হেঁটে চললাম আমি। দুপুরের প্রখর রৌদ্রে দৃষ্টি চলে । হঠাৎই সামনে যেনো নড়াচড়া ঠাওর হলো। ছোট্ট, সাধারণ ধরনের একটা দল আসছে আমারই দিকে। আর একটু সামনে এগুতে বুকের ভেতরটা যেনো লাফ দিয়ে উঠলো–ওটা কী ট্যানাস? একটা খচ্চরের দড়ি ধরে এগুচ্ছে। হাড় জিরজিরে জটা বোঝার ভারে একেবারে ন্যুজ। বোঝার উপরে বসে একজন মহিলা আর একটা বাচ্চা। মহিলা পোয়াতী । বাচ্চাটা কেবল কৈশোর ছাড়িয়েছে।
প্রায় দৌড়ে এগিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু হঠাই বুঝলাম লোকটা ট্যানাস নয়, সম্পূর্ণ আগন্তুক একজন। লম্বা, চওড়া কাঁধ-তার চলন এবং মাথার একরাশ সোনালি-হলুদ চুল দেখে ভুল হয়েছিলো। সন্দেহভরে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, হাতের তলোয়ার তৈরি। এবারে খচ্চরটা পথ থেকে সরিয়ে আমার চোখে চোখে চেয়ে রইলো সে।
দেবতার আশীর্বাদ তোমার উপর ন্যস্ত থোক, বাছা, ঠিক পুরোহিতের মতো করেই বললাম। কিন্তু তলোয়ার না নামিয়ে আমার পেট বরাবর ধরে রইলো সে। অপরিচিতদের কেউ বিশ্বাস করে না আমাদের এই মিশরে।
এই পথে এসে নিজের এবং পরিবারের জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছ, বন্ধু। বরঞ্চ ক্যারাভানে এলে ভালো করতে। পেছনের পাহাড়ে দস্যু দল ওত পেতে আছে। সত্যিই ওদের জন্যে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছি। মেয়েটাকে দেখে মনে হয় ভদ্র, বাচ্চাটা কেঁদে ফেললো আমার কথায়।
তোমার কাজে যাও, হে পুরোহিত! নির্দেশের সুরে বললো লোকটা। যার প্রয়োজন, তাকে উপদেশ দিও।
আপনি ভালো লোক, জনাব, ফিসফিস করে বললো মেয়েটা। ক্যারাভানের অপেক্ষায় পুরো এক সপ্তাহ কেয়েনাতে ছিলাম আমরা আর বসে থাকা সম্ভব ছিলো না। আমার মার কাছে, লুক্সরে যেতে হবে দ্রুত বাচ্চার জন্মদানের জন্যে তার সাহায্য প্রয়োজন।
চুপ করো, মেয়েলোক! প্রায় গর্জে উঠলো তার সঙ্গী পুরুষ। পাদ্রী হোক আর যাই হোক কোনো অপরিচিতের কথায় ভুলবো না।
কিছু সময় ভাবলাম, ওদের জন্য কী করার আছে। কালো, অবিসিডিয়ান পাথরের মতো চোখ মেয়েটার, হৃদয় ছুঁয়েছে আমার। কিন্তু ওর স্বামীর তাগাদায় আবার সচল হলো খচ্চর, আমার পাশ ঘেঁষে চলে গেলো। অসহায়ের মতো কাঁধ ঝাঁকিয়ে ওদের পানে চেয়ে রইলাম যতক্ষণ না দৃষ্টিসীমার আড়াল হলো। কেউ না চাইলে তো আর সাহায্য করা সম্ভব নয়।
শেষ বিকেলে জলাভূমির ধারে এসে পৌঁছলাম। প্যাপিরাসের ঝোঁপ এতো ঘন এখানে, কোনো মতেই ছোট্ট আস্তানাটা সনাক্ত সম্ভব নয়। আর তাছাড়া, ওটার ছাদও প্যাপিরাসের কাণ্ড দিয়ে তৈরি একেবারে নিখুঁত আড়াল। এক পাথর থেকে আরেক পাথরে লাফিয়ে চললাম আমি, দ্রুতই চলে এলাম জলের ধারে। নীল নদের থেকে এতো দূরে তেমন একটা তারতম্য হয় নি জলের স্তরে। বন্যার কোনো আলামত নেই।
পুরোনো সেই নৌকাটা এখনও বাঁধা রয়েছে তীরে। অর্ধ-নিমগ্ন হয়ে আছে পানিতে, বেশ কিছুক্ষণ কসরৎ করে টেনে আনতে হলো। প্যাপিরাসের সুরঙ্গের ভেতর দিয়ে পথ করে এগুতে লাগলাম । জলের শেষ মাথায়, শুকনো এক টুকরো মাটির উপর রয়েছে একটা কুঁড়ে। কিন্তু এখন পানিতে ভেসে গেছে জমিন, এক মাথা সমান পানি ওখানে।
আমি যে নৌকায় চড়ে এসেছি, ঠিক একই রকম একটা নৌকা ভেড়ানো কুঁড়ের গায়ে। ওটার পাশে ভিড়িয়ে, ক্যাঁচ-কোঁচ করতে থাকা কঙ্কালসার মই বেয়ে উঠে এলাম ভেতরে। একটাই মাত্র ঘর, মাথার উপরের পাতার আচ্ছাদনের ফাঁক-ফোকর গলে সূর্যরশ্মি প্রবেশ করছে। আমাদের এই উচ্চ-মিশরে বৃষ্টি হয় না বললেই চলে, কাজেই পাতার আচ্ছাদনেই কাজ চলে যায়।
