গর্দভ কোথাকার! হঠাৎই মনে পড়ে গেলো। ওখানেই আছে সে!
এতক্ষণে শহরের গলি-ঘুপচি জনাকীর্ণ হতে শুরু করেছে। পৃথিবীর ব্যস্ততম শহর আমাদের এই থিবেস, কেউই অলস নয় এখানে। এরা কাঁচ ভাঙে, স্বর্ণের কাজ করে, রুপোর বাসন-কোসন বানায়, পাত্র তৈরি করে। ইতিমধ্যেই দরদাম হাঁকাহকি শুরু করেছে বণিকের দল, আইনজ্ঞরা নিজ নিজ প্রকোষ্ঠে কাজ শুরু করেছে, পুরোহিতেরা তাঁদের প্রাত্যহিক যজ্ঞ আরম্ভ করেছে আর বেশ্যারাও খুলেছে তাদের ঝাপি। উত্তেজনাকর, দ্রুতগামী এক শহর থিবেস, আমি ভালোবাসি একে।
সকালের ব্যস্ততা ঠেলে এগিয়ে গেলাম। বাতাসে মশলা, ফলমূল, শাক-সবজি, মাছ-মাংসের গন্ধ ভাসছে। গরুর হাম্ভা রব, ছাগলের ব্যা ব্যা, সঙ্গে মানুষের চিৎকার সব মিলিয়ে এক দক্ষ-যজ্ঞ বেঁধে গেছে।
একবার ভাবলাম, একটা গাধা কিনে নেবো কি না–এই গরমে বেশ অনেকটা পথ হাঁটতে হবে। শেষমেষ বাদ দিলাম চিন্তাটা; শুধু যে অর্থনৈতিক ভাবনা থেকে, তা নয় বরঞ্চ একবার শহরের বাইরে চলে গেলে শ্রাইকদের দৃষ্টি আকর্ষণে সহায় হবে ওটা। সেক্ষেত্রে, পুরোহিতের ছদ্মবেশও লুটে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। এক বোতল পানি, কিছু রুটি কিনে নিয়ে একটা চামড়ার থলেতে ভরে নিলাম। এরপর সরু রাস্তা ধরে রওনা হলাম শহরের প্রধান ফটকের উদ্দেশ্যে।
ফটকে পৌঁছানোর আগেই হঠাৎ শোরগোল উঠলো; প্রাসাদের একদল রক্ষী তাদের হাতের লাঠি দিয়ে মেরে পথ করে নিতে লাগলো। তাদের ঠিক পেছনেই একদল দাস কাঁধে পালকি নিয়ে হেঁটে চলেছে। প্রধান রক্ষী এবং ওই পালকি আমার পরিচিত। মুখোমুখি পড়ে গেলাম একেবারে ।
আতঙ্কে হৃৎপিণ্ড যেনো বন্ধ হয়ে যাবে। রাসফার হয়তো ভালো করে না দেখলে চিনবে না আমাকে, কিন্তু এই ছদ্মবেশ সত্ত্বেও ইনটেফ সাথে সাথে চিনে ফেলবেন আমাকে। আমার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে বুড়ি এক দাসী মহিলা বিশাল দুই বুক আর জলহস্তির মতো পাছা সমেত; তার পেছনে আড়াল নিলাম। এরপর চোখের উপর পরচুলা টেনে উঁকি মেরে দেখতে লাগলাম।
আতঙ্ক সত্ত্বেও, র্যাসফার যে মতো দ্রুত হাটাচলা করতে পারছে এ জন্যে নিজের ভেতরে গর্ব অনুভব করলাম। সময়মতো আমার শল্যচিকিৎসা না পেলে এতক্ষণে মরে যেতো সে। কাছাকাছি এসে পড়তে লক্ষ করলাম, মুখের একদিক ঝুলে পড়েছে তার। যেনো আগুনে গলে গেছে মোমের মতো। আগে যদি সে কুৎসিত ছিলো, তো এখন হয়েছে ভৌতিক। বেশিরভাগ সময়ই মস্তিষ্কের আঘাতে এমন দশা হয়।
দলবল নিয়ে আমার পাশ ঘেঁষে চলে গেলো সে। পর্দার ফাঁক দিয়ে এক ঝলক দেখতে পেলাম ইনটেফকে–পুর থেকে আমদানি করা মসৃণ সিল্কের বালিশে আয়েস করে বসে আছেন।
সদ্য খৌরী করা গাল চকচক করছে; আনুষ্ঠানিক ভঙিতে চুল বেঁধেছেন। এক হাতের আঙুলে একগাদা আংটি, অপর হাত অলসভাবে ফেলে রেখেছেন ছোট্ট-সুন্দর এক দাস বালকের মসৃণ বাদামী উরুতে। নির্ঘাত তার নতুন সংগ্রহ ছেলেটাকে চিনতে পারলাম না।
পুরোনো মনিবের প্রতি আমার ঘৃণার প্রাবল্যে নিজেই অবাক হলাম। তাঁর হাতে অসংখ্যবার বিভিন্নভাবে নির্যাতনের সমস্ত কথা যন্ত্রণা করতে লাগলো নতুন করে। কখনই তাকে ক্ষমা করতে পারবো না আমি।
আমার দিকে ফিরতে শুরু করতেই সামনের পর্বত-প্রমাণ মহিলার আড়ালে লুকালাম। সরু আইল ধরে সামনে এগিয়ে গেলো পালকি। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে খেয়াল হলো, রাগে আমার সর্বাঙ্গ কাঁপছে।
স্বর্গীয় হোরাস, অধমের এই আবেদন মঞ্জুর করুন! যতদিন পর্যন্ত ওই শয়তানকে তার প্রভু সেথ্-এর কাছে না পাঠাতে পারছি, আমার বিশ্রাম নেই, বিড়বিড় করে উচ্চারণ করে প্রধান ফটকের উদ্দেশ্যে হাঁটতে লাগলাম আমি।
*
বাৎসরিক বন্যায় দু কূল ছাপিয়ে বয়ে চলেছে নীল নদ। সেই সৃষ্টির শুরু থেকে পলিমাটির কালো স্তর জমা করে চলেছে আমাদের মাটিতে। বন্যার পানি নেমে গেলে, এই বিস্তীর্ণ চকচকে জলের বুক চীরে আবারো দেখা দেবে জমিন সবুজে সবুজে ভরে উঠবে। মিশরীয় সূর্য আর উর্বর পলির প্রভাবে আগামী বন্যার আগেই ফসল তোলার সময় হয়ে যাবে।
জলমগ্ন মাঠের প্রান্তে রয়েছে উঁচু হাঁটা পথ। এ রকমই একটা পায়ে চলা পথ ধরে পুবে হেঁটে চললাম আমি, যতক্ষণ পর্যন্ত না পাথুরে জমিনের দেখা পেলাম । এরপরে দক্ষিণে চললাম। মনে প্রতিজ্ঞা। কিছু সময় পর পর পথের পাশে উঁচু পাথর খণ্ডের উপর দাঁড়িয়ে রাস্তা ঠিক করে নিচ্ছিলাম।
আমার ডানধারের উঁচু-নিচু জমিনের দিকে ভালো করে নজর রেখে চলেছি, ওরকম আড়াল থেকেই অকস্মাৎ আক্রমণ শানাতে ওস্তাদ শ্রাইকের দল। ঠিক যখন সংকীর্ণ, গভীর একটা গিরিপথ পেরুচ্ছিলাম, কাছ থেকে কর্কশ কণ্ঠে থামার আদেশ করা হলো।
হে দেব-দেবী–আমাকে রক্ষা করুন! এতোটাই চমকে গেছিলাম, প্রায় চেঁচিয়ে উঠলাম।
আমার সামনে গিরিপথের ঠিক প্রান্তসীমায় বসে একজন রাখাল বালক। দশের বেশি নয় বয়স। কিন্তু দৃষ্টিতে গভীর বন্যতা। ছোটো ছেলেমেয়েদের খবরদাতা হিসেবে ব্যবহার করে শ্রাইকেরা শুনেছি। এই ছোট্ট শয়তানটা সে জন্যে একবারে উপযুক্ত। মাথাভর্তি জটা চুল, মতো দুর্গন্ধময় একটা পোশাক পরনে এখান থেকেও নাকে আসছে। ঠিক খুনে শকুনের মতো চকচকে তার দৃষ্টি, আমার মাল-সামানের দিকে নজর।
কোথায়, কী কারণে যাচ্ছ–পাত্রী? হাতের বাঁশিতে লম্বা, প্রলম্বিত একটা সুর বাজালো সে; নির্ঘাত কোনো ধরনের সংকেত ওটা।
