সঙ্গে সঙ্গে কেঁদে ফেললো ক্ৰাতাস। সে অদৃশ্য হয়ে গেছে। এই কথায় অপলকে ওর দিকে চেয়ে রইলাম।
অদৃশ্য হয়ে গেছে মানে? এর অর্থ কী? নদীর ভাটিতে যুদ্ধে যায় নি সে?
মাথা নাড়লো ক্ৰাতাস। না। ও নেই হয়ে গেছে। পুরো থিবেসের পথে, পথে প্রতিটি বাড়িতে খুঁজে দেখেছে আমার লোক কোনো চিহ্নও নেই ট্যানাসের। খুব চিন্তিত আছি, টাইটা।
শেষ কবে দেখেছো ওকে?
রাজার বিয়ের দুই দিন পরে; যেদিন কর্ত্রী লসট্রিস আর তুমি গজ-দ্বীপের উদ্দেশ্যে রওনা হলে সেই সন্ধায়। অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছি, শুনলেই না।
কি বলেছে ট্যানাস?
হোরাসের প্রশ্বাস আর সমগ্র বাহিনীর দায়িত্ব আমার হাতে দিয়ে গেছে।
সে ওটা করতে পারো না, তাই না?
তা-ই করেছে সে। বাজপাখির প্রতাঁকের ক্ষমতাবলে।
মাথা ঝাঁকালাম। তারপর?
বললাম তো–হারিয়ে গেছে।
মদের পাত্রে চুমুক দিয়ে ভাবতে বসলাম আমি।
জানালার কাছে গিয়ে পেচ্ছাব করে এলো ক্ৰাতাস। নিচে, কারও গায়ে ঝরলো সেই তরল; কোনো এক রাগত পথিকের চিৎকার শোনা গেলো, কোথায় মুতিস, ব্যাটা নোংরা শুয়োর!
জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে কাতাস তার ঘাড় ভাঙার অভিলাষ ব্যক্ত করতেই ঠাণ্ডা হয়ে আসে লোকটা। সাম্প্রতিক এই বিজয়ে উল্লসিত ক্ৰাতাস আমার কাছে ফিরে আসতেই শুধালাম, তোমাকে ছেড়ে যাওয়ার সময় ট্যানাসের মনের অবস্থা কেমন ছিলো?
আবারো মেঘ ঘনায় ক্রাতাসের চেহারায়। এতো ক্ষ্যাপাটে ওকে আর দেখি নি কোনোদিন। দেবতা আর ফারাও-কে সমানে অভিশাপ দিচ্ছিলো। এমনকি, কর্ত্রী লসট্রিসকে পর্যন্ত রাজকীয় বেশ্যা বলে গাল দিয়েছিলো।
আঁতকে উঠলাম। যদিও জানি, মন থেকে কথাটা বলে নি ট্যানাস। অসহায় প্রেমিকের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিলো সেটা।
ও বলেছিলো, দেশদ্রোহিতার জন্যে ফারাও ওকে লটকাতে চাইলে তা-ই সই, সেটাই নাকি ভালো হবে তার জন্যে। ভীষণ খারাপ অবস্থায় ছিলো তখন ট্যানাস, আমার কোনো কথাতেই কান দেয় নি সে।
ব্যাস, এ-ই? কী করবে, কোথায় যাবে কিছু ইঙ্গিত দিয়ে যায় নি? মাথা নেড়ে আবারো পাত্রে মদ ঢেলে নেয় ক্ৰাতাস।
বাজপাখির প্রতাঁকের কী হলো? জানতে চাইলাম।
আমার কাছে রেখে গেছে। ওর নাকি ওটা দিয়ে আর কোনো কাজ নেই। হোরাসের প্রশ্বাসে নিরাপদে রাখা আছে ওটা।
অন্যান্য যেসব ব্যাপারে তোমার সাথে কথা বলে গিয়েছিলাম তার কী হলো? যা বলেছি, করে রেখেছো?
বিষণ্ণ চিত্তে পাত্রের সুরার দিকে তাকালো ক্ৰাতাস। আয়োজন শুরু করেছিলাম, বিড়বিড় করে বলে চললো সে, কিন্তু, যখন ট্যানাস চলেই গেলো, আর উৎসাহ পাই নি। আর তাছাড়া, নদীর ভাটিতে যুদ্ধে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।
খুবই অবিশ্বস্ত কাজ হলো এটাক্ৰাতাস, তোমার যোগ্য নয়। আমার কর্ত্রী, লসট্রিস তোমার ভরসাতেই ছিলো । ও বলেছে, তোমাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করে সে।
ক্রাতাস আমার কর্ত্রীর আরো একজন মুগ্ধ ভক্ত। আমার এ কথাতে কাজ হলো, লসট্রিসের একটু অসন্তুষ্টির কারণ হতে চায় না সে।
ওহ্, হো, টাইটা! তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে আমি একটা দুর্বল গর্দভ–নীরবে বসে রইলাম আমি। নীরবতা অনেক সময় খুব বেশি পীড়া দেয়। হোরাসের কসম কর্ত্রী–লসট্রিস আমার কাছে কী চান?
এখান থেকে চলে যাওয়ার আগে যা যা করতে বলেছিলাম তোমাকে ঠিক তাই, বললাম তাকে। ধপাস করে হাতের পাত্র নামিয়ে রাখলো সে।
আমি সৈনিক। দায়িত্ব ফেলে রেখে অর্ধেক বাহিনী নিয়ে কোনোরকম আজব খেলাতে অংশগ্রহণ করা সাজে না আমার পক্ষে। ট্যানাস যখন বাজপাখির প্রতাঁকের মালিক ছিলো, তখন অন্য কথা। আর এখন
আর এখন তোমার কাছে আছে ওটা। নরম স্বরে বললাম।
নীরবে তাকিয়ে থাকলো ক্ৰাতাস। কিন্তু ট্যানাসের অনুমতি ছাড়া–।
তুমি তার বিশ্বস্ত সহচর। ট্যানাস ওটা তোমাকে দিয়েছে ব্যবহার করার জন্যে। কাজেই, যা ভালো বোঝো করতে হবে তোমাকে। অবশ্যই করতে হবে। আমি খুঁজে নিয়ে আসবো ট্যানাসকে, কিন্তু ততক্ষণে তৈরি হয়ে থাকতে হবে তোমাকে। অনেক রক্ত ঝরবে সামনে, প্রচুর কাজ তোমাকে বড়ো প্রয়োজন তার। আবারো তাকে হতাশ করো না।
এই কথায় রাগে চেহারা লাল হয়ে উঠে ক্রাতাসের। এই কথা গিলে নিতে বাধ্য হবে তুমি–এই বেলা বলে দিলাম! প্রতীজ্ঞা ফুটে উঠলো তার কণ্ঠস্বরে।
নিঃসন্দেহে, সেটাই হবে আমার আহার করা সবচেয়ে উপাদেয় খাবার! বললাম তাকে। সাহসী আর সৎ লোক পছন্দ করি আমি, খুব সহজেই মানানো যায় এদের।
*
ট্যানাসকে কেমন করে খুঁজে বের করবো ভেবে কোনো কূল কিনারা পেলাম না। ক্ৰাতাসকে রেখে শহরে বেরিয়ে পড়লাম। আবারো ট্যানাসের পুরোনো ভেঁরা, শহরের গলি-ঘুপচি ওর খোঁজে চষে ফেললাম। যাকে সামনে পেলাম, জিজ্ঞেস করলাম কবে, কোথায় দেখেছে ট্যানাসকে। জানি, এতে করে দারুন বিপদের ঝুঁকি নিচ্ছি। আমার পরিচিত কারো সামনে পড়ে গেলে এই ছদ্মবেশ কোনো কাজেই আসবে না। কিন্তু আমাকে তো খুঁজে বের করতেই হবে তাকে। রাতের শেষ প্রহর পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে গেলাম, শেষমেষ ক্ষান্ত দিতে হলো।
সকাল হয়ে এসেছে। নীলের তীরে দাঁড়িয়ে ক্লান্ত, অসহায় আমি ভাবতে চেষ্টা করলাম কোথাও খুঁজতে বাকি রেখেছি কি না। মাথার উপরে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে ডেকে উঠলো বুনোহাঁসের দল। পুব আকাশের স্নান সোনালি-তামাটে আভায় উড়ে চলেছে ওরা। অনেক সুখ-স্মৃতির কথা মনে করিয়ে দিলো ওগুলো; আমাদের তিনজনের ট্যানাস, আমি আর মিসট্রেসের। কত দিন জলার ধারে সকালে শিকার করেছি আমরা, ইয়ত্তা নেই।
