তীরে পৌঁছেই সঙ্গে করে নিয়ে আসা ছদ্মবেশ নিলাম। ওসিরিসের মন্দিরের একজন পুরোহিত সেজে নিয়েছি, আমার কর্ত্রীর আমোদের জন্যে বহুবার ওটা পরে পুরোহিতদের মতো ভাবগম্ভীর হাঁটা অনুশীলন করেছি আগে। কেবল একটা পরচুলা, কিছুটা প্রসাধনী আর সঠিক পোশাক একেবারে পুরোহিত বানিয়ে ছেড়েছে আমাকে। সবসময় পথ-চলতির উপরেই থাকে এই পুরোহিতেরা; নদীর উজান-ভাটিতে অবিরত যাওয়া-আসা–এক মন্দির থেকে অন্য মন্দিরে। পথে পথে ভিক্ষা বা সাহায্য চেয়ে ফিরে। কাজেই, খুব কম লোকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ হবে এই পোশাকে; শ্রাইকরাও আক্রমণে উৎসাহিত হবে না। মন্দিরের লোকেদের কেনো যেনো ঘটায় না এরা।
হ্রদ ছেড়ে তীরে উঠলাম। গরিব মানুষের এলাকা হয়ে পশ্চিম গজ-দ্বীপে প্রবেশ করছি। বন্দরে পৌঁছে সোজা চলে এলাম শস্যদানা ভর্তি এক জাহাজ-মালিকের কাছে। দেবতাদের দোহাই দিয়ে যথার্থ ভাবগম্ভীরতার সাথে তাকে অনুরোধ করলাম, নিরাপদে কারনাকে পৌঁছে দিতে। কাঁধ ঝাঁকিয়ে সায় দিলো সে। হতে পারে, পুরোহিতদের অপছন্দ করে অনেকেই, কিন্তু অতিন্দ্রিক যে কোনো কিছুকে ভয় পায় লোকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে, স্বয়ং ফারাও-এর মতো ক্ষমতাবান ধর্মের সেবকেরা।
পূর্ণিমা আজ। আর, নেমবেটের তুলনায় এই জাহাজের চালক অনেক বেশি দক্ষ। রাতে আর নোঙর করলাম না আমরা। বাতাসের সহায়তায়, স্রোতের অনুকূলে তরতর করে এগিয়ে চললো জাহাজ। পঞ্চম দিনে নদীর শেষ বাঁক ঘুরতেই সামনে দেখা গেলো কারনাক শহর।
তীরে নামতে অস্বস্তি বোধ হতে লাগলো, এ আমার শহর, প্রতিটি মানুষ ভিক্ষুক বা ভবঘুরে-চেনে আমাকে। যদি কেউ চিনে ফেলে, মুহূর্তেই সংবাদ পৌঁছে যাবে ইনটেফের কাছে। যা হোক, ছদ্মবেশের বদৌলতে নিরাপদে হেঁটে চললাম আমি, অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্যানাসের বাহিনীর তাঁবুতে পৌঁছলাম ।
সদর দরোজা হাঁ হয়ে খোলা। সহজে ভেতরে ঢুকে পড়লাম, যেনো এটা আমারই বাড়ি। সম্পূর্ণ খালি পড়ে আছে জায়গাটা, এমন কিছু বা কেউ নেই যার থেকে কোনো খবর পাওয়া সম্ভব। মনে হলো, আমার এবং মিসট্রেসের চলে যাওয়ার পর থেকে খালি পড়ে আছে স্থানটা। খাবার পাত্রে ধুলোর পুরু আস্তরণ, দুধের জগে পচা দই।
কিন্তু, হারায় নি কিছুই; এখনও উপরের তাকে রাখা আছে সেই লানাটা ধনুক। ব্যাপারটা যদিও অস্বাভাবিক ট্যানাস সাধারণত হাতছাড়া করে না ওটা। এ অনেকটা তার শরীরের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গের মতো ছিলো। বিছানার নিচে, আমারই তৈরি করা একটা গোপন জায়গায় অস্ত্রটা লুকিয়ে রাখলাম। অন্ধকার নামা পর্যন্ত ট্যানাসের আস্তানায়ই রইলাম, পাছে দিনের আলোয় কেউ চিনে ফেলে আমাকে। জায়গাটা সাফ সুতরা করে ব্যয় করলাম পুরোটা সময়।
রাতে, অন্ধকারে মিশে নদীর ধারে চলে এলাম। নোঙর করা আছে হোরাসের প্রশ্বাস। শেষবার যখন দেখেছিলাম ওটাকে, তার পরে নির্ঘাত যুদ্ধে গিয়েছে জায়গায় জায়গায় তার নিদর্শন ফুটে আছে। ভেঙে গেছে গলুই, পাটাতনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হালটা ঠিক আমার পরামর্শ মতো নতুন করে নকশা করা হয়েছে দেখে আনন্দ হলো খুব। ধাতব পাতে মোড়া গলুই চোখা হয়ে বেরিয়ে আছে কয়েক ফুট সামনে, পানির স্তরের ঠিক উপরে। ওর অবস্থা দেখে বুঝতে পারছি, মুখোমুখি সংঘর্ষে লাল ফারাও-এর নৌবাহিনীর কী ভয়ানক ক্ষতি করে এসেছে ওটা।
কিন্তু, ট্যানাস বা ক্ৰাতাস কেউ নেই পাটাতনে। বন্দরের ঘাটে শোরগোল করতে থাকা নাবিকদের উদ্দেশ্যে এগুলাম। কাছাকাছি একটা ছোট্ট প্রকোষ্ঠে ক্রাতাসের দেখা পাওয়া গেলো। সমানে পান করছে, জুয়া খেলা চলছে সব মিলিয়ে নরক-গুলজার। এই জায়গায় তাকে ইশারা করা সাজে না, অপেক্ষা করতে লাগলাম। ওদিকে, দুই রূপোপজীবনী আমাকে তাদের সম্পদ দেখানোর জন্যে উঠে-পড়ে লেগেছে বাইরের অন্ধকার গলিতে নিয়ে যেতে চাইছে। এমনকি, আমার পুরোহিতের পোশাকও তাদের প্রচেষ্টায় এতটুকু প্রভাব রাখতে পারছে না।
অবশেষে, বন্ধুদের শুভরাত্রি জানিয়ে বাইরের গলিতে পা রাখলো ক্ৰাতাস, ওর পিছু নিলাম আমি।
কী বলতে চাও তুমি, হে পুরোহিত? বিরক্ত স্বরে বললো ক্ৰাতাস। কি চাও? স্বর্ণমুদ্রা?
হ্যাঁ, তাই নেবো, উত্তরে বললাম। অন্য অনেকের চেয়ে ওটা বেশি আছে তোমার, ক্ৰাতাস। জায়গায় জমে গিয়ে সন্দেহপূর্ণ চোখে আমার দিকে তাকালো সে। সুরার প্রভাবে একটু একটু টলছে।
আমার নাম জানলে কেমন করে? আমার জামার হাত ধরে টেনে আলোর নিচে নিয়ে গেলো ক্ৰাতাস। ভালো করে পরখ করছে মুখটা, অবশেষে একটানে পরচুলা সরিয়ে ফেললো।
সেথ-এর পাছার বিষফোঁড়ার কসম! এ যে টাইটা! গর্জে উঠে সে।
দয়া করে চেঁচিয়ো না। এই কথায় সতর্ক হয় ক্ৰাতাস।
এসো! আমার কক্ষে চলো।
একা হতেই, দুই পাত্রে সুরা ঢেলে একটা এগিয়ে দিলো সে। এখনও কী যথেষ্ট পান করা হয় নি তোমার? আমার এই প্রশ্নের উত্তরে কেবল হাসলো ক্ৰাতাস।
এর উত্তর তো সকালের আগে পাওয়া যাবে না, টাইটা। এখন কী? এতো শক্ত হও কেনো রে ভাই। গত তিন সপ্তাহ ধরে নদীর ভাটিতে লড়াই করেছি। মিষ্টি মাতা হাপি! তোমার নতুন চোখা গলুই কাজে দিয়েছে! কম করে হলেও বিশটি গ্যালি স্রেফ দু টুকরো করেছি আমরা, আর দুশ বজ্জাতের কল্লা ফেলেছি। এতো কাজের চাপে কেবল পানি পরেছে পেটে–ভেবে দ্যাখো। অন্তত মদ খেতে বাধা দিও না। পান করো আমার সাথে! পাত্র উঁচু করে ধরে সে, আমারও কম তৃষ্ণা পায় নি; স্যালুট করে ঠোঁটে ঠেকালাম পাত্র। ট্যানাস কোথায়?
