এবারে আতন এগিয়ে আসে। টাইটা ইচ্ছে করলে রাজার শয্যাকক্ষের বাইরে অপেক্ষা করতে পারে। আমার সাথে। সে যেহেতু রাজার চিকিৎসক–ওর সেবা প্রয়োজন হতেই পারে। আমার কর্ত্রী পায়ের আঙুলের উপর দাঁড়িয়ে আতনের গালে চুমো খায় এই কথায়।
তুমি খুব ভালো, আতন। লজ্জায় একেবারে পাকা কুমড়ো ধারণ করলো আতনের মুখাবয়ব।
শক্ত করে আমার হাত ধরে থাকলো লসট্রিস। আতনের পিছুপিছু প্রাসাদে, রাজার শয্যাকক্ষের দিকে চললাম আমরা। কক্ষের বাইরে দাঁড়িয়ে শেষ বারের মতো শক্ত করে হাতে চাপ দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে উদ্যত হয় লসট্রিস। আর কখনও এতো সুন্দর, এতো নাজুক মনে হয় নি ওকে। আমার হৃদয় যেনো ভেঙে যেতে চাইলো, কিন্তু হেসে সাহস দিলাম ওকে। পর্দা সরিয়ে শয্যাকক্ষের ভেতরে ঢুকে পড়লো মিসট্রেস। রাজার মৃদু সম্ভাষণ, প্রত্যুত্তরে লসট্রিসের নরম কণ্ঠ শুনতে পেলাম।
বাইরে, ছোটো কাঠের চৌকিতে আমার বিপরীতে বসে পড়লো আতন। বাক্য বিনিময় না করে বাও বোর্ড খুলে বসলো । খেলায় মনোযোগ দিতে পারছিলাম না আমি, পাথরের খুঁটিগুলো আনমনে নেড়ে চাল দিতে লাগলাম কাঠের বোর্ডের উপর। পর পর তিন বার জিতে গেলো আতন। এর আগে খুব কমই হারাতে পেরেছে সে আমাকে। কিন্তু আমাদের পেছনের কক্ষ থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বর আমার মনোযোগ সরিয়ে রাখলো পুরোটা সময়। যদিও টুকরো টুকরো কথাবার্তার কিছুই বুঝতে পারলাম না, তবু কান পেতে রইলাম।
এরপর, প্রায় পরিষ্কার শুনতে পেলাম, আমার কী বলছে, আমার প্রতি সদয় হোন, মহান ফারাও অনুরোধ করি, আমাকে ব্যথা দেবেন না। এতো মর্মস্পর্শী ছিলো সেই আবেদন, এমনকি আতন পর্যন্ত কেশে উঠে জামার হাতায় নাক মুছলো।
বেশ কিছু সময় আর কোনো শব্দ নেই। এরপরেই, তীক্ষ্ণ কণ্ঠে আর্তনাদ করে উঠলো লসট্রিস। তারপর আবার সব চুপচাপ।
বাও বোর্ড সামনে নিয়ে নীরবে বসে রইলাম আমি আর আতন–কেউই আর খেলার ভান করছি না। কত সময় পেরুলো ওভাবে, জানি না, রাতের শেষ প্রহরে পর্দার ওপাশ থেকে ভেসে এলো রাজার নাসিকা গর্জনের আওয়াজ। আমার উদ্দেশ্যে মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়ায় আতন।
সে পর্দা সরিয়ে ভেতরে যাওয়ার আগেই ফাঁক গলে বেরিয়ে আসে লসট্রিস। আমাকে বাড়ি নিয়ে চলো, টাইটা। ফিসফিস করে বলে সে।
কোনোকিছু না ভেবেই ওকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিলাম, ছোট্ট বাচ্চার মতো আমার ঘাড় জড়িয়ে ধরে রইলো লসট্রিস। প্রদীপ হাতে হারেম পর্যন্ত রাস্তা দেখালো আতন। মিসট্রেসের শয্যাকক্ষের দরোজায় আমাদের ছেড়ে গেলো সে। বিছানায় শুইয়ে দিলাম আমি লসট্রিসকে। এরপরে, নরমভাবে পরীক্ষা করে দেখলাম ওকে। সিল্কের মতো মসৃণ দুই উরুতে সামান্য রক্তের দাগ লেগে আছে। কিন্তু রক্তপাত থেমে গেছে আপনাতেই। ওদিকে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে লসট্রিস।
কোনো ব্যথা আছে, ছোট্ট সোনা? আস্তে করে জানতে চাইলাম। চোখ খুলে মাথা নাড়লো ও।
এরপর, অপ্রত্যাশিতভাবে হাসলো মিসট্রেস। এত্তো কথা শুনেছি এটা নিয়ে, বিড়বিড় করে বলছিলো ও। কিন্তু, এ তো কিছুই নয়। বেশি সময়ও লাগে নি। কুঁকড়ে গোল হয়ে ঘুমিয়ে পড়লো মিসট্রেস, আর একটি শব্দও উচ্চারণ করলো না।
স্বস্তিতে প্রায় কেঁদে ফেললাম আমি। দীর্ঘ প্রস্তুতি এবং লতাগুল্মের মলম কাজ দিয়েছে। আমার মিষ্টি সোনামণি, লসট্রিসের নরম মনে বা দেহে কোনো ক্ষতি করতে পারে নি ফারাও-এর দুর্বল সঙ্গম।
*
অলসতায় কেটে যেতে লাগলো গজ-দ্বীপে দিনগুলো। ধীরে ধীরে আমার কর্ত্রীও নিজেকে সম্পূর্ণ মানিয়ে নিলো পরিপার্শ্বের সাথে । যতই সময় পেরুলো, অস্থিরতা বোধ করতে শুরু করলাম আমি। কে জানে, কী করলো ক্ৰাতাস। ট্যানাসেরই বা কি হলো–ভেবে দুই চোখের পাতা এক করতে পারছিলাম না। ওদিকে লসট্রিসও তাগাদা দিতে শুরু করেছে, এখান থেকে চলে যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে আমার। মনস্থির করে ফেললাম-এখনই উপযুক্ত সময়।
যেই ভাবা সেই কাজ–পরদিন সকালে সূর্যোদয়ের আগেই একা একা মাছ শিকারে বেরুলাম আমি ছোট্ট নৌকায় চড়ে। তবে যাওয়ার আগে নিশ্চিত করে নিলাম, কমপক্ষে বারোজন দাস বালক, প্রহরী দেখেছে আমাকে নৌকায় চড়তে।
হ্রদের পেছন দিকে এসে চামড়ার থলে খুলে বের করলাম আমার পোষা বিড়ালটাকে। বুড়ো হয়ে গেছে ওটা চোখে তো দেখতে পায়ই না, দুই কানেও বিষফোঁড়ার ব্যথায় মরো মরো অবস্থা। ওর এই দুরবস্থা থেকে মুক্তির ব্যবস্থা হিসেবে ধুতুরার বিষ সমেত এক টুকরো গোশতো খেতে দিলাম। কোলে বসে আনন্দে মিউ মিউ শব্দ করে খেতে লাগলো ওটা। কিছু সময়ের মধ্যেই মরে গেলো, টু শব্দটি না করে। নিপ্রাণ জীবটার গলা কাটলাম আমি এবারে।
নৌকায় ভালো করে বিড়ালের রক্ত ছিটালাম এরপর। লাশটা রাখলাম পাটাতনে, জানি, কুমিরের দল কিছুক্ষণের মধ্যেই কাড়িকাড়ি শুরু করে দেবে ওটার জন্যে। এবারে, আমার হারপুন এবং অন্যান্য সরঞ্জাম নৌকায় রেখেই মৃদু-মন্দ স্রোতে ভাসিয়ে দিলাম নৌকা; নিজে নেমে পড়লাম প্যাপিরাসের ঝোঁপ ঘেঁষে অল্প পানিতে। পানি ঠেলে তীরে চলে এলাম।
আগেই ঠিক করে নিয়েছি, রাতের অন্ধকার পর্যন্ত অপেক্ষা করবে মিসট্রেস; এরপরে আমার অন্তর্ধানের খবর প্রকাশ করবে সে। কাজেই আগামীকাল দুপুরের আগে নৌকা বা রক্তের ছোপ আবিষ্কার করা সম্ভব হবে না কারো পক্ষে। সবাই ভাববে, কুমিরের পেটে গিয়েছি, নয়তো, শ্রাইকদের কোনো দলের হাতে কতল হয়ে গেছি আমি।
