মালিক, আমার পরামর্শ হলো নব্বই দিন সম্পূর্ণ হওয়াই ভালো। এর আগে কোনোকিছু করা বোকামী হবে। রাজার ইচ্ছাকে বোকামী বলাটা মারাত্মক হতে পারতো, কিন্তু আমি নিরুপায়। এতো কম সময়ের জন্যে আমাদের সমস্ত প্রচেষ্টায় জল ঢেলে দেওয়া ঠিক হবে না। গভীর চিত্তে রাজি হলেন ফারাও।
হারেমে ফিরে, রাজার ইচ্ছের কথা জানালাম আমার কর্ত্রীকে; তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া ছাড়াই ব্যাপারটা মেনে নিলো সে। এতোদিনে তার প্রতি রাজার পক্ষপাতিত্ব ভালো লাগতে শুরু করেছে মিসট্রেসের কাছে, এছাড়া আমার কথামতো ও বিশ্বাস করে বসে আছে–এই গজ-দ্বীপে তার বন্দীদশা কেবল নির্দিষ্ট একটা সময়ের জন্যে।
অবশ্য, এখানে আমাদের অবস্থানকে কোনোমতেই বন্দী-দশা বলার উপায় নেই। আমি এবং আমার কর্ত্রী–আমরা দুজনেই নীল নদের দু ধারের এই জমজ নগরীতে স্বাধীনভাবে ঘুরতে-ফিরতে পারি। দ্বীপের পথে পথে ইতোমধ্যেই দারুন জনপ্রিয় হয়ে গেছে লসট্রিস। সাধারণ জনতা ওকে দেখলেই ভীড় করে আসে–আশীর্বাদ, না হয় পরামর্শ নিয়ে। ওর নিজস্ব শহর থিবেসের মতোই এখানকার মানুষজনও তার সৌন্দৰ্য্য আর আভিজাত্যের অনুরাগী। তার নির্দেশে, সব সময় পিঠে এবং মিষ্টান্ন ভর্তি থলে নিয়ে ওর পিছনে চলতাম আমি; রাস্তায় যাদেরকেই ওর কাছে ভুখা মনে হতো–ওগুলো তাদের মাঝে বিতরণ করতো আমার কর্ত্রী । সব সময়ই, উচ্ছল বালকের দল চলতো আমাদের পিছু-পিছু।
গরিব-দুঃখী মানুষের দুয়ারে বসে, বাড়ির স্ত্রীদের মুখে তাদের দুঃখ-শোকের গল্প খুব মনোযোগ দিয়ে শোনে লসট্রিস। অথবা, গাছের তলায় বসে কৃষকের সাথে ঘণ্টার পর ঘন্টা আলাপে মগ্ন হয়। প্রথম সুযোগেই তাদের সমস্ত দুঃখের কথা ফারাও-এর কানে তুলতো সে। মাঝে-সাঝে, স্নেহবশত মেনে নিতেন ফারাও। সাধারণ জনতার কাছে দেবীরূপে আসীন হতে লাগলো লসট্রিস।
অন্যান্য দিনে, নীল নদের বন্যায় সৃষ্ট হদে আমাদের ছোটো নৌকায় বসে মাছ ধরি আমরা দুজনে। না হয়, বুনো হাঁসের জন্যে ফাঁদ পাতি। অবশ্যই ট্যানাসের লানাটার মতো নয়, তবে লসট্রিসের জন্যে ছোট্ট একটা ধনুক তৈরি করে দিয়েছি আমি। খুব কমই লক্ষ্য ভেদে ব্যর্থ হতো আমার কর্ত্রী । বুনো-হাঁস শিকারে ওর জুড়ি মেলা ভার।
যখনই শিকারে বেরুতেন ফারাও, লসট্রিস তার সঙ্গী হোত। প্যাপিরাসের ঝোঁপের ধার ঘেঁষে, বাহুতে বাজপাখি নিয়ে আমি চলতাম পিছুপিছু। কোনো হীরণ উড়ে গেলেই মৃদু শীষ বাজিয়ে নির্দেশ দিতে আমার কর্ত্রী। তার নির্দেশে ঠিক ঠিক উড়ে গিয়ে আক্রমণ শানাতো শিকারী-বাজ। গাঢ় নীল আকাশের বুকে কিছু সময়ের মধ্যেই হীরণের হালকা নীল পালক ছড়িয়ে পড়তো। নদীর মৃদু-মন্দ হাওয়া ধীরে ভাসিয়ে নিয়ে যেতো সেগুলো। আনন্দের আতিশায্যে হাততালি দিয়ে চেঁচিয়ে উঠতে মিসট্রেস।
আকাশ, জল আর মাটির সব পশুপাখি ভালোবাসি আমি। আমার কর্ত্রীও তার ব্যতিক্রম নয়। তাহলে কেনো আমরা দু জনেই শিকার পছন্দ করি–এ কথাটা বহুদিন ভেবেছি আমি। সম্ভবত, এটা সবচেয়ে বড় সত্যি যে, পুরুষ এবং অতি অবশ্যই নারীও, পৃথিবীর হিংস্রতম পরভোজী। শিকারী বাজ-এর গতি, তার ক্ষিপ্র-হিংস্রতা ভালোবাসি আমরা। হীরণ আর বুনোহাঁস হলো শিকারী বাজ-এর জন্যে দেবতাদের উপহার, ঠিক যেমন পৃথিবীর সমস্ত সৃষ্টির উপরে কর্তৃত্ব করি আমরা মানুষ। দেবতাদের দেওয়া এই দান তো আমরা উপেক্ষা করতে পারি না।
সেই শৈশবে, যখন মাত্র দাঁড়াতে শিখেছে লসট্রিস, আমার এবং ট্যানাসের সঙ্গে শিকারে বেরুতো সে। সম্ভবত প্রভু হেরাবের প্রতি তার হিংসা আড়াল করার জন্যেই ট্যানাসের সাথে আমাকে যেতে দিতেন ইনটেফ। বহু শিকার অভিযানে আমার এবং ট্যানাসের সঙ্গী হয়েছে লসট্রিস। ট্যানাস যেবারে সেই গবাদিপশু খেকো সিংহ মারলো, উপত্যকার উপরে, কালো-পাহাড়ে- সেদিনও মিসট্রেস ছিলো আমাদের সাথে। শিকারের সব কৌশল ওর নখদর্পনে। সমস্ত পশুপাখি, মাছ- সব প্রাণীর সঠিক নাম ধরে ডাকতে পারদর্শী আমার কর্ত্রী ।
তাবৎ প্রানিকুলের উপর আমাদের যেমন কর্তত্ব রয়েছে, ঠিক তেমনি, সব নারী পুরুষ হলো ফারাও-এর খোয়ারের পোষাপ্রাণী। তাকে লঙ্ন করে-এমন ক্ষমতা কারো নেই। ঠিক নব্বইতম রাতে, আমার কর্ত্রীকে তার শয্যাকক্ষে নিয়ে যেতে আতনকে পাঠালেন তিনি।
*
আমাদের মধ্যকার বন্ধুত্ব এবং মিসট্রেসের প্রতি তার ভক্তির কারণে আসার বেশ অনেকক্ষণ আগেই জানিয়ে গিয়েছিলো আতন। এতে করে, শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতির কিছু সুযোগ পেয়ে গেলাম।
শেষবারের মতো মিসট্রেসকে দিয়ে অনুশীলন করিয়ে নিলাম–কী কী বলতে হবে ফারাওকে, কিভাবে ব্যবহার করতে হবে। এরপর, সেই মলমটা লাগিয়ে দিলাম ওর যোনীদ্বারে। কেবল পিচ্ছিলকারকই নয়, ব্যথাও অনেকটা কমায় এই জিনিস। অবশ করে দেয়।
আতন সদর দরোজায় আসার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত শক্তই ছিলো আমার কর্ত্রী, এরপরেই একেবারে ভেঙে পড়লো সে। আমার দিকে ফিরে কাঁদতে লাগলো লসট্রিস । আমি একা যেতে পারবো না, ভয় লাগছে। দয়া করে আমার সাথে এসো, টাইটা। আমার দেওয়া প্রসাধনীর নিচে ওর চেহারা একেবারে বিবর্ণ হয়ে গেছে, ভয়ে দাঁতে দাঁত বাড়ি খাচ্ছে।
মিসট্রেস, তুমি জানো–এটা সম্ভব নয়। ফারাও তোমাকে ডেকেছেন। অন্ততঃ এইবার আমার কিছুই করার নেই।
