আর এসব কিছুর মাঝেই দারুন বৈপরিত্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গজ-দ্বীপ-নদীর রুপালি মুকুটে সবুজ পান্নার মতো জ্বলে আছে। দ্বীপের তীরে সাড়িবদ্ধ বোল্ডারের আকৃতি অনেকটা বিশাল হাতির মতো সে অনুসারেই এর নামকরণ। এছাড়াও, বিগত এক হাজার বছর ধরেই, জলপ্রপাতের ওপারে, সেই অসভ্য কূশ দেশ থেকে আইভরি নিয়ে আসা হতো এই দ্বীপে।
প্রায় পুরোটা দ্বীপে জুড়েই ফারাও-এর প্রাসাদের অবস্থান। উত্তরে যে আরেকজন ফারাও আছেন, তার থেকে সর্বাধিক দূরত্বে, নিরাপদ অবস্থানে থাকার স্পৃহা থাকা স্বাভাবিক।
চারপাশে পানি পরিবেষ্টিত এই দ্বীপ যথেষ্ট সুরক্ষিত। মহান থিবেসের পরে, পুব এবং পশ্চিম গজ-দ্বীপ আমাদের মিশরের উচ্চ-রাজ্যের সবচেয়ে বড় এবং জনবহুল নগর। নিম্ন-রাজ্যের শাসকের আবাসস্থল, মেমফিসের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়।
সমগ্র মিশরে এক গজ-দ্বীপেই রয়েছে বৃক্ষের অপূর্ব সমারোহ। প্রতি বছরের বন্যার পানিতে ভেসে আসে বিভিন্ন গাছের বীজ, নদীর জল-বিধৌত উর্বর মাটিতে খুব সহজেই জন্মে ওগুলো।
শেষবার এখানে এসেছিলাম ইনটেফের প্রতিনিধি হিসেবে, নীলের জলের অবিভাবক তিনি। তার পক্ষ থেকে পানির স্তর মাপা থেকে শুরু করে সমস্ত কাজ আমাকেই করতে হতো। প্রধান মালীর সহায়তায় বহু মাস ধরে এখানকার গাছপালা, প্রাসাদের বাগানের বৃক্ষরাজীর সবকিছু টুকে নিয়েছিলাম সেবার । তো, এক এক করে সেগুলোই চিনিয়ে দিতে লাগলাম আমার কর্ত্রীকে। এখানে রয়েছে ফিকাস বৃক্ষ যা আমাদের মিশরে আর কোথাও নেই। এর মূল যেনো পেঁচিয়ে থাকা অজগর, ফল জন্মে গাছের প্রধান কাণ্ডে, শাখায় নয়। আরো রয়েছে ড্রাগন-রক্ত গাছ। ওগুলোর কাণ্ড আঁচড়ালে উজ্জ্বল লাল তরল ঝরে। রয়েছে কূশীয় সিকামোর সহ একশ প্রজাতীর বৃক্ষ অনিন্দ্যসুন্দর এই দ্বীপের উপরে সবুজ ছাতার মতো ঘিরে আছে।
উর্বর মাটির তলায় অবস্থিত একখণ্ড বিরাট গ্রানাইটের উপর নির্মিত ফারাও-এর রাজপ্রাসাদ। একটা বিষয় আমাকে সব সময়ই ভাবায়, কেবল আমাদের রাজা নন; তার পূর্বে পঞ্চাশ বংশধারার যে বহু ফারাও শাসন করেছেন বিগত এক হাজার বছরে তাঁরা সবাই গ্রানাইট এবং মার্বেলের বিশাল সমাধি নির্মাণে সমস্ত সম্পদ, শক্তি ব্যয় করেছেন, অথচ জীবদ্দশায় বাস করতেন মামুলি মাটির তৈরি প্রাসাদে। কারনাকে, ফারাও মামোসের জন্যে যে সমাধি-মন্দির নির্মাণ করা হচ্ছে, তার তুলনায় এই প্রাসাদ খুবই অনাড়ম্বর। আমার ভেতরের স্থপতি কিংবা গণিতজ্ঞের সত্তাকে যেনো অপমান করলো এর স্থাপনা-কৌশল।
তীরে পৌঁছে নিজেদের প্রকোষ্ঠে যখন এলাম আমরা, গজ-দ্বীপের সত্যিকারের আকর্ষণ যেনো আরো সুনির্দিষ্ট হলো। স্বাভাবিকভাবেই, দ্বীপের সবচেয়ে উত্তর কোণে দেয়াল-ঘেরা হারেমে জায়গা হলো আমাদের। কিন্তু দেওয়ালের কারুকাজ এবং প্রকোষ্ঠের বিশালত্ব আমাদের প্রতি ফারাও-এর সুনজরের ঘোষণা দিচ্ছে। কেবল ফারাও-ই নন, রাজ-পরিচর্যক আতন পর্যন্ত লসট্রিসের নির্লজ্জ ভক্ত বনে গেছে।
বারোটি বড়, পরিচ্ছন্ন কক্ষ, সাথে নিজস্ব আঙ্গিনা, রান্নাঘর বরাদ্দ হলো লসট্রিসের জন্যে। প্রধান দেওয়াল সংলগ্ন একটা পার্শ্ব-দরোজা সরাসরি চলে গেছে নদীর ধারের পাথুরে ঘাটে। প্রথম দিনেই তলা সমান একটা নৌকা কিনে নিলাম আমি, এতে করে মাছ ধরা যাবে নদীতে। ঘাটে বেঁধে রাখলাম ওটা।
কিন্তু, আমাদের আবাসের স্বাচ্ছন্দ্যে আমি বা লসট্রিস কেউই সন্তুষ্ট হতে পারছিলাম না। পুরো প্রকোষ্ঠ ঢেলে সাজানোর কাজে হাত লাগালাম দুজনে। প্রধান মালীর সাহায্যে, আঙ্গিনায় নিজস্ব বাগান তৈরি করলাম আমি; মাথার উপরে পাতার আচ্ছাদন দিনের গরমে যেনো ওখানে বসা যায় সে ব্যবস্থা করলাম। আমার প্রিয় শিকার বাজপাখিগুলোও কাছাকাছি বসে ঠুকড়ে খেতে পারে।
নদীর ঘা থেকে সিরামিকের তৈরি নলের ভেতর দিয়ে সবসময় পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করলাম আমার জল-পদ্মের বাগান এবং মাছের পুকুরে। সংকীর্ণ একটা অংশ দিয়ে ফিরে যাবে উপচে-পড়া পানি, আমার কর্ত্রীর ব্যক্তিগত কক্ষের ভেতর দিয়ে, ছোট্ট আড়াল করা একটা অংশ হয়ে নীলের মূল প্রবাহে।
আমাদের প্রকোষ্ঠের দেওয়াল লাল-কাদায় তৈরি। ওগুলোর উপর ছবি আঁকলাম আমি এবং লসট্রিস। দেব-দেবীদের ছবি, পশুপাখি সমেত আমাদের এই মিশরের ছবি ছিলো সেগুলো। আইসিস-এর প্রতিরূপ হিসেবে অবশ্যই আমার কর্ত্রীকে ব্যবহার করলাম আঁকার সময়, তবে সমস্ত ছবির কেন্দ্রে রইলো হোরাসের ছবি লসট্রিসের আগ্রহে। লাল-সোনালি চুলো হোরাস যেনো একটু বেশিই পরিচিত অবয়বের বুঝে নিন, কার কথা বলছি!
ছবির কথা জানাজানি হতে সাড়া পরে গেলো হারেমে। রাজ-বধুরা এসে একে একে দেখে যেতে লাগলেন। হারেমের বাকি কক্ষের সাজ-সজ্জার ব্যাপারেও আমার পরামর্শ চাওয়া হলো। উপযুক্ত অর্থের বিনিময়ে সেটা অবশ্য দিলাম আমি। এতে করে হারেমে অনেক নতুন বন্ধু তৈরি হলো আমাদের।
শীঘ্রই সবকিছু শুনে চিত্রকর্ম পরখ করতে চলে এলেন ফারাও স্বয়ং। দেখা শেষ হতে, পাতার আচ্ছাদনের নিচে আঙ্গিনায় বসে সুরা পান করলেন। যাওয়ার সময় হতে আমাকে তার সাথে কিছুদূর এগুতে বললেন তিনি। আমরা হারেমের বাইরে আসতেই শুরু করলেন, গত রাতে, তোমার কর্ত্রীকে স্বপ্নে দেখেছি। জেগে দেখলাম, আমার বীজ ছড়িয়ে আছে চাদরের উপর। সেই বালক বয়সের পর এমনটি কখনও হয় নি আমার। আমি নিশ্চিত জানি, এর সঙ্গে আমার একটা পুত্রসন্তান হবে। আর দেরি করে লাভ নেই। তুমি কি বলো, এখনই কী একবার চেষ্টা করে দেখবো?
