আভিজাত্যপূর্ণ গাম্ভির্যের আড়ালে ফারাও মামোস অত্যন্ত দয়ালু এবং ভালো মনের মানুষ ছিলেন। খুব দ্রুতই এটা বুঝে গিয়েছিলো লসট্রিস, তার প্রতি কিছুটা হলেও শ্রদ্ধাবোধ জাগলো ওর মনে। আমরা গজ-দ্বীপে পৌঁছানোর আগেই ঠিক পিতৃব্য আচরণ করতে শুরু করেছিলো সে, ফারাও-এর প্রতি। সারাদিন নানান গল্প-খেলায় মেতে উঠতে লাগলো রাজার সাথে। পরে, আতন আমাকে জানিয়েছিলো কোনোদিনও তার মনিবকে এতো হাসতে দেখে নি সে।
যা বোঝার, বুঝে নিলো রাজসভার সদস্যরা। কিছুদিনের মধ্যেই, সন্ধেয় আমাদের তাঁবুতে ধরণা দিতে শুরু করলো চাটুকারের দল। লসট্রিসের মাধ্যমে রাজার কানে কোনো কিছু পৌঁছানোর অভিপ্রায় তাদের সবার ।
আমাদের যাত্রা শেষ হওয়ার আগেই সভাসদের দেওয়া উপঢৌকনের বদৌলতে বেশ ভালো রকম ধন-সম্পদের মালিক বনে গেলো আমার কর্ত্রী। এছাড়াও, প্রভাবশালী বহু বন্ধু-বান্ধবও পেয়ে গেলো সে। এসব কিছুরই পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব রাখছিলাম আমি।
কখনই এমনটি বলবো না, কেবল আমার জন্যেই সম্ভব হয়েছিলো এতো কিছু। আমার কর্ত্রীর সৌন্দৰ্য্য, তার বুদ্ধিমত্তা, উছুল-মিষ্টি ব্যবহার তার বড়ো সম্পদ। হয়তো আমি থাকাতে একটু দ্রুত সহজ হতে পেরেছিলো সে সবার সাথে।
সাফল্যের হাতে হাত ধরে এলো সমস্যা। আমাদের জনপ্রিয়তা ইর্ষার আগুন জ্বাললো উঁচু মহলে। ফারাও-এর আনুকূল্য-বঞ্চিত সভাসদেরা লসট্রিসের প্রতি তার এই প্রণয়ে দারুন অখুশি ছিলেন।
একদিন সন্ধায়, আমার তৈরি তরল পান শেষে রাজা বললেন, টাইটা, তোমার এই ওষুধ অত্যন্ত কার্যকরী। বহুদিন পর নিজেকে তরতাজা তরুণ বোধ হচ্ছে। আজ সকালে ঘুম ভেঙে জেগে দেখলাম, এতো দৃঢ় হয়ে আছে ওটা সাথে সাথে আতনকে ডেকে পাঠিয়েছিলাম দেখতে। দারুন খুশি হয়ে সে বললো, আজ রাতেই তোমার কর্ত্রীকে ডেকে পাঠাতে পারি আমি।
আতঙ্কে নীল; দারুন উদ্বিগ্ন আমি মুখ দিয়ে বাতাস ছেড়ে, আফসোসের ভঙ্গিমায় মাথা নেড়ে নিজের মতামত জানালাম। আতনের পরামর্শ যে মেনে নেন নি, আপনাকে সালাম। প্রভু, এক পলকে আমাদের এতো দিনের সমস্ত পরিশ্রম পণ্ড হয়ে যেতো তাহলে। যদি পুত্রসন্তান চান, আমার কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতে হবে।
সেই দিনের কথা ভেবে আশঙ্কায় বিবর্ণ হলাম আমি, যেদিন আমার নব্বই দিবস রজনীর বাধা শেষ লসট্রিসকে বিছানায় ডেকে পাঠাবেন তিনি।
লসট্রিসকে তৈরি করে নিতে হবে আমাকে এই অভিপ্রায়ে ওকে বোঝলাম, এটা অবশ্যম্ভাবী; যদি সত্যিই ফারাও-এর মৃত্যুর পরে ট্যানাসের কাছে যেতে চায় ও–তবে রাজার কাছে নিজেকে সমর্পণ করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। লসট্রিস বিচক্ষণ মেয়ে, বুঝলো সে।
তাহলে, তুমি আমাকে আগে থেকে বলে রাখো–কী ঘটবে সে রাতে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলো ও। এই বিষয়ে অভিজ্ঞ নই আমি, কিন্তু অন্তত প্রধান ব্যাপারগুলো সহজ করে বোঝালাম ওকে।
ব্যথা লাগবে, টাইটা? ওর প্রশ্নের জবাবে তড়িৎ বললাম, রাজা দয়ালু মানুষ। নিশ্চই বহু তরুণী মেয়ের অভিজ্ঞতা তার আছে, ব্যথা দেবেন না। এক ধরণের মলম দেবো তোমাকে যাতে করে আরো সহজ হয় ব্যাপারটা। প্রতি রাতে, শোবার আগে ওটা লাগিয়ে দেবো দেখবে, সহজে খুলে যাবে দরোজাটা। মনে রেখো, এ সমস্ত কিছুই ট্যানাসের জন্যে।
মনে-প্রাণে নিজেকে একজন চিকিৎসকের দায়িত্ব পালনে ব্যাপৃত করতে চাইলাম। দেবতারা ক্ষমা করুন, আমার সেই প্রচেষ্টা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হলো। লসট্রিসের নারী বৈশিষ্ট্য এতো সুন্দর, যেনো ফুটে থাকা গোলাপ। কিন্তু, অত চমৎকার পাঁপড়ি মরুর কোনো গোলাপে নেই। মলম লাগিয়ে দেওয়ার সময়ে নরম-মিষ্টি মধু ঝরলো ওটা থেকে, এতো মসৃণ-গরম কোনো তরল আমি কখনও প্রস্তুত করতে পারি নি।
গাল লাল হয়ে গিয়েছিলো লসট্রিসের, স্বর খসখসে। মৃদু স্বরে ও বললো, এতোদিন পর্যন্ত ভেবে এসেছি, কেবল বাচ্চা জন্ম হয় ওখান দিয়ে। কিন্তু, যখন ওটা লাগালে ট্যানাসের কথা খুব করে মনে পড়ে গেলো কেননা, বলো তো টাইটা?
এতো বিশ্বাস করতো ও আমাকে, আর শারীরিক-পরিতৃপ্তির অপরিচিত অনুভূতি সম্পর্কে এতো কাঁচা ছিলো; ঠিক যতক্ষণ প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশি সময় ধরে মলম না লাগানোর জন্যে নিজেকে জোর করতে হলো আমার। কিন্তু, সেদিন রাতে আর ঘুমাতে পারলাম না। অসম্ভবের স্বপ্ন তাড়া করতে লাগালো থেকে থেকে।
*
যতই দক্ষিণে ভেসে চললাম আমরা, নদীর দুই তীরের সবুজের সমারোহ ক্রমশই কমে আসতে লাগলো; চারপাশ থেকে ঘিরে আসছে মরুভূমি। কোথাও কোথাও গ্রাইনাইটের বিশাল খণ্ডগুলো জলপথ আড়াল করে ফেলেছে প্রায়।
দুর্গমতম জায়গাটার নাম হাপির প্রবেশদ্বার। উঁচু, সংকীর্ণ পাথুরে পথে গর্জন তুলে বয়ে চলেছে নীল নদের পানি; উন্মত্ত, বন্য যেনো নিজস্ব খেয়াল-খুশি আছে তার।
প্রাণান্ত প্রচেষ্টায় ওটা পেরিয়ে এলো জাহাজ বহর, অবশেষে গজ-দ্বীপে পৌঁছুলাম আমরা। নীলের সরু গলায়, যেখানে আগ্রাসী পাহারশ্রেণীর দাপটে সরু হয়ে গেছে নদী-প্রবাহ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বেশকিছু দ্বীপ। গজ-দ্বীপ তার মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ। ছোটো মাছের ঝাকের পেছনে আক্রমণরত হাঙরের মতো আকৃতি এই দ্বীপের । নদীর দু ধারের মরুর যেনো নির্দিষ্ট রঙ-চরিত্র আছে। পশ্চিম তীরের সাহারা মরু গনগনে কমলা; ঠিক তার বুকে বসবাসকারী বেদুঈনদের মতোই। আর পুবে, আরবীয় মরুর রঙ মলিন-ধূসর; বুকে ধারণ করে আছে কালো পাহারশ্রেণী–প্রচণ্ড দাবদাহের মরীচিকায় যেনো নৃত্যরত। এই মরু দুইয়ের একটা ব্যাপার এক এবং অভিন্ন মনুষ্যজাতীর জীবনসংহারী এরা।
