ওর কাজে সফল হওয়ার জন্যে আমরা কী করতে পারি, টাইটা? ট্যানাসের কথা বলতেই লসট্রিসের পূর্ণ মনোযোগ পেতাম। একটা সত্যি কথা বলে আমাকে, কোনো মানুষের পক্ষেই কি শ্রাইক-দের নির্মূল করা সম্ভব? এমনকি, ট্যানাসের মতো বীরের জন্যেও তো এটা অসম্ভব কাজ।
উচ্চ-রাজ্যে ত্রাস সৃষ্টিকারী দস্যুদল নিজেদের শ্রাইক বলে পরিচয় দেয়। আমাদের মিশরীয় ঘুঘুর চেয়েও ছোটো একটা পাখি আছে এই নামে; অন্য পাখির নীড়ে হানা দিয়ে ছিঁড়ে ফালাফালা করে দেহগুলোকে একাশিয়া গাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখে এরা। সেই কসাই পাখির নামেই নিজেদের পরিচিত করে উচ্চ-রাজ্যের দস্যুরা।
তোমার কী মনে হয়, বাজপাখির প্রতাঁকের কারণে সফল হবে ট্যানাস? লসট্রিস বলে চলে, আমি শুনলাম, উচ্চ-রাজ্যের সমস্ত শ্রাইকদের নেতৃত্ব দেয় একজন দস্যু–ওরা তাকে ডাকে আকহ্-সেথ নামে। এটা সত্যি, টাইটা?
আমিও সে রকমই শুনেছি, চিন্তান্বিত স্বরে বললাম। সে রকম হলে, ট্যানাস যদি এই আকহ্-সেথকে ধ্বংস করে দিতে পারে শ্রাইকদের মেরুদণ্ড ভেঙে যাবে। এ জন্যেই আমার সাহায্য বড়ো বেশি প্রয়োজন তার।
চোখ ছোটো করে আমার পানে চাইলো লসট্রিস। তুমি কী করে সাহায্য করবে? আর এইসব বিষয়ে তুমি কি-ই বা জানো?
বেশ চতুর মেয়ে আমার কর্ত্রী, ওকে ফাঁকি দেওয়া মুশকিল বটে। আমি যে কিছু একটা লুকোচ্ছি, এটা সে সাথে সাথেই বুঝে গেছে। আবারো পুরোনো অস্ত্র প্রয়োগ করতে হলো।
ট্যানাসের মঙ্গলের খাতিরেই এর বেশি আর জানতে চেয়ো না। কেবল, ওর সাহায্যার্থে যে কোনো কিছু করার অনুমতি দাও আমাকে।
নিশ্চই। বলো, আমি কিভাবে সাহায্য করবো ওকে?
গজ-দ্বীপে রাজপ্রাসাদে, তোমার সাথে নব্বই দিন থাকবো আমি, এরপরে ট্যানাসের কাছে যাওয়ার জন্যে ছুটি দিতে হবে আমাকে–
না, না–বাধা দিয়ে বলে ওঠে লসট্রিস, ট্যানাসকে সাহায্য করতে হলে এখনই রওনা হয়ে যাও তুমি।
নব্বই দিন, একগুঁয়ের মতো বললাম। এই সময় তো আমিই চেয়ে নিয়েছি ফারাও-এর কাছ থেকে। এখনই হঠাৎ করে রাজপ্রাসাদে এক ছেড়ে দেওয়া যাবে না লসট্রিসকে। একজন অভিভাবক প্রয়োজন ওর ।
এখনই নয়, তবে ওর কাছে যাবো আমি। ক্ৰাতাস আমার পথ চেয়ে বসে থাকবে। কিন্তু এই নব্বই দিনে, আমি কারনাকে ফেরার আগে যা যা করা দরকার সব বলে এসেছি কাতাসকে। সে সবকিছু তৈরি রাখবে। আর কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানালাম।
শুধুমাত্র দিনের আলোয় চলে জাহাজ বহর। রাতের অন্ধকার যেমন মিশরের সাহসী সিংহ, নেমবেটের নৌ-চালনায় উপযোগী নয়; আমাদের ফারাও-ও রাতে বিশ্রাম নেন। প্রতিরাতে নদীর ধারে একশ তাঁবুর মেলা বসে। সব সময়ই কোনো পাম গাছের তলায়, পাথুরে খোড়লে; মন্দির বা গ্রামের কাছেই ফেলা হয় তাবুগুলো। পুরো সভাসদের মাঝে এখনও উৎসবের আমেজ বিরাজমান। আগুনের ধারে নেচে-গেয়ে, খুনসুটি আর দেহজ প্রেমে বিভোর হয় তারা। দূরের মরু থেকে বয়ে আসা মিষ্টি হাওয়া কেমন শান্তির পরশ বুলায় শরীরে। প্রতিটি মুহূর্ত আমার এবং আমার কর্ত্রীর কাজে লাগালাম আমি। রাজার কয়েক শ পত্নীর মধ্যে লসট্রিস সবচেয়ে কনিষ্ঠ পুত্র সন্তান জন্মদানের আগ পর্যন্ত ওর কোনো মূল্য নেই হারেমে। যা করার, আমাকেই করতে হবে।
প্রায় প্রতি সন্ধাতেই, আমরা তীরে তাঁবু গাড়ার পরে আমাকে ডেকে পাঠাতেন ফারাও। যদিও বাহানা ছিলো ছত্রাক সংক্রমণের অবস্থা দেখার জন্যে, আসলে মিশরের দ্বৈত-মুকুটের উত্তরাধিকারী জন্মদানের জন্যে তার প্রস্তুতির খোঁজ-খবর সম্পর্কে আগ্রহী ছিলেন তিনি। তাঁর সাগ্রহ দৃষ্টির সামনে গণ্ডারের শিং এবং ম্যানড্রেকের গুল্ম থেকে মিশিয়ে নিতাম। ফারাও-এর সেবন শেষ হলে, রাজকীয় সদস্যের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে মনে মনে আশ্বস্ত হলাম–একজন দেবতার অনুপাতে সামাঞ্জস্যপূর্ণ দৈর্ঘ্য বা বেড়, কোনোটিই নেই এর। এমনকি, আমার কুমারী কর্ত্রীর জন্যেও সহজ হবে ওটাকে গ্রহণ করা। যতো যাই হোক, একদিন না একদিন তো রাজপত্নীর দায়িত্ব তাকে পালন করতেই হবে। রাতে, অলিভ তেলে ধোয়া একটা পুলটিস রাজকীয় সদস্যের উপরে জড়িয়ে রাখার পরামর্শ দিলাম ফারাও-কে। ইতিমধ্যেই, আমার মলমে তিন দিনের মধ্যেই ছত্রাক সক্রমণ থেকে আরোগ্য লাভ করেছিলেন তিনি। চিকিৎসক হিসেবে তাতে করে আমার অবস্থান আরো সুদৃঢ় হয় তার দরবারে। ফারাও-এর উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় সভাসদের কাছে দারুন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলাম আমি। আর যখন জানাজানি হলো, আমি শুধু যে চিকিৎসক, তা নয়, বরঞ্চ একজন ভবিষ্যত বক্তাও বটে–আমার জনপ্রিয়তার কোনো সীমা-পরিসীমা রইলো না।
প্রায় প্রতি সন্ধাতেই আমার কর্ত্রীর কাছে উপঢৌকন আসতো বিভিন্ন প্রভু, মন্ত্রীর তরফ থেকে, আমার পরামর্শ ধার চেয়ে। শুধুমাত্র অল্প কয়জন সভাসদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমাকে পাঠাতে মিসট্রেস।
ধীরে, হারেমের বাদ-বাকি সদস্যরা লক্ষ্য করলো, আমি এবং লসট্রিস খুব ভালো দ্বৈত-সংগীত গাইতে সক্ষম; বিচিত্র ধাঁধা, অসাধারণ সব গল্প–এসবই আমার এবং মিসট্রেসের নখদর্পনে। হারেমের শিশু, নারীদের কাছে ক্রমশই দারুন জনপ্রিয় হয়ে উঠতে লাগলাম আমরা।
শীঘ্রই ফারাও-এর কানে আমাদের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার খবর পৌঁছে গেলো। দিনে, ভ্রমণের সময়, রাজকীয় জাহাজে তার কাছে লসট্রিসকে ডেকে পাঠাতেন তিনি। রাজার সঙ্গে রাতের ভোজে শিশুতোষ ব্যবহারে সবাইকে মুগ্ধ করে রাখতে সে। আমি সব সময়ই কাছে-পিঠে থেকে সাহস জোগাতাম তাকে। রাতের পর রাত পেরিয়ে গেলো, অথচ তাকে শয্যাকক্ষে ডেকে পাঠানোর কোনো লক্ষণই দেখালেন না ফারাও এতে করে তাঁর প্রতি লসট্রিসের অনুভূতিতে একটু হলেও পরিবর্তন এসেছিলো।
