দ্রুত বলে যেতে লাগলাম আমি, তার আদেশে ইন্দ্রজাল ব্যবহার করেছিলাম রাতে। সঙ্গে সঙ্গে মনোযোগী হলো লসট্রিস। ঐশ্বরিক শক্তি তার খুব প্রিয় বিষয়। ইন্দ্রজাল অনুশীলনে যদি আমার শারীরিক কষ্ট না হতো, তবে প্রতিদিনই আমাকে দিয়ে ওটা করিয়ে নিতো সে।
কী দেখলে? বলো না! আবার উৎসাহ ঝিলিক দিতে লাগলো ওর চোখে। এখন আর মরার বাসনা নেই সেখানে, সব দুঃখ ভুলে গেছে মেয়েটা। এতো নিষ্পাপ, এতো সরল ও–প্রতারক মনে হতে লাগলো নিজেকে।
অসাধারণ সব জিনিস দেখেছি, মিসট্রেস। কোনোদিন এতো পরিষ্কার ছবি দেখি নি এর আগে। এতো সুন্দর, এতো গভীর–
আরে বলোই না!
কিন্তু প্রথমে প্রতিজ্ঞা করো, কাউকে বলবে না। আর কেউ যেনো এইসব কথা না জানে।
কসম! সত্যি, কাউকে বলবো না!
মানে, এতো হালকাভাবে বললে তো চলবে না–
এক্ষণ বলো, কী দেখেছো! আমার সাথে চালাকি করে লাভ নেই। এখন বলো, না হলে–না হলে–হাতের মুঠো পাকালো লসট্রিস। আবার মারব তোমাকে!
আচ্ছা, আচ্ছা। বলছি, শোনো। আমি দেখলাম, নীল নদের তীরে বিশাল একটা গাছ। তার ছুঁড়োয় বসে রয়েছে মিশরের মুকুট।
ফারাও! ওই গাছটা হলো রাজা! দ্রুতই বুঝে নিলো লসট্রিস। বলো, টাইটা! আর কী দেখেছো?
আমি দেখলাম, পাঁচবার নীল নদে বন্যা এলো। পানির স্তর উঠলো-নামলো ঠিক পাঁচবার।
পাঁচ বছর–তার মানে, পাঁচ বছর পেরুলো! খুশির আতিশায্যে হাততালি দিয়ে উঠলো লসট্রিস। ধাঁধার সমাধাণ তার অত্যন্ত প্রিয়।
এরপর, কীট-পতঙ্গ গাছটির অধিকার নিলো; মুকুট লুটালো ধুলোয়। সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেলো।
অবাক বিস্ময়ে আমার দিকে চেয়ে রইলো লসট্রিস, মুখে কথা নেই। আমি বলে চললাম, পাঁচ বছর পর মারা যাবেন ফারাও। তুমি মুক্ত হবে, মিসট্রেস। তোমার বাবার অধিকার থেকেও। তখন ট্যানাসের কাছে যেতে আর কোনো বাধা থাকবে না।
মিথ্যে বলো না আমাকে, টাইটা! পরে যদি দেখি–এসব মিথ্যে কষ্টে মরে যাবো।
এগুলো সত্যি, মিসট্রেস। কিন্তু আরো আছে। আমি দেখলাম, একটা নবজাতক ছেলে! সাথে সাথেই দারুন ভালোবাসা বোধ করলাম ওর প্রতি, আমি জানি, ওই বাচ্চাটার মা হবে তুমি।
কিন্তু, ওর বাবা কে, টাইটা? বলো না!
আমি একদম নিশ্চিত, ওর বাবা ট্যানাস। এখানে এসে প্রথমবারের মতো সত্যের অপলাপ করতে হলো, কিন্তু এ সবই তো ওর ভালোর জন্যে এই ভেবে মনে সান্ত্বনা পেলাম।
বেশ কিছু সময় নিরবে বসে রইলো লসট্রিস। এক অপার্থিব আভা তার চোখে মুখে–এর বেশি আর কী চাওয়ার আছে আমার? শেষমেষ, ফিসফিস করে ও বললো, পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে পারবো আমি। সারাজীবন অপেক্ষা করতেও রাজী ছিলাম। কষ্ট হবে, কিন্তু আমি পাঁচ বছর ট্যানাসের অপেক্ষা করবো। তুমি ঠিক করেছো, টাইটা সরতে দাও নি আমাকে। দেবতারা রুষ্ট হতেন তাহলে।
স্বস্তিতে ভেসে গেলাম, এখন আমি জানি, সামনের দিনগুলোয় ওকে সান্ত্বনা দিয়ে মানিয়ে নিতে পারবো।
*
দিন সকালে কারনাক ছেড়ে রওনা হলো রাজকীয় নৌবহর। তাঁর প্রতিজ্ঞা মতো, লসট্রিস এবং তার যাত্রা-সঙ্গীদের জন্যে আলাদা একটা ছোট্ট গ্যালির বন্দোবস্ত করেছেন রাজা; দক্ষিণের বাহিনীর সাথে।
বিশেষত লসট্রিসের জন্যেই পাটাতনের উপর তৈরি করা একটা প্রকোষ্ঠে ওর সাথে বসে রইলাম। আমরা দু জনেই পেছন ফিরে তাকিয়ে আছি দিনের প্রথম হলদেটে সূর্যরশ্মি যেনো আদরের পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে এতোদিনের প্রিয় কারনাক নগরীকে।
ও যে কোথায় গেলো, কে জানে। আমাদের জাহাজ-বহর পাল তোলার পর থেকে এই নিয়ে অনেকবার ট্যানাসের কথা বলেছে লসট্রিস। ভালো ভাবে খুঁজে দেখেছো তুমি? সবখানে?
সব জায়গায় খুঁজে দেখেছি, নিশ্চয়তা দিয়ে বললাম । সারাটা সকাল ধরে শহরতলী আর বন্দরে খুঁজেছি। নেই ও একেবারে মিলিয়ে গেছে বাতাসে। তবে, কাতাসের কাছে তোমার বার্তা পৌঁছে দিয়েছি। চিন্তা নেইক্ৰাতাস ঠিকই বলবে ট্যানাসকে।
পাঁচ বছর–ওকে ছাড়া পাঁচ বছর কেমন করে কাটবে, বলো তো টাইটা?
*
নদীর উজানে ভেসে চললো আমাদের জাহাজ বহর। অলস, আরামদায়ক দিনগুলো কেটে যেতে লাগলো আমার মিসট্রেসের সাথে হাস্যে-গল্পে। ভবিষ্যত নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করলাম আমরা, কী ঘটতে পারে সামনে, কী আশা করা উচিত এইসব।
রাজ্যসভার সমস্ত আচার, সম্ভাষণ, আনুষ্ঠানিকতা সম্পর্কে তাকে অবগত করলাম আমি। ফারাও-এর সিদ্ধান্ত গ্রহণ, শত্রু-মিত্র সব বিষয়েই কিছু না কিছু বললাম। এ ব্যপারে অবশ্য বন্ধু আতনের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। রাজ-পরিচর্য হওয়ায় বহুকিছু তার জানা। বিগত বারো বছরে গজ-দ্বীপ থেকে কারনাকে আসা প্রতিটি জাহাজে আমার জন্যে চিঠি পাঠাতো সে কেমন করে রাজ সভা চলে, কার কী উদ্দেশ্য, ক্ষমতা, অভিপ্রায় প্রায় সবকিছু নিয়ে আমাকে বিস্তারিত জানাতো আতন। অবশ্য, কৃতজ্ঞতার প্রকাশস্বরূপ একটা করে স্বর্ণমুদ্রা উপহার হিসেবে প্রতিবারেই পেতো সে আমার তরফ থেকে। লসট্রিসও মনোযোগী শ্রোতা। সমস্ত কথা হৃদয়ঙ্গম করে নিতে লাগলো সে।
খুব দ্রুতই একটা ব্যাপার বুঝে ফেললাম আমি। যে কোনো বিষয়ে লসট্রিসের মনোযোগ পেতে হলে এতটুকু বললেই যথেষ্ট যে, এইসব কিছু এক সময় ট্যানাসের উপকারে আসবে। যদি রাজসভায় তোমার ভালো ক্ষমতা থাকে, তো ওকে রক্ষা করতে পারবে তুমি। আমি বলেছি ওকে, অসম্ভব একটা কাজ দিয়েছেন রাজা তাকে। সফল হতে হলে আমাদের সাহায্য প্রয়োজন ওর; আর যদি ব্যর্থও হয়–এক তুমিই পারবে ওকে বাঁচাতে।
