কনুইয়ের উপর উঁচু হয়ে এক থাবায় ওটা ধরতে চাইলো র্যাসফার । কিন্তু সে নাগাল পাবার আগেই পা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিলাম আমি। রাসফারে যন্ত্রণায় হিংস্র আমোদ পাচ্ছি, যতোটা সম্ভব দীর্ঘায়িত করতে চাইছি ওর কষ্ট। কঁকিয়ে উঠে সে, ওহে টাইটা, দয়া করে দাও ওটা; না হয় পাগল হয়ে যাবো ব্যথায়।
চলো, বরং কিছুক্ষণ আলাপ করে নেই। তুমি কী জানো, লসট্রিস আমাকে উপহার হিসেবে চেয়ে নিয়েছে, তার বাবার কাছ থেকে?
এতো ব্যথার মধ্যেও হেসে উঠলো র্যাসফার। যদি মনে করে থাকো, ইনটেফ তোমাকে যেতে দেবেন তা হলে তুমি একটা গাধা। মরে গেছো তুমি, খোঁজা।
একই কথা বলেছিলেন ইনটেফ। আমার জন্যে শোক করবে না, র্যাসফার? কাঁদবে নাকি? মুচকি হেসে বললাম, চোখ দুধের পাত্রে।
আমি তো সব সময়ই তোমার ভক্ত হে, রাসফার বলে উঠে, এখন পাত্রটা দাও।
এততাই ভক্ত খোঁজা করে দিলে আমাকে? কেমন লেগেছিলো সেদিন? এই কথায় আমার পানে চেয়ে রইলো র্যাসফার।
এতো আগের কথা নিশ্চই মনে রাখো নি তুমি। সে তো বহু আগের কথা। আর তাছাড়া, ইনটেফের নির্দেশ কেমন করে অমান্য করতাম আমি?
তুমি হাসছিলে তখন। কেন হেসেছিলে, রাসফার? খুব মজা পেয়েছিলে, তাই না?
নড়ে উঠতেই ব্যথায় দম আঁকালো সে। আমি তো সবসময়ই হাসি। বন্ধু, ক্ষমা করে দাও, দয়া করে। ওই পাত্রটা দাও আমাকে।
পা দিয়ে পাত্রটা ঠেলে দিতেই প্রায় ছিনিয়ে নেয় র্যাসফার। ঠোঁটের উপর উঁচু করে ধরে।
জানি না, কী করছিলাম; কিছু বোঝার আগেই দেখি, পায়ের এক লাথিতে দুধের পাত্রটা ফেলে দিয়েছি আমি। দেওয়ালে দুধ ছিটিয়ে মাটিতে গড়িয়ে শান্ত হয় ওটা।
পরস্পরের দিকে অপলকে চেয়ে রইলাম আমরা। নিজের নির্বুদ্ধিতায় চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করলো আমার। বিষের যন্ত্রণায় নীল হয়ে মৃত্যু হোত এর যথার্থ শাস্তি। কিন্তু আমার পোষ্যদের বিকৃত দেহের কথা মনে হতেই বুঝলাম, কেন পারি নি রাসফারকে বিষ খেতে দিতে। একমাত্র একজন কাপুরুষই পারে এটা করতে।
র্যাসফারের রক্তবর্ণ দৃষ্টিতে ছায়া ঘনায়। বিষ! ফিসফিস করে বললো সে। দুধে বিষ ছিলো।
ওটা প্রভু ইনটেফ পাঠিয়েছিলেন আমায়, জানি না, কেন এইসব বলছিলাম ওকে। হয়তো, কাল রাতের ইন্দ্রজালের প্রভাবে এখনও দুর্বল আমি। কেঁপে উঠে দরোজার দিকে রওনা হলাম।
পেছনে, অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে র্যাসফার। তার হাসির দমকে দেওয়ালগুলো যেনো কেঁপে উঠে।
তুই একটা গর্দভ, ব্যাটা খোঁজা, পেছন থেকে চেঁচিয়ে বলে চলে সে, আমাকে মেরে ফেলাই উচিত ছিলো তোর। আর কখনও এমন সুযোগ পাবি না! আর, এবার, আমি তোকে মারবো-দেখিস, কোনো সন্দেহ নেই–আমি খুন করবো তোকে।
লসট্রিসের প্রকোষ্ঠে ফিরে দেখি, এখনও ঘুমিয়ে আছে সে। ওর পায়ের কাছে ঘুম ভাঙার অপেক্ষায় বসে রইলাম। গত রাত এবং আজকের দিনের ধকল আর সইতে পারলো না শরীর, ঠিক অসহায় কুকুরছানার মতোই মেঝেতে শুয়ে পড়লাম; ক্রমশই অন্ধকার হয়ে আসছে চারিদিক।
*
কিছু একটার আঘাতে ঘুম ভেঙে গেলো। মাথার এক পাশ দপ দপ করছে, পুরো জেগে উঠার আগেই দাঁড়িয়ে পড়লাম। সঙ্গেই সঙ্গেই বাড়ি লাগলো কাঁধে ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলাম। যেনো মৌমাছি কামড়েছে ওখানটায়।
আমাকে ঠকিয়েছো তুমি! চিৎকার করছে লসট্রিস, মরতে দাও নি! হাত-পাখাটা দিয়ে আবারও আঘাত করতে উদ্যত হলো সে। অস্ত্র হিসেবে মোটেও হেলাফেলা করা যায় না ওটাকে বাঁশের তৈরি লম্বা হাতল, অসট্রিচের পালকে তৈরি দাঁতওয়ালা ভীষণ শক্ত। ভাগ্যই বলতে হয়, ঘুমের ওষুধের প্রভাবে এখনও টলছে লসট্রিস, নিজের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। ওর হাঁকানো আঘাতের নিচে মাথা নামিয়ে নিতেই ভারসাম্য হারিয়ে বিছানায় পড়ে গেলো সে।
কান্নার দমকে ফুলে ফুলে উঠছে পিঠ। আমি তো মরতেই চাই; কেনো এমনটা করলে, টাইটা?
ধীরে ওর কাছে গিয়ে এক হাতে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে লাগলাম। ব্যথা লেগেছে, টাইটা? জানতে চাইলো লসট্রিস। কখনও তোমাকে মারি নি এর আগে।
প্রথমবারের চেষ্টাটা ভালোই ছিলো, ওকে স্বাগত জানিয়ে বললাম। এতো ভালো, মনে হয় আর অনুশীলন করার প্রয়োজন নেই! করুণ চেহারায় মাথা ডলতে লাগলাম, যেখানে লেগেছিলো আঘাতটা। কান্নার ভেতরেও হেসে ফেললো মিসট্রেস।
আহারে! সত্যি, বেশ খারাপ ব্যবহার করি তোমার সাথে। কিন্তু দোষ তোমার–মরতে দিলে না কেনো আমাকে? আমার আদেশ পর্যন্ত অমান্য করলে।
দ্রুত বিষয় পরিবর্তন করার প্রয়াস পেলাম। মিসট্রেস, দারুন খবর আছে তোমার জন্যে। কিন্তু, আগে আমাকে প্রতিজ্ঞা করো, কাউকে–এমনকি তোমার দাসীদেরকেও বলবে না কথাটা। কথা শেখার পর থেকে কোনো খবর কোনোদিন পেটে রাখতে পারে নি লসট্রিস; কিন্তু কোন মেয়েই বা পারে? প্রতিজ্ঞার কথায় বরাবরই আপুত হয় সে, এবারেও তার অন্যথা হলো না ।
এতো কান্না, ভগ্ন-হদয়েও ওর চোখে কৌতূহল ঝিলিক দিয়ে উঠলো। কান্না গিলে ফেলে সাগ্রহে উঠে বসলো সে, বলো আমাকে!
কিছু সময় চুপ থেকে কথা গুছিয়ে নিলাম। আমার পশুপাখির মৃত্যু বা ট্যানাসের দর্শন-লাভ–এসব কিছু বলা যাবে না ওকে। এমন কিছু বলতে হবে, যাতে করে ওর উৎসাহ বাড়ে।
গত রাতে ফারাও-এর শয্যাকক্ষে সারারাত কথা বলেছি তার সাথে।
দেখতে দেখতে কান্না উপচে পড়তে লাগলো লসট্রিসের চোখ থেকে। ওহ টাইটা! আমি ঘৃণা করি তাঁকে। কুৎসিত এক বুড়ো, তার সাথে–তার সাথে আমি—
