এক জীবনে, এমনকি একজন তুচ্ছ দাসেরও কতো কিছুর মালিকানা থাকে–ভেবে অবাক হতে হয়। কাজ শেষ হতে, পুরো এক দেয়াল জুড়ে উঁচু হয়ে রইলো আমার বাক্স-পেটরা। এতটা সময়ে আমার বিমর্ষভাব অনেকটা বেড়েছে, কিন্তু পরিবেশের নিরব ভাবটুকু ঠিকই ধরা পরলো কানে। কক্ষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সতর্কভাবে শুনতে লাগলাম। একমাত্র শব্দ বলতে আমার শিকারী বাজ-এর গলায় ঝোলানো ঘন্টার আওয়াজ। আর কিছু নেই। অন্য কোনো পশু বা পাখি একটি শব্দ পর্যন্ত করছে না ।
জানালার কাছে গিয়ে পর্দা সরিয়ে দিতেই ঝকঝকে সূর্যালোক যেনো অন্ধ করে দিতে চাইলো। এরপরে, দৃষ্টি ফিরে আসতেই আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠলাম আমি। প্রতিটি পশু-পাখি নিথর বিছিয়ে রয়েছে আমার চাতালে, বাগানে।
ঠিক যে যেখানে পরেছে, ওভাবেই মৃত্যুর কথা ঘোষণা করছে নিঃশব্দে। ছুটে গেলাম আমি, কেঁদে উঠে এক এক করে ডেকে চলেছি আমার প্রিয় পোষ্যদের নাম ধরে খুঁজে বের করতে চাইছি জীবনের এতটুকু চিহ্ন। এক বিন্দু নড়লো না একটি প্রাণীও। পাখিগুলোর শরীর দারুন হালকা, ছোট্ট কাগলো আমার হাতে।
মনে হলো, বিমর্ষ-ক্লান্ত এ হৃদয় বুঝি আর সইবে না। হাঁটুগেড়ে বসে ডুকরে কেঁদে উঠলাম আমি।
আরও অনেকক্ষণ পরে, এই নির্মম মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে ভাবার কথা মাথায় এলো। মেঝেতে পরে থাকা শূন্য মাটির পাত্রটা তুলে নিলাম। গন্ধ শুঁকে দেখলাম দারুন শক্তিশালী বিষ দেওয়া হয়েছিলো আমাকে মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে। যদিও টক দুধের গন্ধ অন্য যে কোনো ঘ্রাণ আড়াল করে ফেলেছে; আমি নিশ্চিত, দ্রুত কার্যকর বিষ ছিলো ওতে।
কোনো সন্দেহ নেই আমার মনে। কার নির্দেশে এই কাজ করা হয়েছে আমি জানি। বিদায়, প্রিয়। তুমি মরে গেছে, ইনটেফ বলেছিলেন আমাকে। একটুও দেরি করেননি তিনি।
উন্মাদ-রাগ আমাকে অধিকার করে নেয়। গতরাতের ধকল আর বিমর্ষ মন আরও ঘি ঢালে সেই অনুভূতির আগুনে। অভূতপূর্ব রাগে সর্বশরীর কাঁপছে আমার টের পেলাম। কোমর থেকে খুলে নিলাম ছোরাটা, নগ্ন ফলা হাতে উন্মত্তের মতো চাতালের ধাপ টপকে রওনা হলাম। জানি, সকালের এই সময়ে জল-বাগানে থাকবেন ইনটে। তাঁর এতো দিনের সমস্ত আচরণ, আমার প্রতি সমস্ত অন্যায়, অপমান যেনো প্রবল হয়ে উঠেছে। আঘাতে আঘাতে শেষ করে দেবো আমি তাকে, খুলে নেবো তার হৃদপিণ্ড।
জল-বাগানের দরোজা দৃশ্যমান হতে আমার ভেতরে যুক্তি ফিরে এলো। ছয় জন প্রহরী রয়েছে সেখানে, ভেতরে তো আরো আছেই। আমাকে দু টুকরো করে ফেলার আগে কিছুতেই ইনটেফের নাগাল পাবো না। রাগ নিয়ন্ত্রণে এনে ঘুরে দাঁড়ালাম। কাপড়ের আড়ালে ছোরাটা লুকিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক করবার প্রয়াস পেলাম। চাতালে ফিরে একে একে তুলে নিলাম নিথর দেহগুলো।
আমার বাগানের সীমানা বরাবর সিকামোর গাছের সারি লাগানোর ইচ্ছে ছিলো, সে কারণেই বেশ অনেকগুলো গর্ত তৈরি করা হয়েছিলো। এখন যখন আমি আর থাকবো না এখানে, গাছ লাগাবার প্রশ্নও উঠেনা–গর্তগুলোতে আমার প্রিয় পশু পাখিগুলোর কবর দিলাম। প্রায় বিকেল ঘনিয়ে গেছে। মাটি চাপা দেওয়া শেষ করেছি, কিন্তু আমার রাগ তখনও দমে নি পুরোপুরি। যদি সম্পূর্ণ না-ও পারি, কিছুটা হলেও প্রতিশোধ নিতেই হবে আমাকে।
তখনও আমার বিছানার পাশের জগে কিছুটা টক দুধ ছিলো। ওটা হাতে নিলাম আমি, চিন্তার ঝড় চলছে মাথায় কেমন করে রাজ-উজিরের রান্নাঘরে ঢুকবো। জানি, এই পরিকল্পনা সফল হওয়ার নয়। বিষ এবং অন্য যেকোনো বস্তু সম্পর্কে সচেতন ইনটেফ। আরো ধৈর্য ধরতে হবে আমাকে। যদি তাকে না-ও মারতে পারি এখন, অন্তত কিছু একটা করতে হবে আমাকে।
দুধের জগ হাতে নিয়ে দাস বালকদের প্রকোষ্ঠে ছেড়ে রাস্তায় নেমে এলাম। কিছুদূর যেতেই এক গোয়ালার দেখা পেয়ে গেলাম, তার সঙ্গেই রয়েছে ছাগীর দল। অপেক্ষায় রইলাম, ওদিকে আমার জগ কানায় কানায় পূর্ণ করে দিতে লাগলো সে। যেনো প্রস্তুত করে থাকুক, এতো তীব্র ছিলো সেই বিষ–অর্ধেক কারনাক-কে মেরে ফেলার জন্যে যথেষ্ট। জানি, এখনও জগে যেনো পরিমাণ বিষ আছে, আমার উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে যথেষ্ট।
র্যাসফারের প্রকোষ্ঠ পাহারা দিয়ে রেখেছে ইনটেফের একজন দেহরক্ষী। তার মানে, এখনও রাসফারকে মূল্যবান মনে করছেন তিনি। সেক্ষেত্রে র্যাসফারের মৃত্যু হতে পারে আমার যোগ্য বদলা ।
আমাকে দেখতেই কক্ষে ডেকে নিলো প্রহরী। নিজের ঘামে ভেঁজা, স্যাঁতসেঁতে বিছানায় শুয়ে কোঁকাচ্ছে র্যাসফার। আমি অবশ্য দেখেই বুঝলাম, তার শল্যচিকিৎসা সফল হয়েছে। চোখ খুলে বিড়বিড় করে আমাকে অভিশাপ দিলো র্যাসফার।
কোথায় ছিলি তুই, বিচি ছাড়া বলদ? আমার উদ্দেশ্যে গুঙ্গিয়ে উঠে সে। তুই চলে যাওয়ার পর থেকে ব্যথায় মরে যাচ্ছি। কেমন চিকিৎসা করিস–
তার কথা উপেক্ষা করে মাথার পট্টি খুলতে লাগলাম। ব্যথার জন্যে অন্তত কিছু দে আমাকে! আমার জামার সামনের অংশ আঁকড়ে ধরতে চাইলো র্যাসফার, ঝট করে সরে বসলাম।
লবণের গুঁড়ো নিয়ে কিছু করার ভান করলাম প্রথমে, তারপর র্যাসফারের পানির পাত্র কানায় কানায় ভরে দিলাম সদ্য দোয়ানো দুধ দিয়ে।
ব্যথা খুব বেশি হলে, এটা খেয়ে দেখো কমে যাবে, তার হাতের নাগালের মধ্যেই রাখলাম পাত্রটা। সরাসরি হাতে দিতে কোথায় যেনো বাঁধলো।
