দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাত দিয়ে মুখ ঢাকলেন ফারাও। নিঃশব্দে বসে রইলাম আমরা। তাঁর প্রতি করুণায় মন আর্দ্র হলো আমার।
শেষমেষ, নরম স্বরে মিছে কথা বললাম তাঁকে। যে বন আমি দেখেছি, তা আপনার বংশধরদের। ফিসফিস করে বললাম। সময়ের শেষ পর্যন্ত আছে তারা, প্রত্যেকের শিরে রয়েছে মিশরের দ্বৈত-মুকুট।
মুখ উঁচু করে তাকালেন ফারাও। তাঁর আনন্দ আর কৃতজ্ঞতা করুণ দেখালো । ধন্যবাদ, টাইটা। নিজের চোখে দেখলাম, কতটা কষ্ট হয় তোমার। যাও, বিশ্রাম নাও। আগামীকাল আমরা গজ-দ্বীপে ফিরে যাবো। তোমার এবং তোমার কীর জন্যে ভিন্ন একটা গ্যালির ব্যবস্থা করা হবে। আমার অমরত্বের বীজ যে বহন করবে, জীবন দিয়ে হলেও ওকে রক্ষা কর তাকে।
এতো দুর্বলবোধ করছিলাম, বিছানার কিনারা ধরে উঠে দাঁড়াতে হলো। দরোজার কাছে পৌঁছে চৌকাঠ ধরে নিজেকে সামলালাম। কিন্তু মিসট্রেসের প্রতি আমার দায়িত্ব ভুলি নি।
ফুল শয্যার চাদরের কী হবে? মানুষ ওটা দেখতে চাইবে, মনে করিয়ে দিলাম ফারাওকে। আপনার এবং আমার কর্ত্রীর সম্মানের প্রশ্ন এটা।
তুমি কি বলো, টাইটা? এতো দ্রুত আমার উপর নির্ভর করতে শুরু করে দিয়েছেন তিনি। কিছু সময় আমার কথা শুনে মাথা ঝাঁকালেন, ঠিক আছে!
ফুল-শয্যার চাদর গুটিয়ে নিলাম আমি। পুব থেকে আসা মসলিনের সুতোয় বোনা বিশুদ্ধ লিনেনের কাপড় ওটা। শান্ত, ঘুম কাতর প্রাসাদের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চাদর সমেত হারেমে প্রবেশ করলাম আমি। তখনও অন্ধকার ভালোভাবে কাটেনি।
এখনও মরার মতো ঘুমাচ্ছে মিসট্রেস। যতটুকু লাল শেপেনের গুঁড়ো দিয়েছি তাকে, তাতে করে আজকের দিন তো বটেই, আগামী সন্ধে পর্যন্ত ঘুমাবে সে। ওর বিছানার পাশে বসে রইলাম কিছু সময়। আমার সবটুকু শক্তি, স্পৃহা যেনো শুষে নিয়েছে আমন রার ইন্দ্রজাল। কিন্তু যে দৃশ্য দেখেছি তাতে আমার মনের অশান্তি আরো জোড়ালো হয়। একটা ব্যপারে আমি নিশ্চিত, যে বাচ্চাটা দেখেছি ওটা আমার মিসট্রেসেরই; কিন্তু বাকি যা দেখলাম তার কি ব্যাখ্যা? এই ধাঁধার কোনো উত্তর বের করতে না পেরে কাজে লেগে পড়লাম।
লসট্রিসের পাশে, চাদরটা বিছিয়ে দিলাম মেঝেতে। ছুরির ডগা দিয়ে সামান্য খোঁচা দিতেই রক্ত ঝরতে লাগলো আমার বাহু থেকে ফোঁটা গুলো চাদরের উপর ঝরতে দিলাম আমি। যখন সন্তুষ্ট হলাম যে, উদ্দেশ্যে হাসিল হয়েছে; হাতটা বেঁধে নিলাম লিনেনের ফালি দিয়ে। রক্তের দাগ পরা চাদরটা ভাজ করে দলা পাকিয়ে রাখলাম।
বাইরের কক্ষে এখনও পাহারায় রয়েছে সেই দাসী মহিলা। তাকে জানালাম, লসট্রিসকে যেনো কোনোরকম বিরক্ত করা না হয়। আদেশ পালিত হবে নিশ্চিত হয়ে মই টপকে হারেমের বাইরের দেয়ালের উপর চড়ে বসলাম।
তখনও পুরো ফোটেনি সকালের সূর্য। তারপরেও, বৃদ্ধা এবং উৎসুক জনতা ভীড় করে আছে হারেমের চৌহদ্দিতে। মেঘের মতো সাদা লিনেন চাদরে ঠিক ফুলের মতো ফুটে থাকা রক্তের দাগ দেখে উল্লাসে ফেটে পরে জনতা, আমার কর্ত্রীর কুমারী দেহের প্রমাণে উদ্বেলিত হয়। মনে আশা–এর জঠরেই ফারাও-এর পুত্র সন্তানের জন্ম হবে।
জনতার শেষ সারিতে দাঁড়িয়ে সবকিছু অবলোকন করছিলো দীর্ঘ একটি অবয়ব। দাগ অলা পশমের কাপড়ে মাথা ঢাকা। আমার দিকে মুখ ফেরাতে চিনতে পারলাম, ওই সোনালি চুলের মালিক আর কে-ই বা হতে পারে?
ট্যানাস! চিৎকার করে ডাকলাম আমি। আমার কথা শোনো!
দেয়ালের ওপার হতে আমার পানে চাইলো সে। এতো বেদনা তার দুচোখে, হৃদয় ভেঙে যেতে চাইলো আমার। চাদরের ওই দাগ ট্যানাসের জীবনটা ধ্বংস করে দিয়েছে। ভালোবাসা হারানোর ব্যথা বুঝি আমি, এতোগুলো বছরেও সেই স্মৃতি এখনও অম্লান। ট্যানাসের আহত হৃদয়ে যে রক্তক্ষরণ চলছে, আমি জানি, যুদ্ধ ক্ষেত্রের কোনো আঘাতই তাকে এতো ব্যথা দেয়নি কখনও।
বেঁচে থাকতে হলে আমার সাহায্য এই মুহূর্তে বড়ো প্রয়োজন ওর।
পশমের শাল দিয়ে মুখ-মাথা ঢেকে ফিরে চলে ট্যানাস। ঠিক মাতাল লোকের মতোই এলোমেলো পদক্ষেপে ।
ট্যানাস! বৃথাই পেছন থেকে চিৎকার করে ডাকলাম। একবারো না তাকিয়ে গতি বাড়িয়ে হেঁটে চললো সে।
যতক্ষণে দেয়াল বেয়ে নিচে নেমে প্রধান ফটকের কাছে পৌঁছলাম আমি, শহরের গলি-ঘুপচি আর কাঁদায় লেপা কুঁড়ের গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেছে ট্যানাস।
.
অর্ধেকটা সকাল ট্যানাসের খোঁজে ঘুরে ফিরলাম, কিন্তু তার তাবুতে কেউ নেই, কেউ এমনকি দেখেওনি তাকে।
শেষমেষ, হাল ছেড়ে দিয়ে দাস বালকদের প্রকোষ্ঠে ফিরতে হলো। দক্ষিণে হলো । দক্ষিণে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে রাজকীয় নৌ বহর। আর দেরি না করে নিজের বাক্স-পেটরা গুছিয়ে নিতে হবে আমাকে। ভারাক্রান্ত মনে এতোদিন ধরে আমার একমাত্র বাসস্থান ত্যাগের গোছ-গাছ শুরু করলাম।
এমনকি আমার পোষ্যরা পর্যন্ত কী করে যেনো বুঝে গেছে, অনাকাঙ্খিত কিছু ঘটতে চলেছে। শিষ দিয়ে, কিচির-মিচির শব্দে আমার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চালালো ওরা। বন্য পাখিরা ডানা ঝাঁপটালো বাইরের চাতালে। নিজেদের অবস্থান থেকে আমার উদ্দেশ্যে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে ডেকে চললো শিকারী বাজ পাখি । প্রিয় গ্যাজেল, বিড়াল আর কুকুরগুলো কেবলই পায়ে পায়ে ঘষটে হেঁটে চললো গোছগাছে যেনো বাধা দিতে চায় আমাকে।
বিছানার পাশে একটা জগে টক ছাগ-দুগ্ধ রয়েছে– লক্ষ্য করলাম। আমার খুব প্রিয় পানীয় দাস বালকেরা সব সময় পূর্ণ করে রাখে পাত্রটা। আমার পোষ্যরাও খুব ভালবাসে এই পানীয়, অনেকটা ওগুলোকে তাড়ানোর জন্যেই চাতালে গিয়ে মাটির পাত্রে ঢেলে দিলাম দুধটুকু। পড়িমড়ি করে ছুটে এলো পশু-পাখির দল কে কার আগে খাবে, তার দখল নিতে চায়। নিজের কাজে ফিরে চললাম আমি।
