দশটি আইভরি চাকতি ধারণ করে আছে ধাঁধাগুলো । দশ হলো শুদ্ধতম জ্ঞানের প্রতীক। মানবের অস্তিত্বের এক একটি অংশ ধারণ করে ভিন্ন ভিন্ন চাকতি। ওগুলো নাড়াচাড়া করতে আমার সমস্ত মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হতে লাগলো । দ্রুত আমার হাতে গরম ঠেকতে লাগলো চাকতিগুলো, যেনো আমার দেহের তাপ শুষে নিচ্ছে। ফারাও কে একটি করে চাকতি হাতে নিতে বললাম আমি, আঙুলের ফাঁকে ঘষে ঘষে সম্পূর্ণ মনোযোগ এক করতে বললাম। একই সঙ্গে উচ্চস্বরে প্রশ্ন করে করতে লাগলেন তিনি, আমার কী পুত্র সন্তান হবে? বংশধারা রক্ষিত হবে?
সম্পূর্ণ শিথীল শরীরে দেহের ভেতরে ঐশ্বরিক শক্তিকে আমন্ত্রণ জানালাম। যেনো অন্তর্ভেদি গোলার মতো ফারাও-এর প্রশ্নগুলো ভেঙে ভেঙে ঢুকে পরলো আমার অভ্যন্তরে ।
বাঁশির আওয়াজে মোহমুগ্ধ কোব্রার মতো এদিক ওদিক দুলতে শুরু করেছি আমি। ঔষধের প্রভাব এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ। যেনো আমার দেহের কোনো ভর নেই, শূন্যে ভেসে চলেছি। অনেক দূর থেকে যেনো বলে উঠলাম আমি, কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনি তুলছে মাথার ভেতর।
অন্ধকারের ভেতর থেকে ছায়ামূর্তি তৈরি হতে থাকলো আমার সামনে, অদ্ভুত আওয়াজে কান ভরে উঠলো। অর্থবহ কোনো ধ্বনি নয়, কেবলই বিশৃঙ্খল শব্দমালা। চোখ জ্বলছে আমার। আরো শূন্যে উঠে পরছি আমি ক্রমশই, মহাশূন্যে পৌঁছে গেছি যেনবা ।
মাথার ভেতরের শব্দমালা এবারে অর্থবহ হতে থাকে, চোখের সামনে তৈরি হয় পরিষ্কার ছবি।
নবজাতকের কান্না শুনতে পারছি আমি, কণ্ঠস্বর ভেঙে গেলো আমার।
ছেলে? মাথার ভেতরে যেনো দপদপিয়ে উঠলো ফারাও-এর কণ্ঠস্বর ।
ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে আসে আমার দৃষ্টি। দীর্ঘ একটা সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় আলোর একটু রেখা যেনো দেখতে পাই আমি। হাতেধরা আইভরি ধাঁধাগুলো যেনো আগুন-গরম–তালুতে ছ্যাঁকা দিচ্ছে ।
নাড়িতে পেঁচানো অবস্থায়, আলোর বৃত্তের মাঝে একটি শিশুকে দেখতে পেলাম আমি, মাতৃজঠরের তরলে সর্বাঙ্গ ভেঁজা।
একটা শিশু দেখছি আমি, কঁকিয়ে উঠলাম।
ছেলে শিশু? আমার চারপাশ ঘিরে থাকা আঁধারের ভেতর থেকে বলে উঠেন ফারাও।
কেঁদে উঠে শূন্যে পা ছেড়ে শিশুটি, ওর পায়ের ভাঁজে বসে থাকা ছোট্ট অঙ্গ দেখতে পেলাম আমি।
ছেলে, বলতে গিয়ে পরাবাস্তব জগতের এই নবজাতকের প্রতি আমার স্নেহের প্রাবল্যে অবাক হলাম। এগিয়ে গিয়ে একটু ধরতে চাইলাম ওকে, কিন্তু আমার দৃষ্টি ক্রমশই ঝাপসা হয়ে আসে–বাচ্চাটার কান্না দূরাগত হতে হতে মিলিয়ে যায় অন্ধকারে।
বংশধারা? আমার বংশধারার কী হবে? টিকবে ওটা? রাজার কণ্ঠস্বর আমার কান পর্যন্ত পৌঁছল, এরপর বিভিন্ন শব্দের শোরাগোলে হারিয়ে গেলো সেটা। যুদ্ধের ধ্বনি শুনতে পেলাম আমি, মরণপণ যুদ্ধরত সৈনিকের হুঙ্কার, ধাতুর সঙ্গে ধাতুর সংঘর্ষ শুনতে পেলাম। আমি দেখলাম, মাথার উপরের আকাশ ছেয়ে গেছে তীরের ঝাঁকে।
যুদ্ধ! ভীষণ নৃশংস এক যুদ্ধ দেখতে পারছি আমি যা পুরো দুনিয়া পাল্টে দেবে, রণ-হুঙ্কার ছাপিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলা
আমার বংশধার টিকে থাকবে? উদ্বিগ্ন শোনালো রাজার গলা, পাত্তা দিলাম না আমি। মরুর ঝড় অথবা নীল নদের জলপ্রপাতের আওয়াজ যেনো ভেসে এলো আমার কানে। দেখলাম, আমার দিগন্ত ঝাপসা করে রেখেছে অদ্ভুত এক টুকরো হলুদ মেঘ। তারই মাঝে হঠাৎ হঠাৎ চমকে উঠছে সূর্যরশ্মি।
আমার বংশধারার কী হবে? ফারাও-এর আর্তনাদে আমার দৃষ্টি ফিকে হয়ে আসে। মাথার ভেতরে এখন নিদারুন নিস্তদ্ধতা। নদীর ধারে একটা বৃক্ষ দেখতে পেলাম আমি। বিশাল এক একাশিয়া গাছ, পাতা বহুল-ফলে ফলে ভরে উঠেছে তার ডাল। সবচেয়ে উঁচু শাখায় বসে কর্কশ কন্ঠে ডেকে উঠে রাজকীয় বাজপাখি, কিন্তু আমার চোখের সামনে রঙ, আকৃতি পাল্টে গেলো তার। মিশরের লাল এবং সাদা দ্বৈত মুকুটে পরিণত হলো সেটা। এরপর, পাঁচবার নীলনদের পানির উত্থান-পতন দেখলাম আমি।
আমার তীব্র দৃষ্টির সামনে একাশিয়া গাছের মাথা ঢেকে ফেললো কীট-পতঙ্গের এক বিশাল মেঘ। প্রচুর কীট অধিকার নিলো গাছটির, একদম ঢেকে গেছে ওটা। পোকাগুলো সরে যেতে দেখলাম, কেবল কাণ্ড ছাড়া আর কিছু নেই, কোনো সবুজ অবশিষ্ট নেই গাছটার । একটি পাতাও নেই। এরপর, কেঁপে উঠে মাটিতে লুটিয়ে পরে সেটা। ডালপালার সঙ্গে ভেঙে টুকরো টুকরো হয় মিশরের দ্বৈত-মুকুট। খন্ডগুলো ক্রমেই পরিণত হয় ধুলোয়, বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যায় সেগুলো। কিছু নয়, কেবল বাতাস আর মরুর ধুলো অধিকার করে রাখে চরাচর।
কি দেখছো তুমি? জানতে চাইলেন ফারাও। সব মিলিয়ে যায় আমার চোখের সামনে থেকে, নিজেকে রাজার শয্যাকক্ষে আবিষ্কার করি আমি। ফুঁপিয়ে উঠে শ্বাস ফেলছি, যেনো কতদূর পথ দৌড়ে এসেছি। কপালে লেপ্টে আছে ঘামের পুরু স্তর। গায়ের জামা ভিজিয়ে দেহের পাশে ছোটখাটো একটা পুকুর তৈরি করে ফেলেছে ঘামের ধারা। প্রচণ্ড জ্বরে কাঁপুনি উঠে গেলো, পেটের ভেতরে সেই পরিচিত অসুস্থ অনুভূতি, আমি জানি যা আরো কিছুদিন সঙ্গী হবে আমার ।
এক দৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন ফারাও, এমন ভয়ঙ্কর দৃশ্যের বিবরণ কেমন করে দেবো তাকে? কি দেখেছো তুমি? ফিসফিস করে জানতে চাইলেন তিনি। আমার বংশধারা টিকে থাকবে?
সত্যি কথা বলা সম্ভব নয়, তাই ভিন্ন একটা গল্প তৈরি করতে হলো। আমি দেখেছি, সবুজে ছাওয়া একটা বন আমার দৃষ্টিসীমা অধিকার করে রেখেছিলো সেটা। এতো বৃক্ষ কোনো শেষ নেই তার; আর প্রতিটি গাছের শিখরে একটি করে দ্বৈত মুকুট।
