সেই সময়ে, কম করে হলেও তিনশ পত্নী এবং উপ-পত্নী ছিলো ফারাও-এর হারেমে; আর কিছু এশীয় মেয়ে আছে, যাদের রয়েছে অতৃপ্ত তৃষ্ণা। রাতের পর রাত, বছরের পর বছর ঠিক একজন দেবতার মতো এই অক্লান্ত ভালোবাসায় কতোই না শক্তি ক্ষয় হয়েছে মহান ফারাও-এর ভেবে করুণা হলো।
নব্বই দিন, অবশেষে বললাম আমি।
নব্বই দিন? চিন্তান্বিত ভাবে বললেন ফারাও। দশ দিন করে ধরলে, নয়টি মিশরীয় সপ্তাহ?।
কম করে হলেও, শক্ত মুখে বললাম।
ঠিক আছে, সহজ ভঙ্গিতে মেনে নিয়ে বিষয় পরিবর্তন করলেন রাজা।
আমার পরিচর্যকের কাছে শুনলাম, তুমি নাকি আমাদের এই মিশরের সেরা তিনজন জোতিষী র একজন?
কেন যে অমন মন্তব্য করলো আতন-ভেবে পেলাম না। আমি ছাড়া বাকি দু জন আবার কারা? বিনয়ের সাথে কুর্নিশ করলাম, সে একটু অতিরঞ্জন করেছে, মহান ফারাও। তবে হয়তো স্বর্গীয় আত্মাদের কিছু ব্যপার আমার জানা আছে।
আগ্রহের আতিশায্যে উঠে বসলেন ফারাও। এখনই একটা ভবিষ্যদ্বানী কর আমার জন্যে।
এখন? দারুন বিস্ময়ে বললাম।
এখন! কেন নয়? তোমার কথা অনুযায়ী, এখন তো রাতে তেমন কিছু করার নেই আমার। তাঁর অপ্রত্যাশিত হাসি সত্যিই মিষ্টি; যদিও ট্যানাস এবং লসট্রিসের জীবনে তিনিই দুঃখ বয়ে নিয়ে এসেছেন–তাঁকে আমার ভালোই লাগলো।
প্রাসাদের গ্রন্থাগার থেকে কিছু স্ক্রোল নিয়ে আসতে হবে আমাকে সেজন্যে।
সারারাত পরে আছে। যা কিছু খুশি, নিয়ে এসো।
রাজার সাগ্রহ দৃষ্টির সামনে তার প্রথম দফা কুষ্ঠি তৈরি করলাম। ঠিক আমার পর্যবেক্ষণের মতোই তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিজস্ব নক্ষত্র দ্বারা চালিত। সেই রক্ত লাল ভবঘুরে তারা, যেটাকে আমরা সেথ্-এর চোখ বলে জানি তার ভাগ্য দখল করে আছে। এ হলো সংঘর্ষ এবং অনিশ্চয়তা; দ্বিধা-ভারাতুরতা এবং যুদ্ধ-বিগ্রহ; দুঃখ এবং দুর্ভাগ্য, এবং সবশেষে, অপঘাতে মৃতুর ইঙ্গিতবাহী নক্ষত্র।
কেমন করে তাকে এই সমস্ত কথা বলবো আমি?
তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া বহু ঘটনার বিবরণ দিয়ে গেলাম, এমনকি অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত কিছু বিষয়ের কথাও বললাম আমার গুপ্তচরদের কাছ থেকে যেগুলো জেনেছিলাম। এর অনেকগুলো অবশ্যই আতন জানিয়েছিলো আমাকে। এরপরে, সুস্বাস্থ্য এবং দীর্ঘজীবনের নিশ্চয়তা দিলাম তাকে সব মানুষই এটা শুনতে চায়।
দারুন প্রভাবিত হলেন রাজা। এতো গুণ তোমার, আমার প্রত্যাশা বেড়ে চলেছে টাইটা।
ধন্যবাদ, মহান ফারাও। আপনার সেবায় আসতে পেরে আমি খুশি। স্ক্রোল আর প্রায় সকাল হয়ে এসেছে, ইতোমধ্যেই। প্রাসাদের দেয়ালের ওপারে সকালের পাখিদের ডাক শুনতে পাচ্ছি।
দাঁড়াও, আমি তোমাকে যাওয়ার অনুমতি দেই নি। যা জানতে চাই, তার কিছুই তুমি আমাকে বলনি। আমার কী পুত্র-সন্তান হবে? বংশধারা রক্ষা পাবে?
হায়, মহান ফারাও; ওই সব ব্যপার নক্ষত্র দেখে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। কেবল আপনার জীবনের সাধারণ নির্দেশনা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সামান্য কিছু অনুমান করা যায় নক্ষত্র থেকে–
আহ, আমাকে থামিয়ে দিলেন তিনি। কিন্তু ভবিষ্যত দেখার তো আরও উপায় আছে, নয় কি? কথার ধারা কোনদিকে যাচ্ছে ভেবে সতর্ক হলাম আমি, চলে যেতে পারলে বাঁচি। কিন্তু রাজা ছাড়বেন না।
আমি তোমার সম্পর্কে কৌতূহলি, টাইটা, তোমার ব্যপারে সব খোঁজই আছে আমার কাছে। আমন রার ইন্দ্রজাল তোমার সাধ্যের মধ্যেই, আমি জানি। মুষড়ে পড়লাম আমি। কেমন করে রাজা জানলেন এ কথা? খুব কম লোকেরই জানা আছে, এই ঐশ্বরিক শক্তির অধিকারী আমি। আমি চাই নি, সবাই জানুক এটা। চুপ করে থাকা ছাড়া আর কিছু করার নেই এখন।
তোমার ওষুধের বাক্সের তলায় রার ধাঁধা আছে, আমি দেখেছি, বললেন ফারাও। মিথ্যে বলে যে ধরা খেয়ে যাই নি, দেবতারা সহায় । জানি, এরপরে কী বলবেন ফারাও।
ইন্দ্রজাল তৈরি কর, আমাকে বল, আমার বংশধারা রক্ষিত হবে কি না। আমি কী পুত্র সন্তানের পিতা হতে পারবো না?
কুষ্ঠি হলো এক মামুলি ব্যাপার; কেবল নক্ষত্রের গতিপথ এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য জানা থাকলেই ভবিষ্যদ্বাণী করা যায়। আর, আমন রার স্বর্গীয় ইন্দ্রজাল সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। জীবনী শক্তি শুষে নেয় এটা, আত্মার গভীরে পুড়ে যায় প্রচুর অনুভূতি। ভীষণ দুর্বল হয়ে পরে মানুষ এটা করার পরে ।
আজকাল এ সব থেকে দূরে সরে থাকতে চাই আমি। হয়তো, কখনও কখনও আমন রার ধাঁধা অনুশীলন করতে বাধ্য হই; কিন্তু এরপর বহুদিন মানসিক এবং শারীরিক ক্লান্তি ঘিরে রাখে আমাকে। এমনকি, আমার কর্ত্রী লসট্রিস পর্যন্ত জানে আমার এই ঐশ্বরিক শক্তির কথা; এ-ও দেখেছে, কতটা দুর্বল হয়ে যাই এটা অনুশীলন করলে। তাই ওই কার্যে আমাকে বারণ করেছে সে।
কিন্তু, একজন রাজাকে তুচ্ছ ক্রীতদাস কী করে ফিরিয়ে দেবে? দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওষুধের বাক্সের নিচ থেকে আমন রার ধাঁধা বের করলাম আমি। বাক্সটা একপাশে সরিয়ে রেখে লতাগুল থেকে মিশ্রণ তৈরিতে মগ্ন হলাম, আত্মার চোখ খুলে দেয় ওটা–ভবিষ্যতে নিয়ে চলে। তৈরি শেষ হতে মিশ্রণটা পান করে নিলাম। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিচিত সেই অনুভূতি দেহ ছেড়ে আত্মার নিগমণ টের পেলাম। তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পরছি ক্রমশই, মনে হলো বাস্তব জগৎ থেকে যোজন যোজন দূরে সরে গেছি। বাক্স থেকে আমন রার ধাঁধাগুলো হাতে নিলাম।
