আরো অযুহাত ছিলো আমার। কিন্তু তাহলে আমার কি হবে, মিসট্রেস? কেবল আজই আমার মালিকানা পেলে তুমি, এখনই ফেলে রেখে যাবে? আমার উপর একটু দয়া কর। একটু যেনো থমকালো লসট্রিস, মনে হতে লাগলো পেয়ে গেছি ওকে; কিন্তু চিড়ে ভিজলো না।
তোমার কিছু হবে না, টাইটা। আমার বাবা হাসিমুখে তোমাকে ফিরিয়ে নেবেন।
ছোট্ট সোনা, শোনো, শেষ অস্ত্র হিসেবে ওর বাল্যকালের একটা ডাক ব্যবহার করলাম। সকালে না হয় কথা বলবো আমরা, দেখো তখন সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিছুই ঠিক হবে না, নাছোড়বান্দা লসট্রিস। ট্যানাসের থেকে দূরে চলে যাবো আমি, আর ওই বুড়ো ব্যাটা বিছানায় জঘন্য কাজ করবে আমার সাথে! এতো উচ্চস্বরে কথা বলছে সে, আমার আশঙ্কা হলো রাজার হারেমের বাকি সদস্যরা না আবার শুনে ফেলে। সৌভাগ্যবশত তারা সবাই এখন উৎসবে।
লসট্রিসের স্বরে উন্মাদনা ক্রমশই বাড়তে লাগলো। এখন, এই মুহূর্তে ওই বিষ তৈরি কর আমার সামনে! আমি নির্দেশ করছি তোমাকে। অবাধ্যতার ফল ভালো হবে না। এবারে এতো জোরে বলতে লাগলো সে, ভয় হলো প্রাসাদের দ্বাররক্ষীর কান পর্যন্ত না পৌঁছে যায়।
ঠিক আছে, তাই করছি। আমার ওষুধের বাক্সটা নিয়ে আসতে হবে সেজন্যে।
বাক্স নিয়ে ফিরে এসে দেখি, অদ্ভুত জ্বলজ্বলে চোখে কক্ষের এ-মাথা ওমাথায় পায়চারী করছে লসট্রিস।
আমি নজর রাখছি তোমার উপর। কোনোরকম চালাকি করে লাভ নেই, লাল কাঁচের বোতল থেকে গুঁড়ো নিয়ে বিষ তৈরির সময় বললো সে।
তৈরি শেষ হতে নির্ভয়ে বোতলটা হাতে নিলো লসট্রিস। একটু থেমে চুমো খেলো আমার গালে। তুমি আমার কাছে প্রিয় ভাই, বাবার মতো। শেষ এই দয়ার জন্যে ধন্যবাদ। আমি তোমাকে ভালোবাসি, টাইটা। সবসময় বাসতাম। দুই হাতে বোতলটা উঁচু করে ধরে সে। ট্যানাস, প্রিয়, ওরা কখনই তোমার কাছ থেকে নিয়ে যেতে পারবে
আমাকে। আবার আমাদের দেখা হবেই হবে! এক চুমুকে পুরো বোতল নিঃশেষ করে ওটা ছুঁড়ে ফেলে লসট্রিস। কিছু সময়ের মধ্যেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে লুটিয়ে পরে বিছানায়।
আমার পাশে এসে বসো না, টাইটা। মরতে খুব ভয় লাগছে।
খালি পেটে খুব দ্রুতই কাজ করলো বিষ। কেবল আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে একটা কথা বলতে পারলো সে, ট্যানাসকে বলো, কত ভালোবাসি ওকে। মরণের আগেও, পরেও অপেক্ষায় থাকবো ওরই জন্যে। এরপরে চোখ মুদল আমার মিসট্রেস।
এতোটাই ফ্যাকাসে আর স্থির দেখালো ওকে, এক মুহূর্তের জন্যে আশঙ্কায় শিউড়ে উঠলাম। তবে কি প্রাণঘাতি ধুতুরার বদলে লাল শেপেনের যে গুঁড়ো দিয়েছিলাম, তার মাত্রা কড়া হয়ে গিয়েছিলো? ছোটো একটা আয়না মিসট্রেসের মুখের সামনে রাখতেই আশ্বস্ত হলাম না, শ্বাস ফেলছে সে। যত্ন করে চাদরে মুড়ে দিলাম ওকে, মনে আশা হয়তো সকালে ঘুম ভেঙে জেগে উঠে বেঁচে থাকার জন্যে আমাকে ক্ষমা করবে।
ঠিক এই সময় প্রকোষ্ঠের বাইরের অংশের দরোজায় কড়াঘাতের শব্দ হলো। রাজ-পরিচর্যক, আতন ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি চাইছে। সে-ও একজন অপুরুষ ফারাও শাসনের আরও একজন সেবক। আমি তাকে ভাই বলেই জানি, দ্রুত স্বাগত জানাতে এগিয়ে গেলাম।
টাইটা, রাজার ভোগের জন্যে তোমার ছোট্ট কর্ত্রীকে নিয়ে যেতে এসেছি আমি, বিশাল দেহের তুলনায় দারুন বেমানান তীক্ষ্ণ, মেয়েলী স্বরে বললো আতন। যৌবন প্রাপ্তির আগেই নপুংসক করা হয়েছিলো তাকে। সে তৈরি তো?
একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে, ব্যাখ্যা করে বললাম। শেষমেষ ঘুমন্ত লসট্রিসের কাছে নিয়ে গেলাম তাকে।
ওর অবস্থা দেখে ভীষণ দুশ্চিন্তায় প্রসাধন-চর্চিত গাল ফোলাতে লাগলো আতন । ফারাও-কে কী বলবো এখন? প্রায় কেঁদে ফেললো সে। উনি মারবেন আমাকে। আমি এটা বলতে পারবো না। এই মেয়ে তোমার দায়িত্বে আছে, রাজার সামনে তুমি গিয়ে বলো তার অবস্থা। আমি পারবো না।
এমন নয় যে এই দায়িত্ব সানন্দে পালন করছি আমি, কিন্তু আতন সত্যিই ভয়ে সিঁটিয়ে গেছে। আর চিকিৎসক হিসেবে আমার পরিচয় বেশ কাজ দেবে বলে ধারণা করলাম । নিতান্তই অনিচ্ছাসত্ত্বে রাজকীয় শয্যাকক্ষের দিকে রওনা হলাম, আতনকে সঙ্গে করে। অবশ্য যাওয়ার আগে বৃদ্ধা একজন দাসীর পাহারায় রেখে এলাম লসট্রিসকে।
পরচুলা এবং মুকুট খুলে রেখেছেন ফারাও। অসট্রিচের ডিমের মতোই চকচকে টাক তার মাথায়। এমনকি আমি পর্যন্ত থমকে গেলাম, না জানি এটা দেখলে আমার মিসট্রেসের কি অনুভূতি হতো ।
আমাকে দেখতে পেয়ে ঠিক একই রকম চমকে গেলেন রাজা। হাঁটুগেড়ে বসে মাথা ঝোকালাম তার সামনে।
কী হয়েছে, দাস টাইটা?
দয়ার সাগর, মহান ফারাও; আমার কী লুসট্রিসের পক্ষ থেকে আপনার উপলব্ধি এবং ক্ষমা চাইতে এসেছি আমি। এরপরে, লসট্রিসের অবস্থার ভয়ঙ্কর বিবরণ দিয়ে গেলাম। চিকিৎসাবিদ্যা সংক্রান্ত এক গাদা ধোয়াটে কথাবার্তা বলে ব্যাখ্যা করতে চাইলাম কেননা এই মুহূর্তে রাজার ভোগ-বিলাসের উপযুক্ত নয় সে। দুঃখিত চেহারায় আমার পাশে দাঁড়িয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিয়ে গেলো আতন।
যুবক কোনো পুরুষ হলে এই সব কথায় ভুলতো না আমি নিশ্চিত, কিন্তু ফারাও হলেন বুড়ো ষড়। গত ত্রিশ বছরে যে সুন্দরী রমণীদের সেবা দিয়ে এসেছেন, তার একটা ফলাফল তো থাকবেই। সম্ভবত, সমগ্র থিবেস নগরকে একশ বা তার অধিক বার ঘিরে রাখার মতো তাদের সংখ্যা।
