আমি হাজির, মালিক, বললাম। দৃষ্টিতে জিঘাংসা নিয়ে আমার পানে চাইলেন ইনটেফ। এতো দিন ধরে আমরা জানি পরস্পরকে, উচ্চারিত কোনো শব্দ ছাড়াও কেবল মুখের ভাব দেখে বুঝতে পারি আমি তাঁকে, তিনি আমাকে। নিরবে তাকিয়ে থাকলেন ইনটেফ, ভয়ের প্রাবল্যে পাখির মতো ডানা ঝাঁপটাতে লাগলো আমার হৃদয়। শেষমেষ নরম প্রায় আদুরে সুরে বলতে লাগলেন ইনটেফ, টাইটা, সেই শিশুকাল থেকে তুমি আমার কাছে আছে। দাস নয়, তোমাকে ঠিক আপন ভাইয়ের মতো জেনে এসেছি আমি। আমার কন্যার অনুরোধ তুমি শুনেছো। আমি দয়ালু মানুষ, এতদিন পরে তোমার ইচ্ছার বিপরীতে কোনোকিছু করা অন্যায় হবে। জানি, কোনো বিষয়েই কিছু বলার অধিকার নেই একজন দাসের, কিন্তু তোমার কথা আলাদা। বলো, টাইটা। যদি এতোদিন ধরে যেখানে থেকে এসেছে–যেটা তোমার একমাত্র বাড়ি সেখানে থেকে যেতে চাও; তাহলে তোমাকে চলে যেতে বলতে পারি না আমি; এমনকি আমার মেয়ে চাইলেও না। ভয়ঙ্কর হলদেটে চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন ইনটে। কাপুরুষ নই আমি, কিন্তু নিজের নিরাপত্তার কথাও তো ভাবতে হবে। মনে হলো, যেনো সরাসরি মৃত্যুর চোখে তাকিয়ে আছি। গলায় স্বর খুঁজে পেলাম না ।
ইনটেফের দিক হতে দৃষ্টি সরিয়ে লসট্রিসের দিকে তাকালাম। এতো ভীষণ করুণ অনুনয় তার দৃষ্টিতে, এতো একাকিত্ব আর ভয়, আমার নিজের নিরাপত্তা তার কাছে কিছুই নয়। ওকে একা ছেড়ে দিতে পারি না আমি, যে কোনো মল্যে, চাই-কি নিজের
জীবনের বিনিময়ে হলেও।
মহান ফারাও-এর স্ত্রীর ইচ্ছাকে একজন তুচ্ছ দাস কেমন করে প্রত্যাখান করতে পারে, হুজুর? আমার নতুন মিসট্রেসের সাথে যেতে তৈরি আমি। জোরে, সবাইকে শুনিয়ে বললাম।
এদিকে এসো, ক্রীতদাস! আমার নতুন মনিব নির্দেশ দিলেন। আমার পেছনে এসে দাঁড়াও।
মঞ্চে উঠার সময় ইনটেফের পাশ ঘেঁষে যেতে হলো। তাঁর সাদা, ফ্যাকাসে ঠোঁট খুব সামান্যই নড়লো, কিন্তু স্পষ্ট শুনতে পেলাম, তিনি বলছেন, বিদায়, প্রিয়। তুমি মরে গেছে।
কেঁপে উঠলাম, যেনো বিষাক্ত একটা কোব্রা হেঁটে গেছে আমার পথে। দ্রুত আমার মিসট্রেসের পেছনে জায়গা করে নিলাম, যেনো ওখানে সম্পূর্ণ নিরাপদ আমি।
*
উত্সবের বাকি সময় সর্বক্ষণ লসট্রিসের পাশে পাশে থাকলাম আমি। খাবারের সময় চেষ্টা করলাম যেনো মিসট্রেস অন্তত কিছু একটু মুখে তোলে। আমি জানি, বিগত কয়েকদিন কিছুই খায়নি সে। এতো দুর্বল হয়ে পরেছে তাই।
বহু সাধ্য-সাধনার পর পানি মেশানো একটু মদ মুখে তুললো। সে, কিন্তু ও-ই, আর কিছু নয়। ফারাও-এর কাছে এ হলো তার সদ্য-বিবাহিত স্ত্রীর আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। নিজের স্বর্ণের পাত্র থেকে এবারে কিছুটা নির্জলা মদ খেতে আহ্বান জানালেন তিনি। নিজেও পান করলেন। দারুন উল্লাসে স্বাগত জানালো জনতা।
টাইটা, এক পাশে বসা ইনটেফের দিকে রাজার মনোযোগ সড়তেই আমাকে ডাকলো লসট্রিস, মনে হয়, বমি করে ফেলবো। এখানে থাকা সম্ভব নয়। দয়া করে আমার প্রকোষ্ঠে ফিরিয়ে নিয়ে চলো।
ভীষণ এক ঘটনা হতো মিসট্রেসের এই হঠাৎ অন্তর্ধান, কিন্তু চিকিৎসক সুখ্যাতির বদৌলতে খুব সহজেই কাজ হাসিল করলাম আমি। হাঁটুর উপর ভর করে এমন ভাবে ফারাও-এর কানে কানে বললাম কথাটা, অতিথিরা কেউ টেরই পেলো না।
পরে বুঝেছিলাম, মূলত বেশ দয়ালু প্রকৃতির মানুষ ছিলেন ফারাও মামোস। সেদিনই তার প্রমাণ দিয়েছিলেন তিনি। মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনে হাততালি দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন অভ্যাগত অতিথিদের। রাতের প্রস্তুতির জন্যে আমার স্ত্রী এবারে তার প্রকোষ্ঠে ফিরবেন। তার এই ঘোষণায় আনন্দ, হুলোড় আর আমোদের ঝড় বয়ে গেলো।
আমার সাহায্য ছাড়াই উঠে দাঁড়িয়ে রাজাকে কুর্নিশ করলো মিসট্রেস, এরপরে ভোজ-সভা ত্যাগ করলো। প্রকোষ্ঠে ফিরতে না ফিরতেই উগড়ে দিলো পেটের মদ, বিধ্বস্ত অবস্থায় লুটালো বিছানায় ।
আমি ট্যানাসকে ছাড়া বেঁচে থাকতে চাই না, দুর্বল স্বরে বললল লসট্রিস, কিন্তু গলার জেদ পুরোপুরি অটুট।
ট্যানাস বেঁচে আছে, ওকে সান্ত্বনা দিতে চাইলাম, সে তরুণ, শক্তিমান আরো অন্তত পঞ্চাশ বছর বাঁচবে। তোমাকে ভালবাসে সে; বলেছে প্রয়োজন হলে সারা জীবন অপেক্ষা করতে পারে। রাজা তো বুড়ো মানুষ, কয় দিনই আর বাঁচবেন–
পশমের চাদরের উপরে উঠে বসলো লসট্রিস। তার কণ্ঠস্বরে আরো বেশি রোখ এখন। আমি ট্যানাসের মেয়ে মানুষ। আর কোনো পুরুষ আমাকে পাবে না, তারচেয়ে বরং মরে যাবো আমি।
আমরা সবাইই একসময় মারা যাবো, মিসট্রেস, জানি, বিয়ের প্রথম কিছুদিন যদি ওর মন সান্ত্বনা দিয়ে রাখতে পারি, তবে কাজ হাসিল হবে। কিন্তু আমাকে হাড়ে হাড়ে চেনে এই মেয়ে।
কিছু বলল না, টাইটা; তোমার ওই সুন্দর কথায় কিছুই হবে না। আমি মরে যাবো। এক পাত্র বিষ তৈরি করে আনো আমার জন্যে এ আমার নির্দেশ।
মিসট্রেস, বিষ তৈরির বিদ্যা আমার জানা নেই যে, বাজে একটা অযুহাত, ফোঁস করে উঠলো লসট্রিস।
বহুবার আমি দেখেছি, আহত জীবগুলো ওই বিষ দিয়েছো তুমি। কানে বিষফোঁড়া সমেত তোমার কুকুরটাকে ভুলে গেছো; আর চিতার থাবায় ক্ষত-বিক্ষত সেই গ্যাজেলে র কথা কী বলবে? তুমিই বলেছিলে, ওই বিষে কোনো ব্যথা নেই, একদম ঘুমের মতো মরণ হয়। আমিও তাই চাই, ঘুমের ভেতর মরে গিয়ে মমি হয়ে চলে যাবো অন্য রাজ্যে । ওখানে অপেক্ষায় থাকবো ট্যানাসের।
