প্রচলিত ব্যবস্থা অনুযায়ী অনুষ্ঠানের আগেই বাবা-মেয়েতে মিলে ঠিক করে রাখেন, কী উপহার দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে অবশ্য মেয়েকে কিছু বলে রাখেন নি ইনটে। তাকে নিজের সিদ্ধান্ত জানানোর আগে, গতকাল রাতে অবশ্য এই নিয়ে আলাপ করেছিলেন আমার সাথে, অতিরঞ্জন করার দরকার নেই, আবার ফারাও-এর সামনে কৃপণ হিসেবে পরিচিতি পেতে চাই না, বলেছিলেন তিনি। ধরো, পাঁচ হাজার স্বর্ণের আংটি; আর পঞ্চাশ ফেদান জমি অবশ্যই নদীর ধারে নয় । এরকম হলে কেমন হয়?
শেষমেষ অবশ্য আমার চাপাচাপিতে পাঁচ হাজার স্বর্ণের আংটি এবং নদী তীরের উর্বর এক হাজার ফেদান জমি দিতে সম্মত হয়েছেন তিনি। তার নির্দেশে ইতোমধ্যেই দলিলপত্র ঠিক করে রেখেছি আমি; তাঁর ব্যক্তিগত গোপন ভান্ডার থেকে স্বর্ণও আলাদা করেছি।
সবকিছু তৈরি। সমগ্র অতিথি এবং বরের সামনে এখন কেবল লসট্রিসের চাওয়ার অপেক্ষা । কিন্তু বিবর্ণ, নিপ, মূক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো লসট্রিস, কিছুই যেনো শুনছে না সে, কিছুই তাকে স্পর্শ করছে না।
বলো, কন্যা; কী চাও তুমি আমার কাছে? ইনটেফের পিতৃসুলভ স্বর কষ্টার্জিত শোনাতে লাগলো, এক হাতে ঝুঁকি মেরে যেনো মেয়েকে জাগাতে চাইলেন তিনি। বলো, কিভাবে আজকের দিনে তোমাকে আরো সুখী করতে পারি?
যেনো ভয়ানক এক দুস্বপ্ন ভেঙে জেগে উঠলো লসট্রিস। নিজের চারপাশে তাকাতে লাগলো সে, অশ্রুবিন্দু টলমল করছে চোখে, পাতা উপচে পরার হুমকি স্পষ্ট। কিছু একটা বলার জন্যে মুখ খুলল ও, কিন্তু শরবিদ্ধ পাখির আর্তনাদের মতো আওয়াজ বেরুল কেবল কণ্ঠ থেকে। ঢোক গিলে নিরবে মাথা নাড়লো লসট্রিস।
কথা বলো, মেয়ে আমার। পিতৃসুলভ বাৎসল্য দেখাতে স্পষ্টতঃই দারুন কষ্ট হচ্ছে ইনটেফের। বলো, কী উপহার চাও আমার কাছে? যা চাও, তা-ই পাবে। বলো।
এতো দূর থেকেও পরিষ্কার টের পেলাম, কতোটা চেষ্টা করে মুখ খুলতে পারলো লসট্রিস; কিন্তু যখন কথা বলে উঠলো সে, স্পষ্ট-দ্বিধাহীন শোনালো তার কণ্ঠস্বর। উপস্থিত প্রত্যেকে পরিষ্কার শুনতে পেলো প্রতিটি শব্দ।
বিয়ের উপহার হিসেবে ক্রীতদাস টাইটা-কে চাই আমি।
যেনো পেটে ছুরি খেয়েছেন, চট করে এক পা পিছিয়ে গেলেন ইনটেফ। অবাক বিস্ময়ে মুখ হাঁ-বোবার মতো নিজের মেয়ের দিকে চেয়ে রইলেন তিনি কথা সরছে
মুখে। সম্ভবত কেবল ইনটেফ আর আমি জানি, কতো বড়ো উপহার চেয়েছে লসট্রিস। এক জীবনে যতো ধন-সম্পদ গড়েছেন ইনটেফ, তার সবকিছুর বদলেও এই দাবি মেটানোর সামর্থ্য নেই তার।
দ্রুতই নিজেকে ফিরে পেলেন ইনটেফ। মুখাবয়ব শান্ত, কোমল কিন্তু ঠোঁটের কোণ বেঁকে গেলো তার। তুমি খুবই কম চেয়ে ফেলেছো, কন্যা। মহান ফারাও-এর স্ত্রীর বিদায়ী উপহার একজন তুচ্ছ ক্রীতদাস? এ-ও কী হতে পারে?, না, এতটা ছোটো হতে পারবো না আমি। বরঞ্চ সত্যিকারের মূল্যবান কিছু তোমাকে দিতে চাই আমি, যেমন ধরে পাঁচ হাজার স্বর্ণের আংটি আর।
বাবা, আপনি সব সময়ই আমার প্রতি সদয় ছিলেন, কিন্তু আমার শুধু টাইটা-কে চাই।
ঝকঝকে হাসি হাসলেন ইনটেফ; ভীষণ উজ্জ্বল, ঠিক তার রাগের মতোই। টের পেলাম, ঝড়ের গতিতে কাজ করছে তার মাথা।
নিঃসন্দেহে আমি তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। কেবলমাত্র বিভিন্ন বিষয়ে আমার অসামান্য প্রতিভার জন্যেই নয়, তার চেয়ে বড়ো কথা, তাঁর সমস্ত জটিল, কুটিল কু-কর্মের সবকিছু আমি জানি। তার সমস্ত গুপ্তচরকে চিনি; ইনটেফ যাদেরকে আজ পর্যন্ত ঘুষ দিয়েছেন বা যাদের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা আদায় করেছেন ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেককে জানি আমি। কোন্ কোন্ কাজ সমাধা হয়ে গেছে, কয়টিই বা বাকি আছে–এ সবই আমার জানা।
ইনটেফের শত্রুদের বিশাল তালিকা আমার নখদর্পণে। তাঁর বন্ধু-শুভানুধ্যায়ীদের অপেক্ষাকৃত ছোট্ট তালিকাও আমার অজানা নয়। বিশাল সম্পদের যে পাহাড় তিনি চুরি করে গড়েছেন, তার প্রতিটি স্বর্ণ-খণ্ডের হদিশ বলে দিতে পারি। ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে কত জমি-জমা, মূল্যবান পাথর, যে তিনি অধিকার করেছেন, আমি ছাড়া আর ক জনই বা জানে সেটা? নিঃসন্দেহে এগুলো জানাজানি হলে তার সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হবেন মহান ফারাও।
আমার ধারণা, আমার সাহায্য ছাড়া নিজের সম্পদের সঠিক হিসেব ইনটেফ নিজেও উদ্ধার করতে পারবেন না। তার গোপন জগতের সমস্ত হিসাব-নিকাশ আমি করে থাকি, নিজেকে সব কিছুর উর্ধ্বে রেখেছেন তিনি। সবকিছুই আমার হাতে ন্যস্ত।
হাজার হাজার অন্ধকার গোপনীয়তা, ভীতিকর ব্যবসা, ডাকাতি এবং হত্যাকান্ডের এতো কিছু জানি আমি, রাজ-উজিরের পদে আসীন কাউকেও শেষ করে দিতে পারে এই সমস্ত তথ্য।
না, আমাকে ছাড়া চলবে না ইনটেফের। আমাকে উপহার হিসেবে দেওয়া সম্ভব নয় তার পক্ষে। কিন্তু, স্বয়ং ফারাও এবং মহান থিবেসের সমস্ত অধিবাসীর সামনে লসট্রিসকে ফিরিয়ে দেবেন কেমন করে?
আগেই বলেছিলাম, ইনটেফ মহা চতুর লোক। নির্ঘাত দেবতা সেথ-এরও এতো ঘৃণা আর ক্রোধ নেই। কিন্তু এমন উভয় সংকটে তাকে কোনোদিন পড়তে দেখিনি।
ক্রীতদাস টাইটা সামনে এসে দাঁড়াক, ডেকে উঠলেন ইনটেফ। দ্রুত ঠেলে ধাক্কিয়ে মঞ্চের সামনে এসে দাঁড়ালাম আমি, চতুর কোনো পরিকল্পনার জন্যে সময় দিতে চাইছি না তাকে।
