আমরা যেনো নড়তেও ভুলে গেছি। মন্ত্রমুগ্ধের মতো ফারাও-এর পানে চেয়ে রইলাম, রাজকীয় প্রতীক হাতে ইশারা করলেন তিনি। ট্যানাস, লর্ড হেরাব, উচ্চ-রাজ্য থেকে যাবতীয় বর্বর, লুটেরাদের নির্মূল করার দায়িত্ব দিলাম আমি তোমাকে। আগামী দুই বছরের মধ্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করো এই উচ্চ-সাম্রাজ্যে। ব্যর্থ হলে তোমার জন্যে অপেক্ষা করবে মৃত্যু।
পাথুরে দেয়াল কাঁপানো হুঙ্কারে ফেটে পরলো জনতা। ওরা আনন্দ করছে না। বুঝেই, দুঃখের সাথে ভাবলাম আমি। যে দায়িত্ব ফারাও আজ অর্পণ করলেন ট্যানাসের উপর, কোনো মরণশীল মানুষের পক্ষে তা অর্জন করা সম্ভব নয়। মৃত্যুর ছায়া এখনও সরে যায় নি তার উপর থেকে। আমি জানি, আজ থেকে দুই বছর পরে ঠিক যেখানে দাঁড়িয়ে আছে; সেই খানে,আজকের মতোই তেজদীপ্ত, গর্বোদ্ধত যোদ্ধা ট্যানাসের গলায় এঁটে বসবে ফাঁসির দড়ি।
*
পরিত্যক্ত, নিঃসহায়ের মতো তার চারদিকের ব্যস্ততার মাঝে স্থির দাঁড়িয়েছিলো ও, সামনের এক-সমুদ্র মুখের দিকে একবারো তাকালো না।
গোড়ালি ছুঁই-ছুঁই শুভ্র পোশাকে যেনো ঘোষিত হচ্ছিল কুমারীত্বের নিষ্কলুষতা। চুল ভোলা ওর। নরম, গাঢ় স্রোতের মতো কাঁধ পর্যন্ত নেমে আসা সেই চুলের রাশি ঝলমল করছিলো সূর্যালোকে। জল-পদ্মের তৈরি মুকুট মাথায়। স্বর্গীয় নীল সেই ফুলের ফাঁকে ফাঁকে বিশুদ্ধ স্বর্ণের সুতো।
এতো ফর্সা তার মুখশ্রী, যেনো দেবী আইসিস স্বয়ং দাঁড়িয়ে ছিলেন। বড়ো বড়ো, কালো দুই চোখে এখনও কিশোরীর ভীরুতা। হৃদয় ভেঙে যেতে চাইলো আমার; কতকাল দুঃস্বপ্ন ভেঙে জেগে উঠা এই কিশোরীকে ঘুম পাড়িয়েছি আমি তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু, আজ আর ওর জন্যে কিছু করতে পারবো না; অন্তত একবারের মতো সত্যি হতে যাচ্ছে ওর দুঃস্বপ্ন।
এমনকি কাছে পর্যন্ত যেতে পারছি না, পারি নি বিগত বেশ কয়েক দিনেও। ফারাও-এর বাহিনীর পুরোহিতেরা দিন রাত পাহারা দিয়ে রেখেছিলো ওকে। আমি জানি, চিরদিনের জন্যে আমার কাছ থেকে দূরে চলে গেছে লসট্রিস, কোনোদিনও আর কাছে পাবো না তাকে।
নীলে র তীরে বিয়ের মন্ডপ তৈরি করা হয়েছে। তার নিচে হবু-স্বামীর অপেক্ষায় বসেছিলো লসট্রিস। পাশে দাঁড়িয়ে তার বাবা ইনটেফ, প্রশংসার স্বর্ণ-শেকল গলায়; গবোদ্ধত, ঠোঁটে কোব্রার হাসি।
অবশেষে রাজকীয় বরের আগমন ঘঘাষিত হলো ঢাকের গুরুগম্ভির ধ্বনি এবং গ্যাজেল হরিণের শিঙ্গায় ফুয়ের মাধ্যমে। আমার কাছে এ হলো পুরো পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম ধ্বনি।
নেমেস মুকুট পরেছেন ফারাও, কিন্তু এতো জাঁকজমক, আভিজাত্য ফুঁড়েও বেরিয়ে পড়ছে তার আসল রূপ-ছোট-খাটো আকৃতির, বিশাল-বপু বিষণ-মুখো একজন মানুষ। যদি দেবতারা একটু সহায় হতেন, তাহলে ওই মন্ডপে, আমার লসট্রিসের পাশে আজ একজন বীর্যবান পুরুষের থাকার কথা ছিলো।
ফারাও-এর সভাসদ, মন্ত্রীরা ঘিরে রেখেছে তাকে, আমার চোখের সামনে থেকে আড়াল হয়ে গেলো মিসট্রেস। যদিও এই বিয়ের সমস্ত আয়োজন, খুঁটি-নাটি তদারক করেছি আমি, বিয়ের আনুষ্ঠানিকতায় যাওয়ার অনুমতি নেই আমার। অনুষ্ঠান চলাকালে কেবল দুই-এক ঝলক দেখতে পেলাম লসট্রিসের।
নীলনদ থেকে সদ্য-ভোলা পানি দিয়ে বর-কনে উভয়ের হাত ধুয়ে দিলেন ওসিরিসের মন্দিরের পুরোহিত, এ হলো আসন্ন-বৈবাহিক সম্পর্কের বিশুদ্ধতার প্রতীক। প্রথা অনুযায়ী গমের তৈরি রুটি ছিঁড়ে এক টুকরো ভাবী বধূর উদ্দেশ্যে বাড়িয়ে ধরলেন ফারাও, এ হলো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব। যেনো এক টুকরো পাথর মুখে নিয়েছে; টুকরোটা চাবালো বা গিলে ফেললো না লসট্রিস।
আবারো আমার চোখের আড়ালে চলে গেলো সে। এর কিছু সময় পরে সুরার খালি পাত্র ভাঙার শব্দ শুনতে পেলাম, তলোয়ারের এক কোপে ওটা ভাঙতে হয় কনেকে। সাঙ্গ হলো যতো আচার, বুঝলাম চিরকালের জন্যে ট্যানাসের নাগালের বাইরে চলে গেছে মিসট্রেস।
উঁচু মঞ্চের উপরে তার সদ্য-বিবাহিত কনের হাত ধরে এগিয়ে এলেন মহান ফারাও, জনতার উদ্দেশ্যে উপস্থাপন করলেন তাকে। গগনবিদারী চিৎকারে লসট্রিসের প্রতি তাদের ভালোবাসা প্রকাশ করলো জনতা।
এই ভীড় ছেড়ে বেরিয়ে ট্যানাসের কাছে যেতে চাইছিলাম আমি। সে এখন মুক্ত, কিন্তু বিয়ের অনুষ্ঠানে আসে নি ট্যানাস। সমগ্র থিবেসে সম্ভবত সেই একমাত্র ব্যক্তি যে আজ নদী তীরে সমবেত হয় নি অন্যদের সাথে। জানি, যেখানেই থাকুক না কেননা, আমাকে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তার। হোরাস জানেন, আমারও এই মুহূর্তে প্রয়োজন তাকে। কিন্তু ভীড় ছেড়ে বেরুনো সম্ভবপর হলো না। নির্দয় মুহূর্তগুলো দেখতে হলো আমাকে।
এই পর্যায়ে প্রভু ইনটেফ কন্যার কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় নিতে এলেন। জনতা নিরব হতে মেয়েকে আলিঙ্গন করলেন তিনি।
তাঁর আলিঙ্গনে লসট্রিস যেনো জীবন্ত একটা লাশ। দেহের পাশে শিথীলভাবে ঝুলে রইলো তার হাত, মুখ মৃতের মতো বিবর্ণ। আলিঙ্গন শেষে তার একটা হাত ধরে এবারে জনতার মুখোমুখি হলেন ইনটফে, প্রথা অনুযায়ী মেয়েকে এবারে বিদায়ী উপহার দিতে হবে তাকে। নিয়ম হলো, বরকে দেওয়া পণের অর্থের চেয়ে বেশি হতে হবে এই উপহার। কনের জন্যে এক ধরনের নিরাপত্তা এটা।
আজ তুমি আমার আবাস এবং নিরাপত্তা ছেড়ে তোমার স্বামীর বাড়ি চলে যাবে; এই বিচ্ছেদের কালে আমার ভালোবাসার চিহ্ন স্বরুপ বিদায়ী উপহার দিতে চাই তোমাকে। কী ভুল কথা, ভাবলাম আমি। জীবনে নিজেকে ছাড়া আর কাউকে ভালবাসেন নি আমার মনিব, ইনটেফ। যা হোক, প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী বলে চললেন তিনি, যে কোনো কিছু চাইতে পারো তুমি, প্রিয়। আজকের দিনে কোনো কিছুই প্রত্যাখান করা হবে না।
