স্বতস্ফূর্ত ভাবাবেগে নিদারুন আঘাত করে ভেঙে-চুরে তছনছ করার বিরল ক্ষমতা আছে আমাদের মহান ফারাও-এর। না জানি ভাষণ শেষ করার আগে আরো কতো তামাশা শুনবো। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না।
বেশ অনেকদিন ধরেই আমাদের উচ্চ-রাজ্যের আইনের শাসনের অভাব নিয়ে আমি চিন্তান্বিত ছিলাম। আমাদের লোকেদের জান-মাল আজ ভয়ানক বিপদে। সঠিক সময়ে এই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি। কিন্তু, খুব সাম্প্রতিক অতীতে এমন ভাবে কিছু কথা উপস্থাপন করা হয়েছে আমার কাছে যা দেশদ্রোহিতার সামিল। অসময়ে, ওসিরিসের উৎসবের মধ্যে উচ্চারিত হয়েছে কথাগুলো। তবে, সেই ঘোষণা ব্যক্তি ফারাও এবং দেশের উপর আক্রমণের উদ্দেশ্যে করা হয়নি। নাটকীয় ঢঙ্গে বিরতি নিলেন ফারাও। বোঝাই যাচ্ছে, ট্যানাসের কথা বলছেন তিনি। তার ক্ষয়িষ্ণুতার প্রমাণ এখানেও পাওয়া গেলো, একজন শক্তিশালী ফারাও কখনও নিজের সিন্ধান্তের কার্য কারণ ব্যাখ্যায় যাবেন না, কেবল ঘোষণা করবেন।
অবশ্যই ট্যানাস, লর্ড হেরাবের কথা বলছি আমি, ওসিরিসের নাটকে প্রভু হোরাসের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলো যে। দেশ-দ্রোহিতার অভিযোগে আটক করা হয়েছে তাকে। আমার পরামর্শকেরা তার শাস্তি নিয়ে দ্বিধা-বিভক্ত। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আছেন, যারা ট্যানাসের মৃত্যুদন্ড চাইছেন ইনটেফের পানে তাকালাম আমি, তার চোখে মুখে ফুটে আছে মনের কথা। আর, অপর এক দল ভাবছেন, তার বক্তব্য দেবতাদের নিজস্ব; ট্যানাস, লর্ড হেরাবের মনের কথা নয়। এ ছিলো সত্যিকারের হোরাসের কথা। যদি তাই হয়ে থাকে, তবে তাকে দোষী সাব্যস্ত করার কোনো কারণ নেই।
অবশ্যই, ফারাও-এর যুক্তি সঠিক। কিন্তু দ্বৈত-রাজ্যের মুকুটধারী সম্রাটের কী দায় পড়েছে দুনিয়ার অশিক্ষিত কৃষক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক-দাস এদের সামনে তাঁর বক্তব্যের যথার্থতা প্রমাণের? ইতোমধ্যেই সস্তা মদের নেশায় ঢুলছে জনতা। সিংহাসনের নিচে দাঁড়ানো রাজকীয় বাহিনীর প্রধান, নেতেরের উদ্দেশ্যে ইশারা করলেন ফারাও। কেতাদুরস্ত ভঙিতে চলে গেলো সে, কিছু সময় পরে বন্দী-প্রকোষ্ঠ থেকে ট্যানাসকে নিয়ে হাজির হলো।
আমার বুকের ভেতরটা লাফিয়ে উঠলো তাকে দেখে, আরো আশান্বিত হলাম যখন বুঝলাম ওর পায়ে কোনো শেকল নেই। কোনো রকম অস্ত্র বা সম্মানসূচক প্রতীক পরিধান করে নেই সে, সাধাসিধা কাপড় গায়ে। পায়ে সেই তেজদ্বীপ্ত ছন্দ। কপালে র্যাসফারের আঘাতের চিহ্ন শুকিয়ে এসেছে, তবে তাকে নির্যাতন করা হয়নি বন্দী দশায়। আমার আশার পালে হাওয়া লাগলো। তার মানে, ওরা তাকে দন্ডিত বলে মনে করছে না!
এক মুহূর্ত পরেই সমস্ত আশার বাতি নিভে গেলো। সিংহাসনের সামনে এসে কুর্নিশ করলো ট্যানাস, এরপরে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। নির্দয়, নির্মম কণ্ঠে তার উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন ফারাও, ট্যানাস, লর্ড হেরাব, দেশদ্রোহিতা এবং অবমাননার জন্যে অভিযুক্ত তুমি। এই দুই অভিযোগেই তুমি আমার চোখে দোষী। বিশ্বাসঘাতকের চিরন্ত ন শাস্তি, মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করলাম আমি তোমাকে।
দণ্ডিত আসামীকে চিহ্নিত করবার রীতি অনুায়ী ট্যানাসের গলার চারধারে ফাঁসের দড়ি পরালো নেতের। হালকা গুঞ্জন উঠলো জনতার মধ্যে থেকে। জোরে কেঁদে উঠলো একটা মেয়ে, মুহূর্ত পরেই কান্না-অনুতাপে ভারি হয়ে উঠলো মন্দিরের বাতাস। মৃত্যু দন্ড ঘোষণায় এমন প্রতিক্রিয়া আর কখনও হয়নি মিশরের ইতিহাসে। ট্যানাসের প্রতি মানুষের ভালোবাসা এমনই স্বতন্ত্র। তাদের অনুভূতির সঙ্গে একাত্ম আমি নিজেও জানি না, কখন চোখ ফেটে পানি বেরিয়ে এসেছিলো।
রক্ষীরা তাদের অস্ত্রের বাটের আঘাতে নিবৃত্ত করতে চাইলো শোকাহত জনতাকে। কোনো কাজ হলো না তাতে। সবার গলা ছাপিয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম আমি, দয়া করুন, মহান ফারাও! মহৎ ট্যানাসকে ক্ষমা করুন!
একজন রক্ষী অস্ত্রের বাট দিয়ে আঘাত করলো আমার মাথার পাশে, ছিটকে পরে গেলাম আমি। কিন্তু আমার আবেদন শুনছে জনতা। দয়া করুন, মহান মামোস! রক্ষীদের প্রাণান্ত প্রচেষ্টায় কিছুটা স্তিমিত হলো হুঙ্কার, কিন্তু শব্দ করে তখনও কেঁদে চললো মেয়েরা।
অবশেষে ফারাও-এর উচ্চ স্বরে থামলো কোলাহল। অভিযুক্ত ব্যক্তি আইনের শাসনের ব্যর্থতার কথা উচ্চারণ করেছে। সিংহাসনের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে, দস্যুর হাত থেকে এই মাটিকে রক্ষা করতে। সে একজন বীর কামনা করেছে। সবাই জানে, সে নিজেও একজন শক্তিশালী যোদ্ধা। যদি তাই হয়, তবে তার দাবিগুলো পূরণে সেই হতে যারে উপযুক্ত ব্যক্তি।
এবারে দ্বিধান্বিত হয়ে পরে জনতা। আস্তিনের কাপড় দিয়ে চোখ মুছলাম আমি। তন্ময় হয়ে শুনতে লাগলাম ফারাও-এর কথা। সেই কারণে, মৃত্যুদন্ড দুই বছর পর্যন্ত মুলতুবির ঘোষণা করছি। যদি সত্যিই দেবতা হোরাসের প্ররোচনায় দেশদ্রোহী বাক্য উচ্চারণ করে থাকে ট্যানাস, তাহলে আমার অর্পিত দায়িত্ব পালনে দেবতারা অবশ্যই সাহায্য করবে তাকে।
অসহনীয় নিরবতা নেমে এলো মন্দির জুরে। কী শুনছে, কেউ বুঝতে পারলো না। আশা-নিরাশার দোলাচলে বন্দী তখন আমরা।
ফারাও-এর ইঙ্গিতে তাঁর একজন উচ্চ-মন্ত্রী ছোট্ট একটা পাত্র এগিয়ে দেয়, নীল একটা মৃর্তি রাখা আছে তাতে। ওটা তুলে ধরে ফারাও বলে উঠেন, লর্ড হেরাবকে বাজপাখির প্রতীক অনুমোদন করলাম। এর ক্ষমতা বলে আজ থেকে, তার কাজের প্রয়োজনে যতো জন সৈনিক, যে বস্তু তার প্রয়োজন তা সে পেতে পারে। যে কোনো উপায় অবলম্বন করতে পারে সে, কারও কাছে জবাবদিহিতার প্রয়োজন নেই। কেউ তাকে প্রশ্ন করতে পারবে না। আগামী পূর্ণ দুই বছর, সে শুধু মাত্র রাজার লোক, শুধুমাত্র তাঁরই কাছে মুখাপেক্ষী। সময় শেষ হলে, আগামী ওসিরিসের উৎসবের শেষ দিনে, আবারো এই সিংহাসনের সামনে দাঁড়াবে সে। গলায় থাকবে ফাঁসির দড়ি। যদি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, আজ ঠিক যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, সেইখানে, তার গলায় ফাঁসির রশি এঁটে দেওয়ার হুকুম দেবো আমি। আর যদি সে সক্ষম হয় তার কাজে, আমি, ফারাও মামোস, নিজ হাতে ওই ফাঁসির দড়ি সরিয়ে তার গলায় স্বর্ণের হার পরিয়ে দেবো।
