তোমাদের মনিব কোথায়? আমার প্রশ্নের উত্তরে সবচেয়ে বড় মেয়েটা নাক উঁচু করে বললো, যেখানে তুমি তার নাগাল পাবে না, ব্যাটা খোঁজা।
আমার প্রতি লসট্রিসের পক্ষপাতিত্বে এরা সবাই দারুন ঈর্ষান্বিত।
সোজা করে উত্তর দাও, না হয় মেরে পাছার ছাল তুলে নেবো। এহেন অভব্য হুমকিতে কাজ হলো, মসৃণ গলায় সে জানালো, ওরা তাকে ফারাও-এর হারেমে নিয়ে গেছে। কিছুই করার নেই তোমার ওখানে। শুনেছি, এমনকি খোঁজা ব্যাটাদেরও হারেমের ভেতরে যেতে দেয় না ওখানকার পাহাড়াদারেরা।
ঠিকই বলেছে সে, কিন্তু আমাকে তো চেষ্টা করতেই হবে। আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এখন মিসট্রেসের। যা ভেবেছিলাম, রাজার হারেমের রক্ষীরা খুব কড়া। ওরা চেনে আমাকে, কিন্তু তাদের উপর নির্দেশ আছে এমনকি লসট্রিসের নিকটাত্মীয়দেরকেও যেনো প্রবেশ করতে দেওয়া না হয়।
একটা স্বর্ণের আংটির বিনিময়ে আমার বার্তা লসট্রিসের কাছে পৌঁছানোর বন্দোবস্ত করলাম। প্যাপিরাসের টুকরোয় উৎসাহব্যঞ্জক কিছু কথা লিখে নিলাম দ্রুত। ট্যানাসের ভাগ্যে কী ঘটেছে–এসব কিছুই জানানোর সাহস হলো না। দুঃখের বিষয়, পরে জেনেছিলাম সেই বার্তা কখনও পৌঁছেনি লসট্রিসের কাছে। এই দুনিয়ায় কী কাউকেই বিশ্বাস করার যো নেই?
ওসিরিসের উৎসবের শেষ দিনের আগে ট্যানাস বা মিসট্রেসের সাথে আর দেখা হয়নি আমার।
৩. দেবতার মন্দিরে
দেবতার মন্দিরে শেষ হলো ওসিরিসের উৎসব। সমগ্র বিবেসের অধিবাসীরা জড়ো হয়েছিলো মন্দির প্রাঙ্গনে, ভীড়ের চাপে শ্বাস নেওয়া দায়।
শোকে-চিন্তায় পরপর তিনরাত ঘুমাইনি আমি, একে তো ট্যানাসের ভাগ্যে কী ঘটেছে, সেই চিন্তা, তার সাথে ইনটেফের নির্দেশে লসট্রিসের বিয়ের আয়োজনের চাপ যোগ হয়েছে। মিসট্রেসের সাথে আমাকে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হয়নি এই কয় দিনে। দাস বালকেরা কেউই এমন উদভ্রান্ত, চিন্তিত অবস্থায় কখনও দেখেনি আমাকে।
ফারাও-এর ভাষণ শুনতে গিয়ে অন্তত দুই বার টলে পরে যাচ্ছিলাম। শেষমেষ, ধরে রাখতে পেরেছিলাম নিজেকে। ওদিকে অর্ধ-সত্য আর কল্পনাপ্রসূত ধ্যান-ধারণা নিয়ে বলে চললেন রাজা।
এটা সত্যি, নিজস্ব অচেতন ঢঙ্গে বলছিলেন তিনি, কিন্তু একটা ব্যাপার কিছুটা হলেও আনন্দ দিলো আমাকে; ট্যানাসের বলা কথাগুলো মনে দাগ কেটেছে তার। ভাষণে ঘুরে-ফিরে ট্যানাসের নির্দেশিত অসামাঞ্জস্যগুলোর কথা আসছিলো বারবার।
সৈন্য বাহিনীতে যোগদান থেকে অব্যহতি পাবার জন্যে ইচ্ছাকৃত বিকলাঙ্গতা দারুণভাবে নিরুৎসাহিত করা হবে এখন থেকে, বলে চললেন ফারাও, যে কোনো তরুণ সৈন্য বাহিনীতে যোগদান থেকে ক্ষমা চাইলে তার কারণ খতিয়ে দেখা হবে। অন্তত একবার সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ফারাও, ক্লান্ত হাসির সাথে ভাবলাম। মেনসেট আর সোবেক কোনো অভিজ্ঞ যোদ্ধার সামনে নিজেদের বিকলাঙ্গতা নিয়ে জবাবদিহি করছে-ভাবনাটা দারুন আনন্দ দিলো আমাকে। এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা জরিমানা করা হবে, যদি ইচ্ছাকৃত অঙ্গহানীর অভিযোগ প্রমাণিত হয়। সেথ্ এর বিশাল বপুর কসম, এবারে অন্তত আমার মনিব ইনটেফের দুই বদমাশ ছেলের উপযুক্ত শাস্তি হবে।
এতো চিন্তার মধ্যেও ফারাও-এর ভাষণ শুনতে শুনতে কিছুটা ভালো বোধ করলাম, ওদিকে রাজা বলে চললেন, এখন থেকে, কোনো বেশ্যা মেয়ে নিজেদের এলাকার বাইরে ব্যবসা করতে পারবে না। দশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা জরিমানা হবে এর অন্যথা ঘটলে। এইবারে, বহু কষ্টে অট্টহাসিতে ভেঙে পড়া থেকে বিরত রাখলাম নিজেকে। ভাবছি, নদী-ফেরত নাবিকেরা কেমন ভাবে নেবে এই সিদ্ধান্ত। ফারাও একেবারে সীমা ছাড়িয়ে ফেলেছেন, কোনো পুরুষ মানুষই নিজের উপভোগের রাস্তায় বাধা পছন্দ করে না।
দারুন উত্তেজনা বোধ করছি। ট্যানাসের ঘোষণার সবদিক বিশেষভাবে ভেবে নজর কেড়েছে ফারাও-এর, এটা এখন পরিষ্কার। এখন কী ট্যানাসকে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে শাস্তি দিতে পারেন তিনি? জানি না।
ফারাও-এর কথা তখনও শেষ হয়নি। আমি জেনেছি, আমার কিছু পদস্থ লোকেরা তাদের প্রতি আমার বিশ্বাস এবং আস্থার বরখেলাপ করেছে। খাজনা আদায় এবং সাধারণ মানুষের অর্থ নিয়ে এদের কার্যকলাপ খতিয়ে দেখা হবে। দোষী হলে, ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হবে তাদের। অবিশ্বাসের ধ্বনিতে মুখর হয় জনতা, রাজা কী সত্যিই তার খাজনা-আদায়কারীদের বাধা দিতে সক্ষম হবেন?
ঠিক সেই সময় পেছন থেকে কে যেনো বলে উঠলো, ফারাও মহান। তিনি চিরকাল বেঁচে থাকুন! পুরো মন্দিরে ছড়িয়ে পরে সেই চিৎকার। সম্ভবত ফারাও স্বয়ং, স্বতস্ফূর্ত এই প্রশংসাধ্বনি প্রত্যাশা করেন নি। এতো দূর থেকেও পরিষ্কার বুঝলাম, আনন্দে ঝলমল করছে তার চোখ। চিন্তাক্লিষ্ট অবয়ব যেনো একটু হলেও দূর হলো, দ্বৈত-মুকুট যেনো একটু হালকা হয়ে বসে রইলো তার শিরে। এসব কিছুই ট্যানাসের ভাগ্যে মৃত্যুর সম্ভাবনা হ্রাস করছে।
প্রশংসা ধ্বনি শেষ হতেই নিজস্ব ঢঙ্গে এতক্ষণের সমস্ত ঘোষণায় জল ঢেলে দিলেন ফারাও। আমার বিশ্বস্ত উজির, মহৎ ইনটেফকে দায়িত্ব দেওয়া হলো। আজ থেকে সমস্ত তদন্ত, আটক করা খতিয়ে দেখবেন তিনি। এবারে আর হুঙ্কার নয়, নরম একটা ধ্বনি বেরুলো জনতার মুখ চীরে। বহুকষ্টে হতাশার বহিঃপ্রকাশ আঁকালাম আমি। মুরগির খোয়ার পাহাড়া দেওয়ার জন্যে হিংস্র চিতাকে দায়িত্ব দিয়েছেন ফারাও। রাজকীয় সম্পদ আর খাজনার সিংহভাগ এবারে কোথায় যাবে, বলার অপেক্ষা রাখে না।
