এতো বোকা আমি, ওর উত্তেজনা আমাকেও স্পর্শ করেছিলো সে রাতে; মন্দিরের নিচে ট্যানাসের বাহিনীর কাছে ছুটে চললাম দুজনে। এতোটাই উল্লসিত ছিলাম, বিপদের কোনো আভাস পাইনি। চাঁদের আলোয়, আমাদের সামনে অশান্ত নড়াচড়া ট্যানাসের চোখেই প্রথম ধরা পরলো। হাত ধরে টেনে একটা গাছের আড়ালে নিয়ে গেলো ও আমাকে।
সশস্ত্র যোদ্ধার দল, ফিসফিস করে বললো ট্যানাস। চাঁদের আলোয় চকচক করছে বর্ষার ডগা। ত্রিশ কি চল্লিশ জনের বিশাল একটা দল।
দস্যু মনে হয়, না হয় নিম্ন-রাজ্যের লুটেরার দল, গর্জে উঠলো ট্যানাস। সামনের লোকগুলোর লুকোচুরি সুলভ আচরণে আমি পর্যন্ত অবাক হলাম। পথ ধরে না এসে, ট্যানাসের আস্তানার চারদিকের ফসলের মাঠের উপর দিয়ে গুঁড়ি মেরে আসছে তারা।
এই দিক দিয়ে এসো! অভিজ্ঞ যোদ্ধার চোখে একটা ঢালের উপর দিয়ে কোণাকুণি পথ দেখালো ট্যানাস। ঢালের উপরে উঠে গড়িয়ে সোজা ট্যানাসের আস্তানার চৌহদ্দির মধ্যে প্রবেশ করলাম আমরা। হুঙ্কার দিয়ে উঠে সবাইকে সতর্ক করে দিলো ট্যানাস।
অস্ত্র হাতে নাও, সাহসী যোদ্ধার দল! আমার সঙ্গে এসো! এক লহমায় প্রাণ ফিরে এলো নীল কুমির বাহিনীর যোদ্ধাদের মধ্যে। আগুনের ধারে কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমাতে থাকা লোকগুলো পর্যন্ত চকিতে অস্ত্র হাতে তৈরি হলো। তাবুর দরোজা ঠেলে বেরিয়ে এলো সতর্ক সৈনিকেরা। তলোয়ার হাতে যে যার অবস্থানে পৌঁছে গেছে।
মুহূর্ত পরেই বাহিনীকে এগুতে নির্দেশ দিলো ট্যানাস। তার নির্দেশে প্রতিরক্ষা নয়, পাল্টা আক্রমণে চললো যোদ্ধার দল। সম্ভবত ভয়ানক এই অগ্রযাত্রা ভড়কে দিয়েছিলো সামনের দলটাকে, কাঁপা কাঁপা স্বরে চেঁচিয়ে উঠলো একজন ওপাশ থেকে। আমরা ফারাও-এর লোক, রাজ-কাজে এসেছি। থামো!
থামো, সাহসী যোদ্ধারা! একগুঁয়ে অগ্রযাত্রা থামালো ট্যানাস। তারপর যোগ করলো, কোন্ ফারাও-কে সেবা কর তোমরা; লাল-জবরদখলকারি নাকি সত্যিকারের ফারাও-এর?
আমরা সত্যিকারের রাজা, উচ্চ এবং নিম্ন রাজ্যের শাসক, দেবতা মামোস-এর সেবক। আমি তার দূত।
রাজার দূত সামনে এসে দাঁড়াও, চোরের মতো চুপি চুপি কোথায় চলছিলে? সামনে দাঁড়িয়ে তোমার বার্তা জানাও! আহ্বান জানায় ট্যানাস, কিন্তু শ্বাসের নিচে ক্ৰাতাসকে বলে, শয়তানীর জন্যে তৈরি থেকো। ভাবগতিক সুবিধার ঠেকছে না আমার। আগুন উস্কে দাও, আলো প্রয়োজন।
ক্রাতাসের নির্দেশে শুষ্ক পাতার স্তূপ ফেলা হলো অগ্নিকুন্ডে, কিছু সময় পরেই উজ্জ্বল শিখায় অন্ধকার দূর হলো অনেকটা। অদ্ভুত দলটার বার্তাবাহক সামনে এসে দাঁড়ায়। আমার নাম নেতের, দশ হাজারের-সেরা উপাধিপ্রাপ্ত। ফারাও-এর দেহরক্ষীদের নেতা আমি। ট্যানাস, লর্ড হেরাবকে আটক করার অনুমতি সম্বলিত বাজপাখির প্রতীক আছে আমার কাছে।
হোরাসের কসম, মিথ্যে বলছে ও, চাপা কণ্ঠে গর্জে উঠে ক্ৰাতাস। আপনি কী আসামী নাকি, আটক করবে। আমাদের সবাইকে অপমান করেছে নেতের। অনুমতি দিন, বাজপাখির প্রতীক ওর পেছন দিয়ে ঢুকিয়ে দেবো!
থামো! ট্যানাস বাধা দেয়। ও কী বলতে চায়, আগে শুনি। স্বর উচায় সে। প্রতীকটা আমাদের দেখাও, নেতের।
চকচকে নীল রাজকীয় বাজপাখির প্রতীকচিহ্ন উঁচু করে দেখায় নেতের। বাজপাখির প্রতীক হলো রাজার বিশেষ ক্ষমতার অনুমোদন। ওটা বহনকারী, স্বয়ং ফারাও-এর ক্ষমতা এবং যথার্থতা ভোগ করে। যে কোনো কারণেই হোক, কোনো ব্যক্তির অধিকার নেই এই প্রতীক বহনকারীর কাজে বাধা দেয়। এই প্রতাঁকের বাহক কেবল রাজার কাছে মুখাপেক্ষী।
আমি ট্যানাস, লর্ড হেরাব, বলে ট্যানাস। বাজপাখির প্রতাঁকের প্রতি আমি অনুগত।
মাই লর্ড, মাই লর্ড! জরুরি ভঙ্গিতে ফিসফিস করে বলে ক্ৰাতাস। রাজার কাছে যাবেন না। নির্ঘাত মেরে ফেলবে। অন্যদের সাথে কথা বলেছি আমি। পুরো বাহিনী আপনার পেছনে আছে। আপনি অনুমতি দিন, আগামী সূর্যোদয়ের আগে আপনাকে রাজার আসনে বসাবো আমরা।
একবার বলেছো, ঠিক আছে, নরম স্বরে তাকে বললো ট্যানাস, আর একবার ওই কথা তোমার মুখে শুনলে আমি নিজে তোমাকে রাজার হাতে তুলে দেবো; মেয়ডেসের পুত্র কাতাস।
আমাকে একপাশে সরিয়ে নিয়ে এরপর ট্যানাস বললো, দেরি হয়ে গেলো, বন্ধু। দেবতারা আমাদের উপর রুষ্ট । রাজার শুভ-বুদ্ধির কাছে এখন নিজেকে সমর্পণ করা ছাড়া উপায় নেই। যদি সত্যিই তিনি দেবতা হন, তবে আমার হৃদয়ের নিষ্কলুষতা তার চোখে ধরা পড়বে। আলতো করে আমার হাত স্পর্শ করলো সে, লসট্রিসকে জানিয়ে, কী ঘটেছে। বলল, আমি ওকে ভালোবাসি; যাই ঘটুক না কেন, এই জীবন আর পরবর্তি যতো জীবন আছে–আমি ভালবাসবো ওকে। বলো, প্রয়োজন হলে চিরকাল অপেক্ষা করবো আমি।
এরপর অস্ত্র খাপবন্দী করে বাজপাখির প্রতীক বাহকের উদ্দেশ্যে এগুলো ট্যানাস। রাজার আহ্বানে আত্মসমর্পণ করলাম আমি।
পেছনে, অস্ত্রের অসহিষ্ণু নড়াচড়ায়, হিসহিস শব্দে নিজেদের অননুমোদন প্রকাশ করলো তার যোদ্ধারা, কিন্তু পিছনে ফিরে তীব্র ভু-কুটিতে তাদের নিবৃত্ত করলো ট্যানাস। নেতেরের নির্দেশে রাজার রক্ষীরা ওকে ঘিরে ধরে খালের পাশের হাঁটা-পথ ধরে রওনা হয়ে গেলো নেক্রোপোলিসের উদ্দেশ্যে।
অসহিষ্ণু যোদ্ধার দলকে পেছনে ফেলে একটু দূরত্বে আমিও অনুসরণ করে চললাম রাজকীয় রক্ষীদের। মৃতের নগরীতে পৌঁছে সোজা লসট্রিসের প্রকোষ্ঠের উদ্দেশ্যে ছুটলাম। নেই ও। দাস মেয়েগুরো সিডার কাঠের বড়ো একটা বাক্সে কাপড় গোছাচ্ছে।
