নির্বাক ট্যানাস আমার পানে চেয়ে রইলো, এতক্ষণে আমার কথা বিশ্বাস করেছে সে বুঝলাম। এবারে, যে ভয়ঙ্কর সংবাদ তাকে দিতে এসেছি আমি, তা বলতে পারবো বলে মনে হলো।
আমার কথা শোনো, ট্যানাস, প্রস্তুত হও, সরাসরি বলা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই আমার হাতে; বিপরীত কোনো ক্ষেত্রে ট্যানাস নিজেও তাই করতো। আজ রাতে ইনটেফ তার মেয়ের বিয়ের ব্যপারে সম্মত হয়েছেন। খুব শীঘ্রই মহান ফারাও, মামোসের সঙ্গে তার বিয়ে; তাঁকে ছেলে সন্তান জন্ম দিতে পারলে লসট্রিস প্রধান পত্নী এবং রাণী হবে। ওসিরিসের উৎসবের শেষে রাজা স্বয়ং এই ঘোষণা দেবেন। সেই সন্ধাতেই বিয়ে সম্পন্ন হবে।
কেঁপে উঠলো ট্যানাস। চাঁদের আলোয় ছাই বর্ণ ধারণ করলো তার মুখাবয়ব। বহুক্ষণ কথা বলতে পারলাম না আমরা কেউই; অবশেষে আমাকে একা রেখে দূরের ফসলের গাদার কাছে নিচুপ দাঁড়িয়ে রইলো সে। পিছু পিছু এগুলাম আমি, বেশ কিছু সময় পর কালো একটা পাথরের উপরে বসলো ট্যানাস। যেনো এই কয়েক মুহূর্তে কয়েক দশক বেড়ে গেছে তার বয়স। ইচ্ছে করেই চুপ থাকলাম আমি। অবশেষে বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত স্বরে জানতে চাইলো ট্যানাস, লসট্রিস রাজী হয়েছে এই বিয়েতে?
প্রশ্নই উঠে না। ও সম্ভবত এসবের কিছুই জানে না। কিন্তু রাজার ইচ্ছার কাছে ওর মতামতের কোনো মূল্য নেই।
আমাদের কী করা উচিত, টাইটা?
করুণায় মন ভরে গেলো আমার। আমাদের সামনে আরো একটা খারাপ সংবাদ আছে, ওকে সতর্ক করে দিয়ে বললাম। যেদিন নিজের বিয়ের ঘোষণা দেবেন ফারাও, ঠিক সেদিনই তোমাকে আটক করা হবে। হতে পারে, তোমার মৃত্যু পরোয়ানা ঘঘাষিত হবে। ইনটেফ, রাজার কান ভারী করে রেখেছেন। আর কারণও আছে, সত্যিই তোমার বক্তব্য দেশদ্রোহীতার সামিল।
লসট্রিসকে ছাড়া আমার বেঁচে থেকেই কী লাভ। ফারাও যদি ওকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়েই নেন, তবে তাঁর বিয়ের উৎসবে আমার গর্দান যাবে উপহার হিসেবে। এতো সহজ, সাধারণভাবে কথাটা বললো ট্যানাস, ওর উপরে রাগ ফিরিয়ে আনতে বেগ পেতে হলো।
অসহায় নারীর মতো কথা বলছো তুমি, যেনো কিছু করার নেই। কেমন ভালোবাসা তোমার, ওর জন্যে লড়তে পর্যন্ত পারবে না!
কার সঙ্গে লড়বো, একজন রাজা–একজন দেবতার সঙ্গে? শান্ত-স্বরে প্রতুত্তর করে ট্যানাস। একজন রাজা যার প্রতি তুমি একান্ত অনুগত; একজন দেবতা যিনি সূর্যের মতোই ধ্রুব?।
রাজা হিসেবে কোনোরকম আনুগত্য পাবার অধিকার হারিয়েছেন তিনি। তোমার ঘোষণায় কী তুমি তাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখাও নি? একজন দুর্বল, ক্ষয়িষ্ণু মানুষ আমাদের ফারাও। তাঁরই জন্যে আজ আমাদের টা-মেরি ভেঙে পরেছে, রক্ত ঝরছে।
আর একজন দেবতা হিসেবে? আবারো অচঞ্চল কন্ঠে জানতে চায় ট্যানাস, যেনো এর উত্তরে ওর কোনো আগ্রহ নেই। বহু বীর যোদ্ধার মতো ট্যানাসও ধার্মিক, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ মানুষ ।
দেবতা? কন্ঠে ব্যঙ্গের সুর যোগ করে বললাম। তোমার তলোয়ারধারী হাতে বহু দেবতা-ঈশ্বর আছেন যা বোধকরি তার ছোট্ট-নরম শরীরেও নেই।
কী করতে বলো তুমি? নিরাসক্ত ম্রতায় বললো ট্যানাস। আমি কী করতে পারি এখন?
বড়ো করে শ্বাস টেনে বিস্ফোরণ ঘটালাম আমি, তোমার সৈনিক আর সহচরেরা শেষমুহূর্ত পর্যন্ত তোমার সাথে আছে । তুমি সাহসী, সম্মান দিতে জানো সবাই পছন্দ করে তোমাকে–থেমে গেলাম আমি। চাঁদের রহস্যময় আলোয় ট্যানাসের মুখের অভিব্যক্তি আর কিছু বলতে উৎসাহ যোগালো না।
বিশটি দ্রুত হৃদস্পন্দন কেটে গেলো, রা করলো না ট্যানাস। অবশেষে নরম কণ্ঠে সে বললো, বলে যাও।
ট্যানাস, হাজার বছর ধরে তোমার মতো একজন ফারাও চাইছিলো আমাদের এই মাতৃভূমি। লসট্রিসকে পাশে নিয়ে, তুমি বসবে সিংহাসনে আবার আমাদের লোকেদের ফিরিয়ে দেবে সেই সময়, যখন মিশর ছিলো মহান। ডাকো তোমার যোদ্ধাদের, প্রাসাদ থেকে বিতারিত কর অযোগ্য ফারাওকে। আগামী সূর্যোদয়ের আগে তুমিই হবে আমাদের উচ্চ-রাজ্যের ফারাও। আগামী বছর এই সময়ে তোমার নেতৃত্বে দুই রাজ্য এক করবো আমরা। পরাজিত হবে যতো অপশিক্ত। ঝটকা মেরে দাঁড়িয়ে ট্যানাসের মুখোমুখি হলাম আমি। ট্যানাস-প্রভু হেরাব, তোমার নিয়তি, তোমার ভালোবাসা অপেক্ষায় আছে। এই দুটো শক্তিশালী যোদ্ধার হাতে তুলে নাও ওগুলো!
যোদ্ধার হাত হ্যাঁ, ঠিক বলেছো। বিড়বিড় করে বলে আমার মুখের সামনে হাত দুটো তুললো ও। এই হাত দিয়েই তো মিশরের জন্যে লড়েছি, রক্ষা করেছি তার অভিভাবককে। আমাকে মন্ত্রণা দিলে তুমি, বুড়ো বন্ধু। এগুলো বিশ্বাসঘাতকের হাত নয়। এই হৃদয়ও নয় ছলনায় পরিপূর্ণ। একজন দেবতার অপমান করে তার রাজ্য এই হৃদয় অধিকার করবে না।
হতাশায় গুঙ্গিয়ে উঠলাম আমি। পাঁচশো বছরের মধ্যে সেরা ফারাও হবে তুমি। তোমাকে দেখা হতে হবে না সেজন্যে। আমার কথা শোনো, যা বলছি কর; আমাদের এই মাতৃভূমি মিশরের জন্যে; আমরা দুজনেই যে নারীকে ভালোবাসি, তার জন্যে।
একজন বিশ্বাসঘাতককেও কী একইভাবে ভালবাসবে লসট্রিস, যেমন করে একজন দেশপ্রেমিক যোদ্ধাকে ভালবাসতো? মাথা নেড়ে নিজেই উত্তর দিয়ে দিলো ট্যানাস, না, বাসবে না।
যাই ঘটুক না কেননা, সে তোমাকে–আমাকে থামিয়ে দিলো ট্যানাস।
মিছে বলো না, টাইটা। লসট্রিস যোগ্য নারী। বিশ্বাসঘাতকতা আর চুরি করলে আমি ওর যোগ্য থাকবো না। এরচেয়েও বড়ো কথা, আমি আর নিজেকেও সম্মান করতে পারবো না। ওর নিষ্পাপ প্রেমের যোগ্য নয় একজন বিশ্বাস ঘাতক। আমাদের বন্ধুত্বের নামে বলছি, এ ব্যপারে আর কথা বলো না। দ্বৈত-মুকুটের উপরে আমার কোনো অধিকার নেই, কোনো দিন থাকবেও না। হোরাস, তুমি আমার কথা শুনছো–কোনোদিন এই প্রতিজ্ঞা ভাঙলে তোমার মুখ ফিরিয়ে নিও আমা হতে।
