বুনো রাগে উন্মত্ত আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, সেথ্-এর সঙ্গে তুমিও একটা সত্যিকারের গর্দভ! কী উভয়সংকটে তুমি ফেলেছে আমাদের, জানো? তুমি আর তোমার ওই বড়ো মুখ! আমার মিসট্রেসের নিরাপত্তা কিংবা ভালো থাকা না থাকার কোনো মূল্য নেই তোমার কাছে! এতটা বলতে চাই নি আমি, কিন্তু একবার মুখের অর্গল খুলে যেতে এক নাগারে কথা ক টা বলে থামলাম। জানি, এসব কিছুর জন্যেই ট্যানাস দায়ী নয়।
এক হাত উঁচু করে যেনো নিজেকে আড়াল করলো সে। আরোপা একেবারে চমকে দিয়েছে। এ রকম আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্যে কেনো অস্ত্র এই মুহূর্তে নেই আমার কাছে। বলতে বলতে ঠোঁটের হাসি ধরে রেখে এক হাতে হিড়হিড় করে টেনে আমাকে তাবুর বাইরের অন্ধকারে নিয়ে এলো ট্যানাস। যেনো ছোট্ট একটা বাচ্চার মতো ঝুলতে লাগলাম তার শক্তিশালী হাতের উপর ।
এবারে খুলে বলো সবকিছু! ধীর লয়ে আদেশ করে ট্যানাস। কী এমন ঘটেছে, সবার সামনে এ ধরনের একটা আচরণ করলে?
এখনও রেগে আছি আমি, তবে রাগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভয়। সারা জীবন ধরেই তোমাকে তোমার গাধামোর হাত থেকে রক্ষা করে করে আমি ক্লান্ত। তুমি কী কখনও বুঝতে শিখবে না? গত রাতের নির্বোধ আচরণের পর তোমার ধারণা, তোমাকে এমনি এমনি ছেড়ে দেওয়া হবে?
গীতি-নাট্যে আমার ঘোষণার কথা বলছো তুমি? বোকা বোকা দেখালো ট্যানাসকে। আমাকে মুঠো থেকে ছেড়ে দিলো সে। কেমন করে ওটাকে নির্বোধ আচরণ বলতে পারলে তুমি? আমার সব সৈনিকেরা, যার সাথেই আমি কথা বলেছি সবাই দারুন খুশি ওই ঘোষণায়–
আরে গাধা, তোমার সৈনিক আর বন্ধু-বান্ধবের মতামতের এক কানা-কড়ি মূল্যও নেই। অন্য যে কোনো শাসকের দিনে হলে এতক্ষণে মরে পচে যেতে, বন্ধু। কিন্তু, এমনকি আমাদের দুর্বল ফারাও পর্যন্ত তোমাকে ছাড়বে না। তার সিংহাসনের মায়া আছে। তোমাকে চরম মূল্য চুকাতে হবে, ট্যানাস, প্রভু হেরাব। হোরাস জানেন, কতো ভয়ঙ্কর হবে সেই হিসেব।
তুমি হেয়ালি করে বলছো, পাল্টা অভিযোগ করে ট্যানাস। আমি রাজার প্রতি দারুন অনুগত। উনার চারপাশে কেবল ভাঁড়েদের আনাগোনা, তারা রাতদিন মিছে কথা বলে তাঁকে। আমি তাকে সত্যি জানিয়েছি, আর আমি জানি, তিনিও ব্যপারটা চাইছিলেন। আমার প্রতি তার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
এহেন সোজাসুজি, নিখাদ সরল বিশ্বাসের সামনে আমার রাগ যেনো উবে গেলো। ট্যানাস, প্রিয় বন্ধু, কী বোকা তুমি! বিষাক্ত সত্য গলধঃকরণের পর কেউ কারও প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করে না। কিন্তু, ওটা বাদ দিলেও, ইনটেফের জালে নিজেকে ধরা পরতে দিয়েছো তুমি।
ইনটেফ? কঠোর চোখে আমার দিকে চাইলো ট্যানাস। ইনটে আবার কী করলেন? এমনভাবে বলছে, যেনো উনি আমার শত্রু। রাজ-উজির আমার বাবার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু ছিলেন। আমি জানি, বিপদে-আপদে উনি আমার পাশে আছেন। বাবার মৃত্যু-শয্যায় তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন।
টের পেলাম, আমার সাথে এতো দিনের বন্ধুত্ত সত্ত্বেও জীবনে এই প্রথমবারের মতো আমার উপর রেগে গেছে সে। ভালো করেই জানি, ট্যানাসের রাগ ভয়ঙ্কর।
ওহ, ট্যানাস, শেষমেষ আমার রাগের আগুনে ছাইচাপা দিলাম। আমি তোমাকে সত্যি বলি নি। অনেক কিছু বলা উচিত ছিলো, কিন্তু কখনও বলে উঠতে পারি নি। তুমি যা ভাবছো, তার কিছুই ঠিক নয়। কাপুরুষের মতো আচরণ করেছি আমি। কখনও তোমাকে বলিনি, ইনটেফ ছিলেন তোমার বাবার জানের শত্রু।
তা কী করে হয়? মাথা নাড়লো ট্যানাস। তারা দুজন বন্ধু ছিলেন, খুবই নিকটজন। ছোটো বয়সের কথা মনে পরে, দুজন কেবল একসাথে হাসতেন। বাবা বলেছিলেন, আমি ইনটেফের উপর আমার জীবন পর্যন্ত বিশ্বাস করতে পারি।
মহৎ পিয়াংকি, প্রভু হেরাব তাই বিশ্বাস করতেন। এই ভুল বিশ্বাসের কারণে সবকিছু হারিয়েছিলেন তিনি, শেষপর্যন্ত জীবনও দিয়েছেন।
না, না, এটা হতে পারে না। তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে। আমার বাবা অনেকগুলো দুর্ভাগ্যের শিকার হয়েছেন
তার প্রতিটি দুর্ভাগ্যের পেছনে ইনটেফের সযত্ন হাত ছিলো। তোমার বাবার জনপ্রিয়তা আর গুণাবলির জন্যে ইনটেফ হিংসা করতেন তাঁকে। তার ধন-সম্পদ এবং ফারাও-এর সুনজরের জন্যেও ঘৃণা করতেন। তিনি জানতেন, প্রভু হেরাবকে তার আগেই রাজ-উজিরের পদ দেওয়া হবে। এসব কারণেই তাঁকে দারুন ঘৃণা করতেন ইনটে।
আমি তোমাকে বিশ্বাস করতে পারছি না। কিছুতেই না। দৃঢ়ভাবে মাথা নেড়ে আমাকে নাকচ করে দিলো ট্যানাস। রাগের শেষ ভাবটুকুও উবে গেলো আমার।
আজ সব বলবো তোমাকে, আরও অনেকদিন আগেই উচিত ছিলো বলা। কী প্রমাণ চাও তুমি? সব বোঝাবার সময় এখন নেই। আমাকে বিশ্বাস কর। ঠিক তোমার বাবার মতো তোমাকেও মনে-প্রাণে ঘৃণা করেন প্রভু ইনটেফ। তুমি জানো না, লসট্রিস এবং তুমি মহাবিপদে আছো এই মুহূর্তে। না, না, প্রাণঘাতি কিছু নয়; কেবল পরস্পরকে চিরতরে হারাতে যাচ্ছ।
তা কী করে সম্ভব, টাইটা? আমার কথায় একটু নড়ে গেছে ট্যানাস। আমার তো ধারণা ছিলো, ইনটে আমার প্রস্তাবে সম্মত হয়েছেন। তুমি কথা বলো নি তার সাথে?
বলেছি, চিৎকার করে উঠে ট্যানাসের একটা হাত আমার জামার নিচে গলিয়ে দিলাম। এই ছিলো তার উত্তর। দেখেছো, চাবুকের আঘাতগুলো দ্যাখো! কেবল তোমাদের কথা বলার কারণে এই শাস্তি। তোমাকে এতোটাই ঘৃণা করেন ইনটে।
