আবারো হেসে উঠে দুই আঙুলের ফাঁকে আমার চুলের গাছি জড়াতে লাগলেন ইনটেফ। নির্ঘাত শুরু থেকেই এটা তোমার মনে ছিলো, আমাকে কিছু বলে নি। নিজে থেকে উদ্যোগ নিয়ে কাজ সমাধা করলে। অবশ্যই, এসব আমাকে না বলার জন্যে তোমাকে শাস্তি দেওয়া উচিত। আমার চোখে পানি চলে আসা পর্যন্ত চুলের গাছি আঙুলে পেচালেন ইনটেফ। কিন্তু কেমন করে তোমাকে শাস্তি দিই, যখন দ্বৈত-মুকুট আমার ধরা-ছোঁয়ার মধ্যে নিয়ে এসেছো তুমি? চুলের গাছি ছেড়ে দিয়ে আমাকে চুমো খেলেন ইনটেফ। মাত্রই রাজার ওখান থেকে এলাম। দুই দিন পরে, উৎসবের শেষ দিনে, আমার কন্যা লসট্রিসের সাথে তার সম্বন্ধের ঘোষণা দেবেন তিনি। অনুভব করলাম, একটা অন্ধকার যেনো ছেয়ে এলো আমার চারপাশে, বরফ-ঠাণ্ডা শিশির যেনো ত্বক স্পর্শ করলো।
সেদিনই, উৎসবের সমাপ্তির পরপরই বিয়ে হবে। আমিই তাড়াহুড়ো করেছি ওটা নিয়ে, বেতাল কিছু ঘটার আগে ভালোয় ভালোয় হয়ে যাক বিয়েটা–আমি তাই চাই।
এতো দ্রুত কোনো রাজকীয় বিবাহ সম্পন্ন হওয়া অস্বাভাবিক, তবে অশ্রুত নয়। রাজনৈতিক কোনো সুবিধা অর্জনের জন্যে বা কোনো ভূ-খণ্ডের অধিকার পাওয়ার জন্যে এ ধরনের তড়িৎ বিয়ের নজির রয়েছে। প্রথম মামোস- যিনি আমাদের বর্তমান ফারাও-এর পিতা; যুদ্ধক্ষেত্রে একজন হারিয়ান দলনেতার কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু আমার চরমতম দুঃস্বপ্নের সত্যি হওয়ার ঘটনায় সেই উদাহরণ কোনো স্বস্তি জোগালো না।
আমার এই অস্বস্তি ইনটেফ লক্ষ্য করলেন না। সামনের দিনগুলোর সুখ-স্বপ্নে বিভোর তিনি, কথা বলে চললেন। রাজার প্রস্তাবে আনুষ্ঠানিক সম্মতি দেওয়ার আগে আমি বলে নিয়েছি, যদি আমার কন্যার গর্ভে তার কোনো পুত্র সন্তান হয়, তবে প্রধান পত্নী এবং রাণীর মর্যাদা লসট্রিস পাবে। খুশির আতিশায্যে হাততালি দিলেন ইনটেফ।
নিশ্চই বুঝতে পারছো, এর অর্থ কি। যদি আমার নাতি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই ফারাও মারা যান, সেক্ষেত্রে তার দাদা হিসেবে এবং সবচেয়ে নিকট পুরুষ-আত্মীয় হওয়ার কারণে শাসনভার পেয়ে যাবো হঠাৎই কথা থামিয়ে আমার চোখে চেয়ে রইলেন ইনটেফ। আমি জানি তার মাথায় এখন কী চলছে। মনের কথা উচ্চারণ করে ফেলেছেন একজন মামুলি দাসের সামনে। নিখুঁত ষড়যন্ত্রের জাল বুনেছেন তিনি। যদি লসট্রিসের গর্ভে ফারাও-এর কোনো পুত্র সন্তান হয়, তবে বেশিদিন বাঁচতে দেওয়া যাবে না ফারাওকে। আমরা দুইজনেই বুঝেছি ইনটেফের মনোবাঞ্ছ। আমার মনিব এইমাত্র রাজার মৃত্যু-পরোয়ানা ঘোষণা করেছেন। আর একমাত্র জীবিত মানুষ, যে ওটা উচ্চারিত হতে শুনেছে, সে হলাম আমি, টাইটা–একজন মামুলি ক্রীতদাস। পরস্পরকে পরিষ্কার বুঝতে পারলাম আমরা সেই রাতে।
মালিক, ঠিক যেভাবে আমি সবকিছু পরিকল্পনা করেছিলাম, সেভাবে সবকিছু হওয়ায় আমি কৃতজ্ঞ। এখন স্বীকার করছি, ইচ্ছে করেই আপনার কন্যাকে রাজার যাত্রা পথে ঠেলে দিয়েছিলাম আমি। আমিই ফারাও-কে বলেছি, সে হতে যাচ্ছে রাজার পুত্র সন্তানের জননী। গীতি-নাট্যে ইচ্ছে করেই তার সম্মুখে উপস্থাপন করেছি লসট্রিসকে। কিন্তু সফল হওয়ার আগ পর্যন্ত এসব কথা আপনাকে বলার সাহস করে উঠতে পারিনি। কিন্তু এখনও অনেক কাজ বাকি আছে। সঙ্গে সঙ্গেই একটা বিরাট তালিকা বলে যেতে লাগলাম; মিশরের সোনালি মুকুট পরিধানের আগে আর কী কী সমস্যা ইনটেফের হতে পারে সেই বিষয়ে। কৌশলে জানালাম, আমাকে এখনও কত প্রয়োজন তাঁর। ধীরে ধীরে শিথিল হলেন ইনটেফ। বুঝলাম অন্তত নিকট ভবিষ্যতের জন্যে আমার জীবন নিরাপদ।
এরও বেশ অনেকক্ষণ পরে ইনটেফের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে লসট্রিসের প্রকোষ্ঠের উদ্দেশ্যে ছুটলাম। কী ভয়ানক বিপদে তাকে ফেলেছি আমি, জানাতেই হবে ওকে। কিন্তু হঠাৎই থেমে দাঁড়ালাম ওর দরোজার সামনে। কী হবে ওকে সতর্ক করে? কেবল মানসিক অশান্তি, এমনকি আত্মহত্যা প্রবণতা উৎসাহিত করা হবে তাতে। ঘটনাবলির করুণ পরিণতি এড়াতে হলে দ্রুত কাজ করতে হবে এখন আমার ।
মাত্র একজন মানুষ এই মুহূর্তে সাহায্য করতে পারে আমাকে।
নেক্রোপলিস ছেড়ে চাঁদের আলোয় আলোকিত হাঁটা-পথ ধরে নদী তীরের উদ্দেশ্যে ছুটলাম আমি। ওখানেই আস্তানা গেড়েছে ট্যানাসের বাহিনী। পূর্ণিমার আর মাত্র তিন দিন বাকি, পশ্চিম দিগন্তের এলোমেলো পাহাড়ের সারি ঠাণ্ডা হলুদ আলো ছড়াচ্ছে, তাদের গাঢ় ছায়া পড়ছে নিচের সমভূমিতে। যেতে যেতে ভাবছিলাম আসছে দিনগুলোয় কী বিপদ অপেক্ষা করে আছে ট্যানাস, আমার আর লসট্রিসের জন্যে। নদী তীরে পৌঁছার অনেক আগেই ভিজে একশা হয়ে গেলাম।
নীল নদের তীরে, খালের মুখে সহজেই খুঁজে পাওয়া গেলো ট্যানাসের আস্তানা । যুদ্ধ গ্যালিগুলো একে একে নোঙড় করে রাখা হয়েছে খালের প্রবেশমুখে। আস্তানায় ঢোকার মুখে আমাকে বাধা দিলো পাহারাদার, পরে চিনতে পেরে পথ ছাড়লো। সোজা ট্যানাসের তাবুর উদ্দেশ্যে চললাম আমি।
ক্রাতাস এবং আরও চারজন বিশ্বস্ত সঙ্গীর সাথে রাতের খাবারে বসেছিলো ট্যানাস। হাসিমুখে উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে স্বাগত জানালো সে, হাতের সুরার পাত্র বাড়িয়ে ধরলো। অবাক করলে, বন্ধু। এসো, পাশে বসে আরাম করে; তোমার জন্যে খাবার আনা হচ্ছে। তোমাকে কেমন যেনো অসুস্থ মনে হচ্ছে–
