দেখেও যেনো আশ মিটছিলো না আমাদের সম্রাটের । দিনের বাকি সময় ওটার পাশে পার করে দিলেন, সাদা রঙের নিচু একটা আসনে বসে। তার সামনে পরে রইলো সিডার কাঠের বাক্সের পর বাক্স ভর্তি স্বর্ণ-রত্ন।
এখনও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, এতো বেশি পরিমাণ সম্পদ কখনও একত্র করা সম্ভব হয়েছিলো। কেবলমাত্র তালিকা তৈরি করে এর ব্যপকতা এবং বিচিত্রতা বোঝানো বোধ করি অসম্ভব। যা হোক, আপনাদের একটা ধারণা দেওয়ার জন্যে বলছি, ইতোমধ্যেই ছয় হাজার চারশ পঞ্চান্ন খন্ড সিডার বাক্সে ভরে গেছে। প্রতিদিন আরো একটু একটু করে যোগ করছে স্বর্ণকারেরা।
ফারাও-এর হাত এবং পায়ের আঙুলের জন্যে রয়েছে আংটি। রয়েছে বাজুবন্ধ, হার। দেব-দেবীদের স্বর্ণের প্রতিরূপ। বুকের আচ্ছাদন, কোমরবন্ধ–যাতে অলংকৃত করা আছে বাজপাখি, শকুন থেকে শুরু করে দুনিয়ার সমস্ত প্রাণীর ছবি। ল্যাপিস লাজুলি আর গারনেট, এজেট, কারণেলিয়ান, জেসপারসহ পৃথিবীর তাবৎ মূল্যবান পাথরে সজ্জিত মুকুট।
বিগত এক হাজার বছরের শিল্পের প্রতিফলন এই সম্পদ। ইতিহাস বলে, জাতীর ক্রান্তিলগ্নে নাকি তৈরি হয় তার শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম। সাম্রাজ্যের শুরুর দিকে গঠনের দিকে লক্ষ্য থাকে সবার। ঠিক যখন একটি কাঠামো তৈরি হয়ে যায়, কিছুটা বিশ্রামে যেতে পারে মানুষ; মনের খোরাক হিসেবে তখনই সৃষ্টি হয় শিল্প-সাহিত্য। এবং অতি অবশ্যই, ধনবান এবং প্রভাবশালী ব্যক্তির সমর্থন প্রয়োজন শিল্প-সৃষ্টিতে।
সমস্ত স্বর্ণ-রত্নের ওজন ইতোমধ্যে পাঁচশ টাখ ছাড়িয়ে গেছে। নিশ্চই পাঁচশ সমর্থ লোক প্রয়োজন হবে এগুলো তুলতে। আমি হিসেব করে দেখেছি, বিগত এক হাজার বছরে তৈরি হওয়া সমস্ত ধন-সম্পদের ওজনের দশ ভাগের একভাগ ওজন এই সমাধি-সম্পদের। আর এই সমস্তই নিজের সঙ্গে করে কফিনে নিয়ে যাবেন মহান ফারাও।
একজন সম্রাটের মৃত্যু-পরবর্তী জীবনে নিয়ে যাওয়া সম্পদের মূল্য হিসেব করার আমি কে? কেবল এটুকু বলি, এতো ধন-সম্পদ একত্র করতে গিয়ে, একই সঙ্গে নিম্ন রাজ্যের সাথে যুদ্ধের ব্যয় হিসেবে ধরলে, ফারাও একাই আমাদের এই মিশরকে ভিক্ষুকের ঝুলিতে পরিণত করে ফেলেছেন।
ট্যানাস যে তার আবেদনে খাজনা-আদায়কারীদের দৌরাত্নের কথা বলেছে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। খাজনা-আদায়কারী এবং রাজ্যের কোণে কোণে রাজত্ব করা দস্যুদের অত্যাচারে আমরা আজ জর্জরিত। এ থেকে বাঁচতে হলে এদের নাগপাশ ছিঁড়ে বেরুতে হবে। নিজের কারণে যখন আমাদের রাজা ভিক্ষুকে পরিণত করছেন পুরো জাতিকে, আমরা যারা এই সমস্ত অবলোকন করেও চুপ আছি তারা সবাই দোষী। ধনী-নির্ধন, মহান বা নিচু বর্ণের আমাদের মধ্যে খুব কম লোকই আছে, যারা রাতে ভালো ঘুমায়। আশঙ্কায় দিন গুনি আমরা, কখন দরোজায় কড়া নাড়বে খাজনা আদায়কারী ।
হায় দুর্ভাগা, নির্যাতিত মাটি, আর কতকাল আর্তনাদ করে যাবে তুমি?
*
নীলনদের পশ্চিম তীরে, কালো কঙ্কালসার পাহাড়শ্রেণীর পাদদেশে নিজের অন্তিম-বাসস্থানের কাছেই নেক্রোপলিসে তৈরি করা হয়েছে ফারাও-এর আলিশান অস্থায়ী আবাস।
মৃতের নগরী, নেক্রোপলিস আয়তনে কারনাকের মতোই বিশাল। সমাধি-মন্দির এবং রাজকীয় শবের নির্মাণ এবং পরিচর্যায় নিয়োজিত লোকজনের ভিটে এখানে। সম্পূর্ণ একটি রাজকীয় বাহিনী সবসময় মোতায়েন রাখা হয়; কেননা উত্তরের দস্যুদের ধন-সম্পদের প্রতি লালসা আমাদের রাজার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। ওদিকে, মরুর ডাকাতদল দিন দিন আরো সাহসী হয়ে উঠছে। সমাধি মন্দিরের ধন-সম্পদ যে কারো জন্যেই লোভনীয় একটা শিকার–তা সে যে রাজ্যের লোকই হোক না কেন।
রক্ষীরা বাদে, শিল্পী এবং কারিগরদের পরিবারও বাস করে এখানে। এদের সবার খাবার-দাবার এবং খরচাপাতি হিসেবের দায়িত্বে ছিলাম আমি। সঠিকভাবেই তাই জানা আছে, ঠিক কত জন লোকের বাস এখানে। শেষবারের মজুরি মিটানোর দিনে চার হাজার আটশ এগারো জন ছিলো। এছাড়াও, প্রায় দশ হাজার দাস তো রয়েছেই।
প্রতিদিন এদের খাবারের জন্যে কতটি ষাঁড় বা ভেড়া জবাই করতে হয়, সে হিসেব দিয়ে নিজেকে উদ্বিগ্ন করতে চাই না। নীলনদ থেকে কত মাছের সরবারহ আনা হয় এখানে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। চাবুকের তলায় নিয়ত পরিশ্রমরত এই জনগোষ্ঠীর পিপাসা মিটাতে চোলাই করা হয় হাজার হাজার পাত্র মদ।
যেহেতু নেক্রোপলিস একটি নগরী, ফারাও-এর বসবাসের জন্যে প্রাসাদ আছে এখানেও। দিনের শেষে ক্লান্ত আমরা প্রবেশ করলাম সেখানে। কিন্তু একটু বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পেলাম না এবারেও।
লসট্রিসের নাগাল পেতে যেয়ে ব্যর্থ হতে হলো। কালো দাসী মেয়েটা প্রথমবারে জানালো স্নানাগারে আছে সে; এরপরে বিশ্রাম নিচ্ছে। ধৈর্য্য ধরে তবুও বসে ছিলাম ওর কামরার অভ্যর্থনা অংশে, ঠিক সেই সময় তলব এলো ইনটেফের তরফ থেকে । আর দেরি করা সম্ভব নয়, ছুটে গেলাম।
আমি তার কক্ষে প্রবেশ করতেই অন্য সবাইকে চলে যেতে বললেন ইনটেফ। একা হতে চুমো খেলেন ঠোঁটে। তার এমন দয়া-পরবশ আচরণে বিস্মিত না হয়ে পারলাম না। খুব কমই এমন উচ্ছল থাকেন আমার মনিব।
ধন-সম্পদ আর ক্ষমতার রাস্তাটা মাঝে মধ্যে কী বিচিত্র ভাবেই না মিলে যায়। আমাকে একটু সোহাগ করে নিয়ে হেসে বললেন ইনটেফ। এবারে, ওই পথ এক মেয়েমানুষের উরুর মাঝখানে লুকিয়ে ছিলো, ভাবতে পারো? না বোঝার ভান করো না, প্রিয়, তোমার ধূর্ত মাথাটার কথা আমার জানা আছে। ফারাও আমাকে জানিয়েছেন, তুমিই এই পথে প্ররোচিত করেছে তাকে, ছেলে সন্তানের উত্তরাধিকারের কথা প্রতিজ্ঞা করে। সেথ্-এর কসম, তোমার ধূর্ততার তুলনা হয় না। আমাকে কিছু না জানতে দিয়ে কী অসাধারণ পরিকল্পনা করলে!
