অস্ত্রশালা ছেড়ে এবারে আসবাবপত্রের প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করলেন ফারাও। ওখানে একশ জন আসবাব-শিল্পী সিডার, একাশিয়া আর মূল্যবান ইবোনি কাঠের তক্তা দিয়ে ফারাও-এর শেষযাত্রার জন্যে বিছানা তৈরি করছে। আমাদের এই উর্বর জনপদে বৃক্ষ জন্মে খুব কম, কাঠ আমাদের জন্যে বিলাসী দ্রব্য দারুন মূল্যবান। নিঃসন্দেহে এখানকার প্রতিটি কাঠের গুঁড়ি এসেছে সুদূর কোথাও হতে; মরুর ওপার থেকে, নয়তো দক্ষিণের ওই রহস্যময় এলাকা থেকে। উঁচু করে জমা করা হয়েছে কাঠের গুঁড়ি গুলো, যেনো খুবই সহজলভ্য একটি বস্তু ওটি। কাঠের গুঁড়োর গন্ধে মৌ মৌ করছে পুরো প্রকোষ্ঠ ।
আমাদের সম্মুখেই শ্রেষ্ঠ মুক্তো দিয়ে ফারাও-এর অন্তিম-শয্যার মাথার অংশের কাজ শেষ করলেন শিল্পী। বাকিরা মিলে কেদারা এবং বসার অন্যান্য আসবাবের অলঙ্করণের কাজ করে চললো। রুপার সিংহ আর সোনার বাজপাখি দিয়ে সজ্জিত হতে লাগলো প্রতিটি আসবাব। এমনকি গজদ্বীপে, রাজপ্রাসাদেও এতো নিখুঁত বস্তু নেই।
আসবাবপত্রের প্রকোষ্ঠ ছেড়ে এবারে ভাস্কর্যের প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করলাম আমরা। মার্বেল, গ্রানাইট আর স্যান্ডস্টোনের খন্ড নিয়ে কাজ করে চলেছেন ভাস্করেরা। তাদের ছেনি, হাতুরি, বাটালের শব্দের সঙ্গে সঙ্গে পাতলা ধুলো ভাসছে বাতাসে। মুখে কাপড় বেঁধে চলছে পাথর খোদাই-এর কাজ। পাতালা, সাদাটে ধুলোয় আপাদস্তক ঢাকা একেকজন শুষ্ক কাশি কাসছেন থেকে থেকে। এ রোগ সাড়বে না। ত্রিশ বছর ধরে ভাস্করের কাজ করা এক ব্যক্তির দেহ কেটে দেখেছি আমি; তার ফুসফুঁসে পাথরের কণা জমা হয়ে গিয়েছিলো। যত দ্রুত সম্ভব সরে এলাম ওখান থেকে।
তাদের কাজ অসাধারণ, সন্দেহ নেই। ফারাও এবং অসংখ্য দেব-দেবীর মূর্তিগুলো দেখে মনে হয়, যেনো এখনই কথা বলে উঠবে। সিংহাসনে উপবিষ্ট ফারাও, হেঁটে চলেছেন; কী দেবতার বেশে, কী মানবের রুপে মহান ফারাও-এর অসংখ্য বিশালাকায় মূর্তি রয়েছে সেখানে। লম্বা যে গলিপথ চলে গেছে সেই কালো পাহাড় পর্যন্ত, তার দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে সাজানো হয়েছে মূর্তিগুলো। তাঁর মৃত্যুর পরে স্বর্ণ মন্ডিত কাঠের বাহন টেনে নেবে একশ সাদা ষড়। বিশাল শবাধারের ওজন টানে, এমন সাধ্যি কোনো মানুষের নেই।
পাথুরে শবাধারের নির্মাণ এখনও শেষ হয়নি পুরোপুরি। ভোলা কক্ষের মাঝখানে রয়েছে সেটা। আসুনের খনি থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিলো গোলাপী গ্রানাইটের এই একক খন্ডটি। বিশেষ জলযানে করে নিয়ে আসা হয়েছিলো তখন। পাঁচশো দাস লেগেছে তীর থেকে টেনে ওটাকে ভেতরে নিয়ে আসতে। এখন এই বিশাল গ্রানাইটের খন্ড খোদাই করা হচ্ছে যাতে করে ফারাও-এর কফিন এটে যায় ভেতরে। মোট সাতটি কফিন নির্মাণ করা হবে এর ভেতরে, সাত একটি পবিত্র সংখ্যা বলে গণ্য করা হয়। সবচেয়ে ভেতরের কফিনটি হবে সম্পূর্ণ সোনায় নির্মিত। পরবর্তীতে সেটার নির্মাণও দেখেছিলাম আমরা ।
মূর্তির এই মেলায় একটা অসাধারণ সংযোজন হলো উশব তি। প্রকোষ্ঠের পেছন দিকে নির্মাণ করা হয়েছে ফারাও-এর অন্তিম যাত্রায় তাঁকে পাহারা দেওয়া দাস এবং ভৃত্যদের নকল। এই জীবনে, এবং বাকি যতো জীবন আছে সবসময়ে রাজার সেবায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যারা; মিশরীয় সমাজের সমস্ত পেশার মানুষের কাঠের পুতুল তৈরি করা হয়েছে। নির্দিষ্ট পেশার মানুষের পোশাক, যন্ত্রপাতি সমেত পুতুলগুলো খুবই চমকপ্রদ। এখানে রয়েছে কৃষক এবং মালী; সৈনিক এবং খাজনা-আদায়কারী; জেলে এবং মুদি; মদ-প্রস্তুতকারী এবং চাকরানি; লিপিকার এবং বর্বর, হাজার হাজার তুচ্ছ শ্রমিক প্রত্যেকের উশব তি। বলা তো যায় না, পরের জীবনে কাকে কখন প্রয়োজন পরে মহান ফারাও-এর।
এই ছোট্ট পুতুলগুলোর নেতৃত্বে রয়েছে আমার মনিব, ইনটেফের একটি কাঠের পুতুল। ওটা হাতে তুলে নিয়ে মনোযোগ দিয়ে উল্টে-পাল্টে দেখতে লাগলেন ফারাও। পুতুলের পেছনের খোদাই করা লেখাগুলোও পড়লেন।
আমি জমিদার ইনটেফ, উচ্চ-রাজ্যের রাজ-উজির। ফারাও-এর সবসময়ের সঙ্গী, তিনবার প্রশংসার স্বর্ণ উপাধি জয়ী। রাজার হয়ে জবাব দিতে আমি প্রস্তুত আছি।
পুতুলটা ইনটেফের হাতে দিয়ে ফারাও মন্তব্য করলেন, আপনি কী সত্যিই অতটা পেশীবহুল, হে উজির? মাথা নিচু করলেন ইনটেফ।
ভাস্কর ঠিক আমাকে ফুটিয়ে তুলতে পারে নি, মহান ফারাও।
আজকের দিনের শেষ পরিদর্শন হিসেবে ফারাও এবারে গেলেন স্বর্ণকারদের প্রকোষ্ঠে। অখণ্ড মনোযোগ দিয়ে নিচু আসনে বসে কাজ করছে তারা। চুল্লীর গনগনে আগুন কেমন অপার্থিব আলো ছড়াচ্ছে সেখানে। যোগ্য শিক্ষা দিয়েছি আমি ওদের। ফারাও-এর প্রবেশক্ষণে হাঁটুর উপরে নিচু হলো তারা সবাই, এরপর আবারো নিরবে কাজে লেগে পরলো।
এতো বড় প্রকোষ্ঠ, অথচ চুল্লীর গরমে সেখানে শ্বাস নেওয়া দায়। নিমিষেই ঘামে ভিজে গোসল হয়ে গেলো আমাদের। কিন্তু তাঁর সামনের সম্পদে এতটাই মোহাবিষ্ট হয়ে পরেছেন ফারাও, গরম গ্রাহ্যই করলেন না। প্রকোষ্ঠের মাঝখানে, যেখানে সোনার কফিনের কাজ করছে শিল্পীরা, প্রায় ছুটে সেখানে চললেন তিনি। চকচকে ধাতুতে ফারাও-এর মুখাবয়ব চমৎকার ফুটিয়েছে তারা। সহজেই মহান ফারাও-এর পট্টি-বাঁধা মুখে এটে যাবে মৃত্যু-মুখোশটা। অবিসিডিয়ান এবং পাথুরে-ক্রিস্টালে তৈরি চোখ, মাথার উপরে ফনা তোলা গোখরোর ছবি অঙ্কিত ইউরিয়াস মুকুট। আমি নিশ্চিত, হাজার বছরেও কোনো স্বর্ণকার এমন একটি জিনিস তৈরি করে নি কখনও। অনাগত দিনগুলোর মানুষজন একদিন অবাক বিস্ময়ে দেখবে এই সৃষ্টি।
