আমার তত্ত্বাবধানে ও এমন অবস্থানে পৌঁচেছে, ইচ্ছে করলেই মন্দিরের বিজ্ঞ পুরোহিতদের সাথে ধার্মিক তত্ত্ব নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আলোচনা করতে পারে। প্রাসাদের গ্রন্থাগারের প্রায় প্রতিটি স্ক্রোল পড়ে ফেলেছে ও, তার মধ্যে আমার রচিত প্রায় এক হাজারেরও বেশি স্ক্রোল আছে। চিকিৎসাবিদ্যা সংক্রান্তই হোক বা নৌযুদ্ধের কৌশল; অথবা জোতির্বিজ্ঞান, তীর-চালনা, তলোয়ার চালনা বিষয়ক সবকিছুই আগ্রহ নিয়ে পড়েছে লসট্রিস। এমনকি, আমার স্থাপত্য-কৌশলের সঙ্গে মহান ইমহোটেপ-এর কৌশলের তুলনা পর্যন্ত করতে পারঙ্গম আমার মিসট্রেস।
কাজেই, ফারাও-কে মুগ্ধ করবার মতো সব বিষয়েই অনর্গল বলতে পারে সে। ওর শব্দ-ভান্ডার বিশাল; ধাঁধা, কৌতুক আর ছন্দ্য-বাক্যে ফারাও মোহাবিষ্ট হয়ে রইলেন পুরোটা সময়। মিসট্রেসের সুললিত কণ্ঠ, তার মাদক হাসি যে কোনো পুরুষকে প্রলুব্ধ করবে। কী দেবতা, কী মানব কোথাও নেই এমন সুষম সৌন্দর্য । আর যখন ক্ষয়িষ্ণু একজন মানুষের কাছে পুত্র সন্তানের উত্তরাধিকারের মতো আরাধ্য ব্যপার অর্জিত হতে পারে তার মাধ্যমে প্রলোভন সামলানো অসম্ভব বইকি।
যেমন করেই হোক ওকে সতর্ক করতে হবে। কিন্তু একজন তুচ্ছ দাস কেমন করে অসীম উচ্চতার মানুষজনের আলাপে বিঘ্ন ঘটাতে পারে? লসট্রিসের কিন্নর কণ্ঠ শুনতে শুনতে চিন্তাক্লিষ্টভাবে হেঁটে চললাম আমি।
প্রায় দুপুর গড়িয়ে এলো ফারাও-এর সমাধি-মন্দিরের কাজ পরিদর্শন শেষ হতে। মন্দিরের আঙ্গিনায় সবার জন্যে উন্মুক্ত ভোজের আয়োজন করা হয়েছে।
এসো, এখানে কাছে এসে বসো, নক্ষত্ররাজি নিয়ে কথা বলবো আমরা! আবারো রাজকীয় আচরণ লঙ্ঘন করে তার জেষ্ঠ স্ত্রীকে সরিয়ে দিয়ে লসট্রিসকে পাশে বসালেন ফারাও। খাবারের পুরোটা সময় তার মনোযোগ অধিকার করে রাখলো লসট্রিস। রাজা তো বটেই, আশেপাশের সবাই তন্ময় হয়ে শুনলো তার কথা।
দাস হওয়ায় ভোজে অংশগ্রহণের যোগ্য নই আমি। লসট্রিসকে সতর্ক করার আর কোনো উপায় রইলো না। পাথরের একটা সিংহের মূর্তির পদতলে বসে সবার দিকে নজর রাখলাম পুরোটা সময় । আমি একা নই, নিজের বিছানো জালের কেন্দ্রে বসে থাকা মাকড়শার মতোই নিরাসক্তভাবে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছিলেন ইনটেফ। অদ্ভুত রকম জ্বলছিলো তার চোখ দুটো।
খাবারের এক পর্যায়ে এসে লম্বা, হলুদ ঠোঁটের একটা চিল মাথার উপরে ডেকে উঠেছিলো। যেনো উপহাসের তীক্ষ্ণ হাসি হাসছিলো ওটা। খারাপ শক্তির বিপরীতে চিহ্ন আঁকলাম বুকে। কে বলবে, কোন্ দেবতা ওই চিলের ছদ্মবেশে এসে কী অভিশাপ দিয়ে গেলো?
ভোজের পর এক ঘন্টা বিশ্রাম করাই রীতি, আর বছরের এই সময়ে তো সেটা অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু এতটাই তরতাজা বোধ করছিলেন মহান ফারাও, সেটা পর্যন্ত নিতে অস্বীকার করলেন। ধন-সম্পদ দেখবার বাসনা প্রকাশ করলেন তিনি। মুকুট লাভের পর থেকেই, গত বারো বছর ধরে সমাধির জন্যে সম্পদ সংগ্রহ করা হচ্ছে তার জন্যে। এর সবই রক্ষিত আছে ছয়টি বিরাট প্রকোষ্ঠে।
প্রথম প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করলেন ফারাও। এতে রয়েছে যুদ্ধ আর শিকারে ব্যবহৃত সমস্ত অস্ত্রাদি। নিজের সঙ্গে করে ওগুলোকে পরজগতে নিয়ে যাবেন মহান ফারাও, যদি তার প্রয়োজনে লাগে সেখানে। ইনটেফের নির্দেশে নিচু কাঠামোর উপরে এক এক করে সেগুলোকে সাজিয়ে রেখেছি আমি, যাতে করে ভালোভাবে দেখতে পান ফারাও।
ওগুলো পরিদর্শনের সময় এতো বেশি কৌশলগত প্রশ্ন করছিলেন তিনি, মন্দিরের পুরোহিত আর রাজকীয় সভাসদেরা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে এদিক-সেদিক চাইতে লাগলেন, যেনো আশা করছেন তাদের হয়ে কেউ ফারাও এর প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেবে। শেষমেষ আমাকে ডেকে পাঠানো হলো। হন্তদন্ত হয়ে সামনে ছুটে গেলাম আমি, রাজার প্রশ্নবানের সামনে।
হুমম, আমাকে দেখে কপট তামাশার ভঙ্গিতে ভুড় কুঁচকালেন ফারাও। আরে, এ যে দেখছি সেই বিশ্বস্ত দাস, যে কিনা আবার নাটক লেখে রোগও সারায়! বলো দেখি, আমার জন্যে তৈরি করা যুদ্ধ ধনুকের ছিলো কোন বস্তু দিয়ে তৈরি?
মহান ফারাও, এক ভাগ তামা পাঁচ ভাগ রুপা আর চারভাগ সোনা দিয়ে তৈরি ওটা। কেবলমাত্র লট-এর খনিতে, সেই পশ্চিমের মরুতে পাওয়া যায় এই লাল সোনা। আর কোনো বস্তুই এতো ঘাতসহ, স্থিতিস্থাপক নয়, জনাব।
আচ্ছা! দুষ্ট বাচ্চাদের মতো সায় দিলেন ফারাও। কিন্তু ওটা এতো সরু করে তৈরি করলে কিভাবে? ঠিক আমার মাথার চুলের মতো?
মালিক, বিশেষভাবে নকশা করা পেন্ডুলামের মধ্য দিয়ে ধাতুটাকে গলিয়ে করা হয়েছে কাজটা। মালিক চাইলে পরে আপনাকে পুরো ব্যবস্থা দেখানো যাবে।
এর পর থেকে পরিদর্শনের বাকি সময় রাজার পাশে থাকার সুযোগ হলো আমার, কিন্তু লসট্রিসের সাথে একা কথা বলার কোনো উপায় পেলাম না।
অস্ত্রশালার বিপুল পরিমাণ বিচিত্র অস্ত্রের সবটুকু দেখলেন ফারাও। এর অনেকগুলো তাঁর পূর্বপুরুষের ব্যবহৃত। বিখ্যাত বহু যুদ্ধের সময়ে কাজে লেগেছিলো। আর বাকিগুলো সদ্য তৈরি, কখনই কোনো যুদ্ধে ব্যবহৃত হবে না। প্রত্যেকটি বস্তুই গুণে অনন্য, একজন অস্ত্র বিশারদের শ্রেষ্ঠ কাজ। তামা, সোনা আর রুপার তৈরি মাথার আচ্ছাদন, বুকের বর্ম; হাতির দাঁতের হাতলওয়ালা তলোয়ার মূল্যবান পাথরে সজ্জিত; রাজার বিশেষ বাহিনীর প্রধানের পোশা; জলহস্তি এবং কুমীরের চামড়ায় তৈরি বর্ম প্রতিটি বস্তু স্বর্ণ-খচিত । অসাধারণ এক প্রদর্শনী।
