ওটা এখন থেকে তোমার। সময় করে কাগজ নিয়ে এসো, স্বাক্ষর করে দেবো। কল্পনাপ্রসূত ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণের কারণে এতো বড় পুরস্কার পেয়ে যাবো আমি কখনও ভাবি নি। এক মুহূর্তের জন্যে উপহার ফিরিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা হয়েছিলো। কিন্তু ওই এক মুহূর্তের জন্যেই। সংবিৎ ফিরে পেতে দেখলাম, ফারাও মামোসের নির্মাণাধীন সমাধিক্ষেত্রের উদ্দেশ্যে নদীর ও মাথার খালের কাছে চলে এসেছি।
এখানেই মমি করা হবে মহান ফারাও-এর শবদেহ। স্থপতিদের সাহায্য না নিয়ে আমি নিজে নকশা করেছি নীল নদ থেকে আসা খালগুলোর। আমার ধারণা, গজ-দ্বীপে নিজের আলিশান প্রাসাদে মৃত্যুর পর রাজকীয় জলযানে করে নিয়ে আসা হবে মহান ফারাও-এর শবদেহ। তাই বিশাল এই জলযানের আকৃতির কথা মনে রেখে চওড়া করে কাটা হয়েছে খালগুলো।
আমার ছোরার ফলার মতো সোজাসুজি সমভূমির ভেতর দিয়ে চলে গেছে খাল, দুই হাজার ফুট সামনে সেই কঙ্কালসার সাহারা প্রদেশের পাহারশ্রেণীর পাদদেশ পর্যন্ত । বহু বছর ধরে, বহু শ্রমিকের ঘাম-ঝরা প্রচেষ্টায় তৈরি হয়েছে এই পাথর বাঁধানো জলপথ। দুই পাশের পাড়ে দাঁড়িয়ে জাহাজে বাধা দড়ি ধরে টেনে নিয়ে চললো দাস বাহিনী; করুণ সুরের গান তাদের কন্ঠে । দুই ধারের জমিতে কাজ করতে থাকা কৃষকের দল ছুটে এলো ফারাও-কে অভ্যর্থনা জানাতে। অবশেষে, নিখুঁতভাবে জাহাজ ঘায় ভীড়লো রাজকীয় জলযান।
ইনটেফের আহ্বানে তাঁর জন্যে তৈরি কাঠের বিশাল বাহনে চড়ে বসলেন ফারাও। স্বর্ণ-মণ্ডিত এই অতিকায় বাহনে করেই বহন করা হবে তাঁর রাজকীয় শবাধার। অবুঝের মতো চকচক করছে ফারাও-এর চোখ; খুশিতে, উত্তেজনায়। তার বিষণ্ণ জীবনে হয়তো এটাই একমাত্র আনন্দের খোরাক–অন্ততঃ এই মুহূর্তে। দুঃখ হলো তার জন্যে। জীবনের সমস্ত শক্তি, প্রচেষ্টা দিয়ে মৃত্যুকে বরণ করার পূর্ব পরিকল্পনায় মত্ত আমাদের মহান নেতা।
যেন ঘোরের বসেই, ইনটেফ-কেও তাঁর রাজকীয় বাহনে ডেকে নিলেন ফারাও। এরপরে মুখ নিচু করে কিছু একটা বললেন রাজ-উজিরের কানে।
হেসে, লসট্রিসের উদ্দেশ্যে ইশারা করলেন ইনটেফ। স্পষ্টতঃই, লজ্জায়, উত্তেজনায় লাল হয়ে গেছে লসট্রিস। খুবই অদ্ভুত ব্যপার, সাধারণত নিজেকে অপ্রস্তুত অবস্থায় খুব কমই আবিষ্কার করেছে মিসট্রেস। অবশ্য দ্রুতই সামলে নিতে পারলো ও, মৃদু হাসির সাথে তার লম্বা পায়ের মোহনীয় ভঙ্গিমায় এগিয়ে গিয়ে চড়ে বসলো ফারাও-এর পালকিতে।
রাজার সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে তিনবার মাথা ঠুকলো তাঁর পায়ের কাছে। এরপর, তাবৎ সভাসদ আর মন্দিরের সমস্ত পুরোহিতের সামনে অদ্ভুত একটা আচরণ করলেন ফারাও। নিচু হয়ে লসট্রিসের হাত নিজের হাতে তুলে নিলেন তিনি, ধরে বসিয়ে দিলেন নিজের পাশে। মহান ফারাও-এর রাজকীয় আচরণের সম্পূর্ণ পরিপন্থী এটা। তার মন্ত্রীরা সবাই মুখ চাওয়া-চাউয়ি শুরু করে দিয়েছে।
আরও কিছু ঘটেছিলো ওখানে সেদিন, যা কেউ টের পায় নি। আমার বাল্যকালে, বধির একজন দাসের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিলো। ও আমাকে শিখিয়েছিলো কেমন করে শব্দ না শুনে কেবল ঠোঁটের নড়াচড়া দেখেই মানুষের কথা আঁচ করা যায়। অসাধারণ জ্ঞান এটা আমি আত্মস্থ করেছিলাম পুরোপুরি।
আর এখন, আমি জানি ফারাও গলা নামিয়ে আমার মিসট্রেসকে বলছেন, মন্দিরের মশালের আলোয় আইসিস যেমন স্বর্গীয়, আজ সূর্যালোকেও তুমি ঠিক তাই।
যেনো ঘুষি খেলাম পেটে। আমি কী অন্ধ ছিলাম, না আহাম্মক হয়ে গেছি? একটা গর্দভও বুঝতে পারতো আমার দেওয়া ব্যবস্থা ফারাও-কে কোন দিকে চালিত করছে।
নিঃসন্দেহে, আমার পরামর্শ লসট্রিসের দিকে মনোযোগ সরিয়ে দিয়েছে ফারা এর। রাজ্যের সবচেয়ে সুন্দরী নারী, রজঃচক্রের কেবল প্রথম বছর চলছে যার–এ যে লসট্রিস স্বয়ং। আর কাব্যনাট্যে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করতে দিয়ে দারুন উপাদেয়রূপে রাজার সামনে তাকে উপস্থাপন করেছি আমি।
হঠাৎ বুঝলাম, যা ঘটতে চলেছে তার দায়ভার সম্পূর্ণই আমার। কিছু করার নেই আর । হতবাক, নির্বোধ আমি দাঁড়িয়ে রইলাম সূর্যালোকে।
অবশেষে যখন ঘর্মাক্ত কলেবরে পুরোহিতেরা কাঁধে তুলে নিলেন রাজার পালকি, চমক ভাঙল আমার । কিছু বোঝার আগেই দেখি সমাধি-মন্দিরের আঙ্গিনায় দাঁড়িয়ে আছি। রাজকীয় সমাধি-স্থানের দরোজায় ঠেলেঠুলে জায়গা করে নিয়ে পালকির পাশে এসে থামলাম। পুরোহিতদের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে লসট্রিসের অবস্থানের ঠিক নিচে চলে এলাম। ইচ্ছে করলে ওর হাত ছুঁতে পারি এখন। ওর সব কথা পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছি। নিজেকে পুরোপুরি সামলে নিয়ে এখন রাজার সঙ্গে স্বতস্ফুর্ত হাসি আর বাক্যলাপে মগ্ন লসট্রিস। মনে পড়লো, গত রাতে ঠিক এ-ই করতে চাইছিলো সে; ফারাও-কে মুগ্ধ করে তার এবং ট্যানাসের পরিণয়ের রাস্তা তৈরি করা। হায় অপরিণত মন! আজ, এই মুহূর্তে, গত রাতের মতো ওর পরিকল্পনা উপেক্ষা করতে পারছি না। অবুঝ মেয়েটা জানে না, কোন বিপদজনক পথে হাঁটছে সে। অসাধারণ যে কাহিনী বলছি আপনাদের, তাতে যদি শুরুতেই জানিয়ে দিতাম, লসট্রিসের কাঁচা মনে কেবল আবেগী হাওয়া বয়–তবে ঐতিহাসিক হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করা হতো না। আমি সত্যের অপলাপ করবো না বলে পণ করেছি, কিছুতেই ভাঙবো না এই প্রতিজ্ঞা। এতো অল্প বয়সেও লসট্রিস ছিলো অত্যন্ত বিচক্ষণ মেয়ে। আমাদের মিশরের মেয়েরা নীলের জলে-বাতাসে দ্রুত বেড়ে উঠে। লসট্রিস শুধু মনোযোগী ছাত্রী নয়, উজ্জ্বল মনের অনুসন্ধিৎসু একজন নারীও বটে। আমি, টাইটার পরিচর্যাতেই বিকশিত হয়েছে। ওর সমস্ত গুণাবলি।
