বেছে পছন্দ করা ফারাও-এর পত্নী, উপপত্নীদের মাঝে ও যেনো অতিমাত্রায় সুন্দর।
ট্যানাসের খোঁজে সামনে দৃষ্টি বোলালাম । ফারাও-এর নদী অতিক্রম পাহারা দিতে ইতিমধ্যে সামনে চলে গেছে তার গ্যালি। উদিয়মান সূর্যের প্রতিবিম্ব পড়েছে নদীর বুকে, চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দেয় যেন। দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে হলো।
ঢাকের শব্দের সাথে ফারাও-এর জলযানে আগমন ঘোষিত হলো। আজ সকালে সোনার চওড়া পট্টি সমেত হালকা মুকুট, নেমেস পরেছেন ফারাও। উৎসব হওয়া সত্ত্বেও তাঁর মুখে কোনো প্রসাধনের চিহ্ন নেই, সকালের কড়া সূর্যের আলোয় দারুন সাধাসিধা দেখাচ্ছে তাঁকে। চিন্তাক্লিষ্ট, বিশালবপু, বয়স্ক একজন ক্ষয়িষ্ণু দেবতা।
আমার দাঁড়ানোর স্থান অতিক্রম করার সময় মৃদু মাথা ঝাঁকালেন ফারাও, তার ইঙ্গিতে পাথরের হাঁটা-পথে উঠে এলাম। নিচু হয়ে তিনবার মাথা ঠেকালাম পবিত্র পদ যুগলের কাছে।
তুমিই কী সেই টাইটা, কবি? মেয়েদের মতো তীক্ষ্ণ কণ্ঠে জানতে চাইলেন ফারাও।
আমি ক্রীতদাস টাইটা, মহান ফারাও, উত্তরে বললাম। তবে আমি একজন মামুলি লিপিকারও বটে।
হুম, ক্রীতদাস, কাল তোমার মামুলি লিপি মুগ্ধ করেছিলো আমাদের। কোনো গীতিনাট্যে এতো মজা আর কখনও পাই নি। আজ থেকে তোমার নাটকের সংস্করণই হবে রাজ্যের আনুষ্ঠানিক সংস্করণ।
সবার শোনার মতো করে জোরে কথা কটা উচ্চারণ করলেন ফারাও, এমনকি আমার মনিব ইনটেফ পর্যন্ত আন্দোলিত হলেন এই ঘোষণায়। যেহেতু আমি তার দাস, সম্মান তার আমার চেয়ে বেশি-বই-কম নয়! কিন্তু কথা এখনও শেষ করেন নি ফারাও।
তুমিই কী সেই শল্যবিদ টাইটা নও, যে আমাকে ব্যবস্থাপত্র দিয়েছে?
জ্বী, মালিক, আমিই সেই দাস যে মাঝে-মধ্যে ওষুধের অনুশীলন করে থাকি।
বলো তো, কবে থেকে তোমার ব্যবস্থা কাজ শুরু করবে? গলা নামিয়ে বললেন ফারাও। কেবল আমি শুনতে পেলাম কথাটা।
মালিক, আমার দেওয়া ব্যবস্থা পুরোপুরি পালন করা হলে নয় মাস সময় লাগবে এতে, যেহেতু এই মুহূর্তে চিকিৎসক-রোগী সম্পর্কে আছি ফারাও-এর সাথে, আমি যোগ করলাম, আমার নির্দেশিত খাবার খাওয়া হচ্ছে?
আইসিস-এর বিরাট বুক-জোড়ার কসম! চোখে আনন্দের ঝিলিক খেলে গেলো রাজার। এ-ত ষাঁড়ের বিচি খেয়ে ফেলেছি, একেকবার মনে হয় প্রাসাদের কোনো গাভীর পাল দেখে না ডাক দিয়ে বসি!
তার এহেন মানসিকতায় আমিও একটু তামাশা করার লোভ সামলাতে পারলাম না। আমার বর্ণনা মতো মেয়ে পেয়েছেন?
হায়, এতো যদি সহজ হতো। সুন্দর ফুলের গন্ধে মৌমাছি একটু তাড়াতাড়ি আসে । তুমি তো বলেছো মেয়ে যেনো পুরোপুরি অনাঘ্রাতা হয়,তাই না?
কুমারী এবং অনাঘ্রাতা, রজঃচক্রের প্রথম বছরের মধ্যেই, দ্রুত যোগ করলাম, যতোটা সম্ভব কঠিন করতে চাইছি আমার ব্যবস্থা। এমন কাউকে খুঁজে পেয়েছেন, মালিক, যার সাথে বর্ণনা মেলে?
পাল্টে গেলো ফারাও-এর মুখাবয়ব। চিন্তান্বিতভাবে হাসলেন তিনি। বিষণ্ণ অবয়বে কেমন অদ্ভুত দেখালো হাস্যমুখর মুখ। দেখা যাক, বিড়বিড় করে আউড়ালেন ফারাও। ঘুরে দাঁড়িয়ে রাজকীয় জল্যানে উঠার ধাপে পা রাখলেন। আমার মনিব, ইনটেফের ইশারায় আমিও সঙ্গী হলাম তাদের পিছুপিছু।
রাতে ধরে এসেছে বাতাস, গাঢ় তেলতেলে দেখাচ্ছে পানির রঙ, কেবল মাছরাঙা আর পাখিদের হঠাৎ আলোড়ন ছাড়া সম্পূর্ণ শান্ত নীল নদ। এমনকি নেমবেট-এর পক্ষেও এ অবস্থায় নদী পারাপার কোনো সমস্যা নয়। এরপরেও ট্যানাস রয়েছে। প্রহরায়, যেনো কোনো অযাচিত বিপদে উদ্ধার করতে পারে।
পাটাতনে পৌঁছুতে আমাকে কাছে টেনে নিলেন ইনটেফে। এখনও মাঝে-মাঝে আমাকে অবাক করে দাও তুমি, প্রিয়, ফিসফিস করে বলে আমার হাত মুচড়ে দিলেন। তোমার বিশ্বস্ততা নিয়ে ঠিক যখন সন্দেহ করছিলাম, চমকে দিলে।
তার এহেন ভালো আচরণে অবাক না হয়ে পারলাম না। রাসফারের চাবুকের ক্ষত এখনও দগদগ করছে আমার পিঠে । যাই হোক, মাথা ঝুঁকিয়ে ভাবাবেগ গোপন করে অপেক্ষায় রইলাম, কী বলতে চান ইনটেফ–বোঝার চেষ্টা করছি। অবশেষে মুখ খুললেন তিনি।
ফারাও-এর সামনে বলার জন্যে এরচেয়ে ভালো ঘোষণা মনে হয় চাইলে আমিও তৈরি করতে পারতাম না। ট্যানাসের কথা বলছি। গর্দভ র্যাসফারের কারণে বরবাদ হতে যাওয়া রাতটা তুমিই রক্ষা করলে। এতক্ষণে সবকিছু পরিষ্কার হতে শুরু করেছে আমার কাছে। ইনটেফের ধারণা ট্যানাসের জ্বালাময়ী বক্তৃতা আমি প্রস্তুত করেছি, তার সুবিধার জন্যে। মন্দিরের কোলাহলের কারণে ট্যানাসের উদ্দেশ্যে আমার সতর্কবাণী শুনতে পান নি।
আপনি খুশি হয়েছেন জেনে আমি আনন্দিত, মালিক। ফিসফিস করে প্রত্যুত্তরে বললাম। স্বস্তি বোধ করছি। আর যাই হোক, আমার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় নি। কিন্তু নিজের কথা নয়, আমি ট্যানাস আর লসট্রিসের প্রেমের পরিণতি নিয়ে ভাবছিলাম। সামনের দিনগুলোতে আমার সাহায্য বড়ো বেশি প্রয়োজন ওদের। অন্তত কিছু সাহায্য করার সামর্থ এখনও আছে আমার চিন্তাটা স্বস্তি জাগালো মনে।
এতো আমার দায়িত্ব ছিলো, মালিক।
তথ্-এর মন্দিরের পেছনে, খালের ওপাশের জায়গাটার কথা মনে আছে? একবার আলাপ করেছিলাম ওটা নিয়ে? বললেন ইনটেফ।
জ্বী, মালিক। গত দশ বছর ধরে ওটার মালিকানা পাওয়ার জন্যে প্রাণ আঁই-ঢাই করছিলো আমার। লেখালিখির জন্যে ওর চেয়ে সেরা জায়গা আর হয় না। বুড়ো বয়সে বিশ্রামের জন্যেও আদর্শ।
