কিন্তু একটা অবাক ব্যপার আছে। যখনই এই অবিন্যস্ত বস্তুতে এতটুকু আঘাত লাগে, তা সে মাথার ভেতরে জমা হওয়া সামান্য তরলের চাপ হোক না কেন মানুষ বাঁচে না। তাই যে থলিতে ওগুলো জমা থাকে, তার এতটুকু অসুবিধা না করে করোটি ফুটো করতে দারুন দক্ষতার প্রয়োজন। আমার আছে সেটা।
প্রচণ্ড চিৎকার করে চললো র্যাসফার। ধীরে ওর মাথায় ফুটো করে হাড়ের কণা, নোংরাগুলো ধুয়ে দিতে লাগলাম ভিনেগার দিয়ে। ভিনেগারের জ্বলুনি র্যাসফারের চিৎকারে ইন্ধন জোগালো ।
ছোট্ট গোল একটা ছিদ্র তৈরি হতে গরম রক্তের ধারা ছিটকে বেরিয়ে আমার মুখে লাগলো। সাথে সাথেই শান্ত হলো র্যাসফার । দুঃখের সাথে বুঝলাম, এই যাত্রা বেঁচে যাবে অমানুষটা। মাথার ফুটোটা বন্ধ করতে করতে ভাবছিলাম এই নমুনাটাকে বাঁচিয়ে রেখে মানবজাতীর কতটা ক্ষতি করলাম আমি।
মাথায় কাপড়ের পট্টি বেঁধে রেখে এলাম রাসফারকে। ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছিলাম আমি। আজকের দিনের উত্তেজনা এবং বিস্ময় আমার সমস্ত শক্তি শুষে নিয়েছে। কিন্তু নিস্তার নেই আমার। চাতালের ধাপে পা রাখতেই লসট্রিসের বার্তাবাহক তাগাদা দিতে লাগলো তার কাছে যাওয়ার জন্যে। কেবল র্যাসফারের রক্ত ধুয়ে একটু সাফ-সুতরা হয়ে নেওয়ার সময় পাওয়া গেলো।
প্রাণান্ত কষ্টে, পা টেনে টেনে যখন পৌঁছুলাম লসট্রিসের আঙ্গিনায়; ভীষণ চেহারা, রক্তচক্ষু নিয়ে চাইলো লসট্রিস। কোথায় লুকিয়েছিলেন আপনি, প্রভু টাইটা? সেই দ্বি প্রহরে আপনাকে আনতে লোক পাঠিয়েছি, আর এখন তো প্রায় সকাল হয়ে এলো । কত বড় সাহস তোমার? মাঝে-মধ্যে নিজের অবস্থান ভুলে যাও। অবাধ্য দাসের শাস্তির কথা জানো তুমি–এতক্ষণ অপেক্ষার কারণে রাগে ফুঁসছিলো লসট্রিস। অসামান্য রূপসী তার রাগ, পা মাটিতে ঠুকে যে জেদ প্রকাশ করলো, তা একান্তই তার ভঙ্গিমা। ভালোবাসা উথলে উঠতে লাগলো আমার হৃদয়ে।
ওখানে দাঁড়িয়ে বোকার মতো হেসো না! জ্বলে উঠলো সে, এত রাগ করেছি, তোমাকে শূলে চড়াতে পারি। আবারো মাটিতে পা ঠুকলো লসট্রিস, অনুভব করলাম আমার সমস্ত ক্লান্তি কেটে গেছে। কেবল ওর উপস্থিতি আমাকে নতুন জীবনীশক্তি দেয়।
মিসট্রেস, কী অসাধারণ অভিনয় করলে তুমি আজ! আমাদের সবার মনে হচ্ছিলো যেনো সত্যিকারের দেবী এসেছেন।
চালাকি করো না, তৃতীয়বারের মতো মাটিতে পা ঠুকলো লসট্রিস, তবে এবারে রাগ পড়ে এসেছে তার। এতো সহজে পার পাবে না আজ।
সত্যি, মিসট্রেস, মন্দির থেকে প্রাসাদে ফেরার সময় শুনেছি; রাস্তার সবার মুখে কেবল তোমার কথা। ওরা বলছিলো, এতো সুন্দর গান কখনও শুনে নি। মুগ্ধ হয়ে গেছে তারা।
একটা বর্ণও বিশ্বাস করি না, ঘোষণার সুরে বললো লসট্রিস। রাগ ধরে রাখতে পারছে না। আমার তো মনে হয়, আজ রাতে আমার গলা সবচেয়ে বিশ্রী ছিলো। অন্ততঃ একবার স্বর উঠাতে পারছিলাম না।
তা নয়, মিসট্রেস। এতো ভালো কখনও ছিলো না কারো কণ্ঠস্বর । আর সৌন্দর্য্য। পুরো মন্দিরে যেনো আলো জ্বেলে দিয়েছিলে । লসট্রিস যত রাগই করুক, ও তো শেষ পর্যন্ত একটা মেয়ে।
তুমি জঘন্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো সে। সত্যি, এবার তোমাকে শাস্তি দেবো ভেবে রেখেছিলাম। এখন আমার পাশে বসে আজকের সব কথা শোনাও। ওহ, মনে হয় আরো এক সপ্তা ঘুমাতে পারবো না। আমার হাত ধরে টেনে বিছানার দিকে এগুলো লসট্রিস। বকবক করে চলেছে, কেমন করে সত্য-নির্ভিক ভাষণে এমনকি ফারাও-কে মুগ্ধ করে ফেলেছে ট্যানাস, সবাই তো ভালবাসে তাকে, কেমন করে শিশু-হোরাস তার কাপড় ভিজিয়ে ফেলেছিলো, সত্যিই কী আমি মনে করি ও অসাধারণ কাজ করেছে এইসব।
শেষমেষ ওকে থামালাম আমি। মিসট্রেস, সকাল হয়ে এলো বলে। আগামীকাল রাজার সঙ্গে নদীর ওপারে যেতে হবে, সমাধি-নির্মাণ কাজ দেখবেন তিনি। এতো
গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে অতি অবশ্যই দারুন দেখাতে হবে তোমাকে।
কিন্তু আমার তো ঘুম আসছে না, টাইটা, প্রতিবাদ করলে লসট্রিস। বকবক করতে করতে কিছুসময় পর আমার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লো।
ধীরে, ওর মাথাটা বিছানায় রেখে পশম দিয়ে ঢেকে দিলাম আমি। চুমো খেলাম কপালে । সাথে সাথেই যেতে পারলাম না, বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম। চোখ না খুলেই বিড়বিড় করে বললো লসট্রিস, কাল কী রাজার সঙ্গে আমি একটু কথা বলতে পারবো? উনি পারবেন বাবাকে বাধা দিতে যেনো ট্যানাসকে দূরে না পাঠান তিনি।
কোনো সদুত্তর জোগালো না ঠোঁটে। আমার বিমুগ্ধ দৃষ্টির সামনে ঘুমে তলিয়ে গেলো লসট্রিস।
*
সকাল হতে বহুকষ্টে নিজেকে টেনে তুলতে হলো, যেনো এই মাত্র বিছানায় পিঠ লাগিয়েছিলাম। সবার শেষে যোগ দিলাম ফারাও-এর শোভাযাত্রায়, কিন্তু এমনকি লসট্রিসও লক্ষ্য করলো না আমার দেরিতে আগমন। রাজকীয় জলযানের পাটাতনে অবস্থান নিয়েছে সে। স্থির দাঁড়িয়ে ওকে দেখলাম কিছুক্ষণ।
আজ রাজকীয় মহিলাদের সঙ্গে বসেছে সে, রাজার পত্নী, তাঁর বহু উপপত্নী এবং কন্যাদের সাথে। হামাগুড়ি দেওয়া শিশু থেকে শুরু করে বিবাহযোগ্য কন্যা আছে। আমাদের ফারাও-এর, এরাই মূলত তাঁর মনোকষ্টের কারণ। ছেলে ছাড়া কেমন করে তাঁর রাজকীয় রক্তধারা রক্ষিত হবে?
আমারই মতো লসট্রিসও এক কি দুই ঘণ্টার বেশি ঘুমাতে পারে নি, কিন্তু আশ্চর্য হলো, আমার বাগানের মরু-ফুলের মতো মিষ্টি আর সজিব দেখাচ্ছে তাকে। বেছে
