মাথার যেখানটায় আঘাত লেগেছিলো পাথরের মেঝেতে, সেটা দারুন ফুলে গেছে। দেবতারা মাঝে-মধ্যেই দারুন উদারতা দেখান। আলোটা তুলে র্যাসফারের চোখ পরীক্ষা করে বুঝলাম বড় হয়ে গেছে তার চোখের মণি। এই মুহূর্তে কী চিকিৎসা প্রয়োজন তার, বুঝতে বাকি রইলো না আমার। বিশ্রী ওই করোটির ভেতরে রক্ত জমে গেছে বর্বরটার । আমার সাহায্য না পেলে আগামী সূর্যাস্ত আর দেখা হবে না তার । কুচিন্তা যে মাথায় আসে নি তা নয়, তবে শেষপর্যন্ত একজন শল্যবিদের দায়িত্বে অবহেলা করতে পারি নি।
করোটির ভেতরের আঘাত সারাতে পারেন, সমগ্র মিশরে এমন মাত্র তিনজন শল্যবিদ আছেন। নিজের কথা বাদ দিলাম, বাকি দুজনের উপরে কোনো ভরসা নেই আমার। এবারেও র্যাসফারের পাষণ্ড সঙ্গীরা তাকে মুখে চেপে ধরে রাখলো মেঝেতে, বোঝাই গেলো প্রভুর প্রতি গাঢ় মায়া-দরদ নেই এদের।
র্যাসফারের মাথার ফোলার উপর অর্ধবৃত্তাকারে কাটলাম আমি। হাড়ের উপর থেকে চামড়ার বেশ বড় একটা চাপড়া তুলে ফেলতে হলো। দুইজন পাষণ্ড মিলেও ধরে রাখতে পারছে না রাসফারকে, ব্যথার আতিশায্যে হুঙ্কার ছাড়তে লাগলো সে, রক্তের ফোয়ারা ছাতে লেপ্টে গেলো। আমাদের সবার জামাকাপড় ভিজে একশা, যেনো লাল পক্স ধরেছে। বাধ্য হয়ে তার হাত-পা চামড়ার ফিতে দিয়ে খাটের সাথে বেঁধে রাখতে নির্দেশ দিলাম দুই বর্বরকে।
ওহে, টাইটা! কী ব্যথা, তুমি বুঝবে না। তোমার ওই ফুলের রস একটু খেতে দাও, বন্ধু। দয়া কর । বহু কষ্টে বললো র্যাসফার ।
হাত-পা বাঁধা হতে পরিষ্কার করে বললাম তাকে, তোমার কেমন লাগছে, আমি বুঝি। যখন আমার শরীরে ছুরি চালিয়েছিলে একটু ফুলের রস আমারও দরকার ছিলো। কিন্তু বন্ধু, আমার ওষুধের সংগ্রহ শেষ হয়ে গেছে। আগামী এক মাসেও পুব থেকে কোনো ক্যারাভান আসবে না। সানন্দে মিথ্যে বললাম। খুব কম লোকে জানে বাগানে আমি নিজেই লাল-শেপেনের চাষ করি। ব্যথার এখনও কিছুই দেখে নি র্যাসফার। হাড় ফুটো করার সরঞ্জাম হাতে তুলে নিলাম।
সত্যি বললে, মানুষের মস্তিষ্কের বেশিরভাগ ব্যপারই আমার কাছে বোধগম্য নয়। ইনটেফের নির্দেশে দণ্ডপ্রাপ্ত সমস্ত আসামীর শবদেহ পাঠানো হয় আমার কাছে। ট্যানাসও যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বহু নমুনা নিয়ে এসেছিলো আমার জন্যে। ওগুলোকে কেটে ছিঁড়ে পরীক্ষা করেছি আমি। কোনদিক দিয়ে খাবার ঢোকে আর কোনদিক দিয়েই বা বেরোয় আমি এখন জানি। ফ্যাকাসে ফুসফুঁসের থলির মাঝখানে বসবাস করে আমাদের হৃদয়। রক্ত যেইসব নদীপথ দিয়ে পুরো শরীরে ভ্রমণ করে, আমি সেগুলোকে চিনেছি; এমনকি মানুষের আবেগ-নিয়ন্ত্রণকারী দুই রকমের রক্ত আমি চিনেছি।
এক আছে উজ্জ্বল, উজ্জ্বল রক্ত, ফিনকি দিয়ে ছোটে যেটা, ঝলকে ঝলকে। ওটা ভালোবাসা আর সুন্দর ভাবনার রক্ত। আরেক আছে গাঢ়, বিষণ্ণ রক্ত–ওতে কোনো উচ্ছ্বাস নেই। এ হলো ক্রোধ আর দুঃখের রক্তকুচিন্তার তরল।
আমার এই সমস্ত পর্যবেক্ষণ একশ প্যাপিরাসের ক্কোলে লিখে রেখেছি। জ্ঞানের এই ব্যপ্তি আর কারো নেই দুনিয়ায়, মন্দিরের ওই হাতুড়ে কবিরাজগুলোর তো নেইই। দেবতা ওসিরিসের পূজো আর মোটা উপঢৌকন ছাড়া কিছুই বলতে পারে না তারা। বিনয়ের সাথেই বলছি, এমন কোনো মানুষ আমি দেখি নি আমার চেয়ে মানুষের শরীর সম্পর্কে যার জ্ঞান বেশি। কিন্তু মস্তিষ্কের ব্যপার এখনও রহস্যময় আমার কাছে। স্বাভাবিকতা থেকে আমি বুঝি, চোখ দেখে; নাক গন্ধ নেয়, মুখ স্বাদ নেয় এবং কান শোনে কিন্তু নরম-ফ্যাকাসে যে বস্তু আমাদের মাথার ভেতরে আছে তার কাজ কী হতে পারে?
আমি ভেবে বের করতে পারি নি, এমন কাউকে পাই নি যে জানে। কেবল ট্যানাস একবার একটা গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিয়েছিলো। সারারাত ধরে মদ গিলেছিলাম দু জন সেদিন। সকালে ঘুম ভেঙে উঠে মাথার ব্যথায় কাতর ট্যানাস বললো, প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যে সেথ ওটা ঢুকিয়ে দিয়েছে আমাদের মাথার ভেতরে।
একবার, সেই ইউফ্রেতিস আর টাইগ্রিসের ওপার থেকে ক্যারাভান নিয়ে আসা এক জ্ঞানী ব্যক্তির সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম। অর্ধ-বছর ধরে দুনিয়ার যত রহস্য নিয়ে তর্ক করেছিলাম আমরা দুজনে। তিনি বলেছিলেন, আমাদের অনুভূতি আসলে হৃদযন্ত্র থেকে নয়, আসে মাথার ভেতরের নরম অংশ থেকে। এমনকি, তার মতো জ্ঞানী ব্যক্তিও এতো শোচনীয় ভুল করতে পারে!
যারা একবার দেখেছেন আমাদের শরীরের মাঝখানে বসে থাকা হৃদপিণ্ডকে; যা নিজেই নিজের স্পন্দন জোগায়, যাকে ভরে তুলেছে রক্তের নদীপথ; হাড়ের আচ্ছাদন যাকে রক্ষা করে, তারা জানেন আমাদের সমস্ত চিন্তা এবং আবেগের উৎস এই ঝর্ণাধারা। জীবনেও কী আপনি অনুভব করেননি মনোরম সুরে বা কোমল মুখশ্রী দেখে অথবা সুন্দর শব্দ-বাক্য-বর্ণে আপনার হৃদয় দ্রুততর হয়েছে? কখনও মাথার ভেতরে কিছু নড়তে শুনেছেন? আমার এই অকাট্য যুক্তির কাছে পূবের সেই জ্ঞানী ব্যক্তি হার মেনেছিলো।
কোনো যুক্তিবাদী মানুষই বিশ্বাস করবে না, রক্তবিহীন এক দলা দই, একলা মাথার খাঁচায় পরে থেকে থেকে রচনা করে চলেছে কাব্য; তৈরি করছে পিরামিডের নকশা। ভালোবাসায় মানুষকে, না হয় যুদ্ধে প্ররোচিত করে। এমনকি শবদেহ প্রস্তুতকারীরা পর্যন্ত মৃতদেহ থেকে ওই বস্তু বাদ দেয়।
